এশিয়ান হাতির অন্যতম আবাসস্থল এবং হাতির প্রাকৃতিক প্রজনন কেন্দ্র চুনতি অভয়ারণ্যে আশঙ্কাজনক হারে কমছে হাতির সংখ্যা। এক সময় হাতির দল বাচ্চাসহ বনের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দাপিয়ে বেড়াত। ছোট ছোট টিলা ও প্রাকৃতিক খাদ্যভান্ডার ছিল হাতির নিরাপদ প্রজননের আকর্ষণীয় স্থান। বর্তমানে এ সংরক্ষিত বনেই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে হাতির নিরাপদ প্রাকৃতিক প্রজনন। তা ছাড়া হাজার হাজার অবৈধ বসতির কারণে চুনতি বন হারাচ্ছে তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও।
২০০৪ সালের জরিপ অনুসারে, বাংলাদেশে হাতির সংখ্যা ছিল ২২৭টি। এর মধ্যে বন বিভাগ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ধারণা অনুসারে চুনতি বনে ৫০-৭০টি বুনোহাতি স্থায়ী ও পরিযায়ী হিসেবে বিচরণ করলেও বর্তমানে রয়েছে মাত্র ২০-২৫টি। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ জোট (আইইউসিএন) হাতিকে মহাবিপন্ন প্রাণী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। অর্থাৎ বাংলাদেশে হাতি বিলুপ্তির উচ্চঝুঁকিতে আছে। যা এ দেশের প্রাকৃতিক বন ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।
বর্তমানে চুনতি অভয়ারণ্যে পর্যাপ্ত বন না থাকা ও অভয়ারণ্যের বাইরেও মানুষের পাতা বিভিন্ন ফাঁদে পড়ে মারা যাচ্ছে হাতি। তথ্য অনুসারে, চুনতি অভয়ারণ্যের চুনতি রেঞ্জ ও বাঁশখালীর জলদি রেঞ্জ মিলে বিগত ৫ বছরে ২০টির অধিক হাতি নানা কারণে মারা যায়। এসব হাতির মৃত্যু হয়েছে বনদস্যুদের আক্রমণে, ঝিরির কাদায় আটকে, খাদ্যে বিষক্রিয়ায়, কৃষকের পেতে রাখা বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে ও পাহাড় থেকে পড়ে।
জানা যায়, চুনতি অভয়ারণ্য ১৯৮৬ সালে ৭ হাজার ৭৬৪ হেক্টর বনভূমি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া, বাঁশখালী, সাতকানিয়া এবং চকরিয়া উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত এ অভয়ারণ্য। মূলত এশিয়ান হাতির জন্য বিখ্যাত এ বনে বানর, হনুমান, বন্য শূকর, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও সরীসৃপ বসবাস করে। মূলত বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বন্য এশিয়ান হাতির যাতায়াতের একটি সংযোগপথ বা করিডর হিসেবে এ অভয়ারণ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। বিপন্ন বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণবিষয়ক কনভেনশন (ঈওঞঊঝ) চুনতি অভয়ারণ্যকে ২০০৩ সালে ‘মনিটরিং দ্য ইলিগ্যাল কিলিং অব এলিফ্যান্টস’ বা এমআইকেই সাইট হিসেবে ঘোষণা করে। যাতে বন্যপ্রাণীর অবৈধ শিকার, মৃত্যু রোধ এবং হাতির নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অভয়ারণ্যের ভেতরে সম্পূর্ণ অরক্ষিত বা ঘন চিরহরিৎ বনের পরিমাণ মাত্র ৩০ শতাংশ। চুনতি অভয়ারণ্যের ভেতর রেলপথ নির্মাণের কারণে প্রায় ১২০ একর বনভূমি অধিগ্রহণ করে অভয়ারণ্যকে মারাত্মকভাবে খন্ডিত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে চুনতি অভয়ারণ্যের ভেতর চুনতি ও জলদি রেঞ্জ মিলে প্রায় ২ হাজার একর বনভূমি অবৈধ দখলে রয়েছে। বনের ভেতর সাধারণ মানুষের মালিকানাধীন জায়গা হলো প্রায় ১ হাজার ২শ একর। এ বনে ছয় হাজারের ওপরে অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে। এখানে গভীর বনের ভেতর চলছে ট্রাক্টর দিয়ে কৃষিকাজ। এ ছাড়া প্রচুর পানের বরজ ও মানুষের ঘরবাড়ি। এসব কারণে এখানে বন্যপ্রাণীর খাবারের সংকট তৈরি হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানাতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ জানান, একটি হাতিকে দৈনন্দিন ১০০-১৫০ কেজি খাবার খেতে হয় এবং প্রায় ১০০ লিটার পানি লাগে। চুনতি অভয়ারণ্যে ছিল বঁাঁশ-বেত, কলাগাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির লতা-গুল্ম। যা হাতির পছন্দের খাবার। আর হাতির পছন্দ ছোট ছোট টিলা-পাহাড়। সব মিলিয়ে চুনতি অভয়ারণ্য ছিল হাতিবান্ধব একটি অভয়ারণ্য। কিন্তু এ বনের ভেতর এখন গড়ে উঠেছে প্রচুর অবৈধ বসতি, রয়েছে ব্যক্তিগত কৃষিজমি। ফলে এসব লোকজন বনের ভেতর প্রবেশ করে নষ্ট করছে অভয়ারণ্যের প্রাকৃতিক বন ও হাতির খাদ্য। তাতে ধীরে ধীরে কমছে হাতির সংখ্যা।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. আলী রেজা খান বলেন, এক সময় চুনতি অভয়ারণ্যে লম্বা লতা, বাঁশ, কলাগাছ প্রচুর ছিল। যা ছিল হাতির খাবার। এখন তো সেখানে প্রাকৃতিক বন নেই। যার কারণে হাতি বন ছেড়ে আসছে লোকালয়ে। এতে হাতি-মানুষ সংঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। মারা যাচ্ছে হাতি। প্রাকৃতিক বন না থাকলে হাতির নিরাপদ বসতি থাকবে না। ফলে এ অঞ্চলে কমে যাচ্ছে হাতির সংখ্যা। হাতির সুরক্ষার জন্য আমাদের অবশ্যই প্রাকৃতিক বন পুনরুদ্ধার করতে হবে। যাতে নির্বিঘেœ হাতি চলাচল করতে পারে। পাশাপাশি অবৈধ বসতি উচ্ছেদ এবং সংরক্ষিত বনে অবশ্যই সাধারণ মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।
বন অধিদপ্তরের উপ-প্রধান বন সংরক্ষক রকিবুল হাসান জানান, চুনতি অভয়ারণ্যে ২০-২৫টি হাতি রয়েছে। যা হয়তো আগের তুলনায় কম। এখানে হাতি উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। বর্তমানে হাতি সংরক্ষণকে বন বিভাগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। চুনতি অভয়ারণ্যে ‘হাতি সংরক্ষণ প্রকল্প’ চলমান আছে। তবে এখানকার প্রাকৃতিক বন ফিরিয়ে আনতে হলে অবৈধ দখল, স্থাপনা ও বসতি নির্মূল প্রয়োজন। তবেই চুনতি অভয়ারণ্য আবার এশিয়ান হাতির বাসযোগ্য আবাসস্থলে পরিণত হবে।
চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আবু নাসের মো. ইয়াসিন নেওয়াজ মনে করেন, বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনার উন্নতি হচ্ছে না। বন্যপ্রাণী রক্ষা করতে হলে বন বিভাগের অধীনে সম্পূর্ণ আলাদা একটি শাখা থাকা দরকার। তিনি জানান, কক্সবাজারসহ চুনতি অভয়ারণ্য এলাকা পর্যন্ত হাতির ১২টি করিডরের মধ্যে অধিকাংশ বেদখল। তবে এগুলো কোনোটি চুনতি অভয়ারণ্যের ভেতর নয়। অর্থাৎ হাতি যে বিভিন্ন জায়গায় নির্বিঘেœ চলাচল করবে তা আর অবশিষ্ট নেই। চুনতি অভয়ারণ্যের বাইরে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের সাতগড় বিট, বড়হাতিয়া বিট, মাদার্শা রেঞ্জ, চকরিয়ার বারবাকিয়া রেঞ্জ এবং বাঁশখালীর কালীপুর রেঞ্জসহ কক্সবাজার উত্তর ও দক্ষিণে এলাকায় হাতিরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে ও মারা যাচ্ছে। হাতি চলাচলের পথে গড়ে উঠেছে রেলপথ, মাছের খামার, পানের বরজ ইত্যাদি।
তিনি আরও জানান, ‘চুনতি বন পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ নামে একটি ৩ বছর মেয়াদের একটি প্রকল্পের কার্যক্রম চলছে। সেখানে চুনতি অভয়ারণ্যসহ চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগ ও বাঁশখালী জলদি অভয়ারণ্য রেঞ্জের আওয়াতাধীন মোট ১১টি বিটে হাতির সুরক্ষার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা, জলাশয় ও সল্টলেক (লবণ) নির্মাণের কাজ চলছে।
এ বন কর্মকর্তার মতে, চুনতি অভয়ারণ্যের ভেতর অবশ্যই বাফার জোন ও কোর জোন দ্রুত ঘোষণা করতে হবে। বর্তমানে হাতি সুরক্ষার জন্য চুনতি অভয়ারণ্যের আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ে অভয়ারণ্য সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া খুব জরুরি। যাতে হাতিরা নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। উচ্চঝুঁকিতে থাকা এ হাতিকে বাঁচাতে হলে প্রশাসন, বন বিভাগসহ সবার সমন্বিত প্রয়াস দরকার।
স্থানীয় পরিবেশবাদীদের অভিমত, যেহেতু হাতিকে বনের কারিগর বলা হয়, তাই যেখানে হাতি থাকবে সেখানে প্রাকৃতিক বন সৃষ্টি হবে এবং জীববৈচিত্র্য বাড়বে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হাতি সুরক্ষার পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলেই ফিরে পাবে এ বনের হারানো ঐতিহ্য।