জুলাইয়ে আহতদের যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি

এক পা হারিয়ে থমকে আছে রাকিব হাসানের জীবন। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে আহত হন তিনি; ডাক্তারদের কথায় কেটে ফেলতে হয় তার একটি পা। পরে ব্র্যাকের সহায়তায় কৃত্রিম পা লাগিয়েও স্বাভাবিক জীবনে ফেরা হয়নি তার। চাকরির আশ্বাস মিললেও তা অধরাই থেকে গেছে। বাবার ছোট্ট মুদি দোকানের আয়ে চলছে তাদের পুরো পরিবার।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরও পুলিশের গুলি ও সহিংসতায় আহত রাকিবের মত হাজারো মানুষ লড়ছেন শরীরের অসহনীয় যন্ত্রণা, মানসিক ক্ষত আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সঙ্গে। কারও চোখ গেছে, কারও শরীরের একটি অংশ চিরদিনের জন্য অক্ষম হয়ে গেছে, আবার কেউ দীর্ঘ চিকিৎসার পরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি।

সরকারি হিসাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের গুলি ও সহিংসতায় ৮৪৩ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৩৭০ জন আহত হন। আহতদের অনেকেই এখনো নিয়মিত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গুরুতর আহত ১৫৪ জনকে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, রাশিয়া ও তুরস্কে পাঠানো হয়েছে। তাদের ১০৫ জন দেশে ফিরে এসেছেন, ৩৯ জন এখনো বিদেশে চিকিৎসাধীন।

বাবার দোকানের ওপর নির্ভরশীল : নারায়ণগঞ্জের রাকিব হাসান বলেন, আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়। পরে ব্র্যাক কৃত্রিম পা লাগিয়ে দিলেও জীবনের গতি আর আগের মতো হয়নি। তিনি বলেন, ‘সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে কেউ যোগাযোগ করেনি। শুধু আহতদের জন্য যে মাসিক ভাতা দেওয়া হয় সেটি পাচ্ছি। চাকরিতে বিশেষ সুযোগ দেওয়া হবে বলে শুনেছিলাম। ডিসি অফিসেও যোগাযোগ করেছি, কিন্তু কোনো ফল পাইনি। এখন বাবার ছোট্ট মুদি দোকানের আয়ের ওপর আমাদের পুরো পরিবার নির্ভরশীল।’

একটি চোখে আর কোনো দিন দেখতে পাব না : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) আন্তর্জাতিক সম্পাদক জসীমউদ্দিন খান জুলাইয়ের আন্দোলনে পুলিশের ছররা গুলিতে বাম চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান। ৪৩তম বিসিএসের ভাইভা দিয়েছিলেন তিনি। ৪৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি থাকলেও চোখ হারানোর পর সে স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।

জসীম জানান, ১৮ জুলাই বিকেলে রামপুরায় আন্দোলনের সময় তার শরীরে ৮৬টি ছররা গুলি লাগে, যার দুটি লাগে চোখে। প্রথমে সিরাজুল ইসলাম মেডিকেলে নেওয়া হলেও পরে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হতে না পেরে ইস্পাহানি ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে প্রথম অস্ত্রোপচারের পর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও দুটি অস্ত্রোপচার হয়। প্রথম অস্ত্রোপচারের ব্যয় নিজে বহন করলেও পরে চিকিৎসা সরকারি ব্যবস্থাপনায় হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বাম চোখে এখন আর কিছুই দেখি না। বেশি রোদ বা বাতাসে এখনো তীব্র যন্ত্রণা হয়। সরকারি এককালীন সহায়তা পেয়েছি, মাসিক ভাতা পাচ্ছি। বিসিএসের স্বপ্নটা আর পূরণ হলো না। চাকরির স্বপ্ন ছিল, সেটা সরকারের কাছে চাওয়া অন্যায় আবদার হয়ে যায়। এখন গ্রামে এগ্রো ফার্ম দিয়েছি যদিও সেখানে ইনভেস্টমেন্ট প্রয়োজন।’  

আমি পুরোপুরি ভালো হব না : উত্তরার বাসিন্দা মো. রকিব উদ্দিন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই উত্তরার আজমপুরে আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে আহত হন তিনি। তখন তার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা চলছিল। গুলি লাগে কোমরের সামনের অংশে।

প্রথমে তাকে উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হয়; পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট এবং জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত তার পা ও কোমরে তিনটি বড় অস্ত্রোপচার হয়েছে। চিকিৎসকরা তার কোমরের অস্থিসন্ধি প্রতিস্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনা করছেন। রকিব বলেন, ‘ভালো আছি, তবে শরীরটা আর আগের মতো নেই। মাংসপেশিতে মোচড় দেয়, বাঁ পা ছোট হয়ে গেছে। রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না। কয়েক দিন আগে পঙ্গু হাসপাতালে মেডিকেল বোর্ড বসেছিল। ডাক্তাররা বলেছেন, আমি পুরোপুরি ভালো হব না। বিদেশে গেলেও খুব একটা লাভ হবে না। সরকারি চিকিৎসা এখনো চলছে।’

আবেদন করেও মেলেনি সরকারি সহায়তা : জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে পুলিশের ছররা গুলিতে আহত হন রাহাত উদ্দিন। ৪ আগস্ট আবার হামলার শিকার হয়ে তার হাতে ফ্র্যাকচার হয়। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সরকারি সহায়তার জন্য আবেদন করেছি। কিন্তু এখনো ভাতা বা সুযোগ-সুবিধা পাইনি। চিকিৎসা ও সংসার দুটোই নিজের মতো করে সামলাতে হচ্ছে।’

তিন শ্রেণিতে সহায়তা : জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তর আহতদের শারীরিক ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী তিনটি শ্রেণি করেছে। প্রত্যেক আহত ব্যক্তিকে দেওয়া হয়েছে একটি ‘হেলথ কার্ড’। এর মাধ্যমে সরকারি হাসপাতাল এবং সরকার নির্ধারিত বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া যাচ্ছে। সবচেয়ে গুরুতর আহত ‘ক’ শ্রেণিতে রয়েছেন ৯৯০ জন। তাদের অনেকেই স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি, হাত-পা কিংবা শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের সক্ষমতা হারিয়েছেন। তারা মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছেন এবং এককালীন ৫ লাখ টাকা সহায়তা পেয়েছেন। ‘খ’ শ্রেণিতে রয়েছেন ১ হাজার ৪১৭ জন। তারা মাসে ১৫ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছেন এবং এককালীন ৩ লাখ টাকা সহায়তা পেয়েছেন। ‘গ’ শ্রেণিতে রয়েছেন ১১ হাজার ৯৬৩ জন। তারা মাসে ১০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছেন এবং এককালীন ১ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন।

বিদেশে চিকিৎসায় ব্যয় ৩৪৮ কোটি টাকার বেশি : অভ্যুত্থানে যেসব আহতকে দেশে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি, তাদের বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেয় সরকার। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও চীনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বাংলাদেশে এসে চিকিৎসা ও পরামর্শ দিয়েছেন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানো ১৫৪ জনের অধিকাংশই গুলিবিদ্ধ। চলতি বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত তাদের চিকিৎসায় সরকারের ব্যয় হয়েছে ৩৪৮ কোটি ৯৩ লাখ ৯৯ হাজার ২০৭ টাকা।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত চোখ : সরকারি তথ্য বলছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ৫০২ জনের চোখে আঘাত লাগে। তাদের ২৮ জন স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। প্রায় ১০০ জন এক চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন। অন্যরা নানা ধরনের চোখের জটিলতায় ভুগছেন। গুরুতর আঘাত লাগায় এবং সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় অনেকের হাত কিংবা পা কেটে ফেলতে হয়েছে। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও জুলাইয়ের গুলির ক্ষত এখনো শুকায়নি। কারও জন্য বড় অর্জন এখন একটি রাত যন্ত্রণা ছাড়া ঘুমাতে পারা, কারও জন্য একটি কৃত্রিম পা নিয়ে আবার দাঁড়ানোর চেষ্টা করা, আবার কারও জন্য এক চোখ হারিয়েও নতুন করে জীবন গড়ার সংগ্রামে রত হওয়া। আন্দোলন শেষ হয়েছে, কিন্তু আহত জুলাইযোদ্ধাদের জীবনযুদ্ধ শেষ হয়নি।