বাগানে বাগানে চা-পাতা ছেঁড়ার ছন্দ তোলে যে শ্রমিকদের দিন কেটে যায়, তাদের জীবনযাপনের দুঃখগাথা সচেতন মানুষের হৃদয়ে দাগ কাটে। দিনভর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও সপ্তাহ শেষে অল্প মজুরিটুকুও সময়মতো না পাওয়া, অস্বাস্থ্যকর বাসস্থান, অপুষ্টিকর খাবার, অপরিকল্পিত শিক্ষা এবং অপ্রতুল চিকিৎসা ব্যবস্থা এই পাঁচ ‘অ’-এর আবর্তে যুগ যুগ ধরে চলছে চা-শ্রমিক পরিবারের সদস্যদের জীবনধারা।
চা-শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া সরাসরি জানানোর জায়গা নেই। সব দাবি জানাতে হয় ‘চা শ্রমিক সংসদ’ নামক ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে। অথচ চা-শ্রমিক সংসদের নির্বাচন হয় না আট বছর ধরে। ট্রেড ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে একই নেতৃত্ব থাকায় তারা মালিকপক্ষের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ‘পেটুয়া বাহিনী’ হয়ে উঠেছে। তারা শ্রমিকদের দাবি নিয়ে কথা বলে না। শ্রমিকদের সত্যিকারের দাবি-দাওয়া আদায়ের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে আছে।
কয়েক মাস ধরে ট্রেড ইউনিয়নের নির্বাচনের দাবিতে বৃহত্তর সিলেটের চা-বাগানগুলোতে ফুঁসছেন শ্রমিকরা। একাধিক বাগানসহ শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া ও রাজনগর উপজেলা এবং মৌলভীবাজার জেলা সদরে খ- খ- আন্দোলন ও সমাবেশ করে স্থানীয় একাধিক কর্তৃপক্ষকে লিখিত স্মারকলিপি দেওয়ার পর ঢাকায়ও দুই দফায় আলোচনার ডাক পেলে শ্রমিক-প্রতিনিধিরা নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন।
রাজঘাট ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান ও সাবেক শ্রমিকনেতা বিজয় বুনার্জী বলেন, ‘২০১৮ সালের পর ট্রেড ইউনিয়নের কোনো নির্বাচন হয়নি। ভোটের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব এলে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের পথ উন্মুক্ত হবে।’ তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আগের নেতারা ঘরবাড়িসহ নানা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে বাগানমালিকদের নিজস্ব লোক বা পেটুয়া বাহিনী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর বিষয়ে তারা কথা বলেন না। ফলে সাধারণ শ্রমিকরা তাদের ওপর আস্থা হারিয়েছে; তারা নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব চায়।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চা-বাগানগুলোতে কর্মরত ১ লাখ স্থায়ী ও ৫০ হাজার অস্থায়ী শ্রমিক-পরিবারের মোট সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর নিজস্ব জমি নেই। শ্রমিক-পরিবারের বসবাস সংশ্লিষ্ট বাগানের কম্পাউন্ডের ভেতরে। শ্রমিক ছাড়া অন্য কারোর ঘরবাড়ি করার অনুমতি নেই। কিন্তু নন-ওয়ার্কারের সংখ্যা অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় তাদের ছোট্ট ঘরে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে গাদাগাদি করে বাস করতে হয়। দিনে দিনে চরম মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। বেতন ও প্রভিডেন্ড ফান্ডের (পিএফ) টাকা বকেয়া পড়েছে অনেক বাগানে। নগদ টাকার জোগান না থাকায় খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে অনেক শ্রমিক-পরিবারের। শ্রমিক-পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ প্রাথমিক পর্যায়েই সীমিত; অসুস্থতায় বাগানমালিকের কাছ থেকে বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসা-সুবিধা পাওয়ার বিধান থাকলেও তা ঠিকমতো পাওয়া যায় না। বংশপরম্পরায় এমনই মানবেতর জীবন যাপন করে আসছেন চা-বাগান শ্রমিকদের একটি বড় অংশ; যদিও সব বাগানের চিত্র এক নয়। শ্রমিকদের কষ্ট নগরীর অভিজাত এলাকায় সুউচ্চ-সুরক্ষিত দালানে বসবাস করা বাগানমালিকের অনুভূতিকে স্পর্শ করতে পারে না।
বালিসেরা টি অ্যাস্টেটের শ্রমিক-প্রতিনিধি বিজয় হাজরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যুগের পর যুগ আমরা বংশপরম্পরায় চা-বাগানে কাজ করছি। কিন্তু যে মাটিতে আমাদের বসবাস সে মাটির মালিকানা আমাদের নয়। বাগানে শ্রমিক ছাড়া অন্য কারও ঘর তৈরির অনুমতি নেই। বাধ্য হয়ে শ্রমিক-পরিবারের সদস্য যথাক্রমে স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-পুত্রবধূ, মেয়ে-মেয়েজামাই, শিশুসহ সবাইকে ছোট ছোট ঘরে গাদাগাদি করে ঘুমাতে হয়। ট্রেড ইউনিয়নের নির্বাচন হলে নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে শ্রমিকরা দৈনিক মজুরি বাড়িয়ে ৫০০ টাকা ও নতুন ঘরবাড়ি নির্মাণের আন্দোলন জোরালো করার সুযোগ পাবেন।’
তিনি বলেন, ‘মালিকপক্ষ শ্রমিকদের মধ্যেই শ্রমিকের শত্রু সৃষ্টি করে, বিভেদ তৈরি করে দাবি-দাওয়া আদায়ের আন্দোলন বেগবান করতে বাধা দেয়। ট্রেড ইউনিয়নে নতুন নেতৃত্ব এলে জবাবদিহি তৈরি হবে। জবাবদিহি না থাকলে দাবি আদায় করা যায় না।’
বিজয় বলেন, ‘বেশকিছু বাগানে পিএফ ফান্ডে মালিকের অনুদান (মজুরির সাড়ে ৭ শতাংশ) দেওয়া হয়নি দুই-চার মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত। অনেক বাগানে শ্রমিকদের সাপ্তাহিক মজুরি ২ সপ্তাহ থেকে ১০ সপ্তাহ পর্যন্ত বকেয়া পড়েছে। সামান্য মজুরিটাও সময়মতো না পেলে কী খেয়ে বাঁচবে শ্রমিক!’
বকেয়া মজুরির বিষয়ে জানতে শ্রীমঙ্গলের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শকের দপ্তরে যোগাযোগ করলে উপ-মহাপরিদর্শক তপন বিকাশ তঞ্চঙ্গা অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের ন্যাশনাল টি কোম্পানি (এনটিসি)’র আওতাধীন বাগানসহ বেশ কিছু চা-বাগানে শ্রমিকদের মজুরি বকেয়া পড়েছে। আমাদের পরিদর্শকরা সংশ্লিষ্ট চা-বাগান কর্তৃপক্ষ এবং শ্রমিক-প্রতিনিধিদের নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে কাজ করছে।’
সংস্থাটির স্থানীয় শ্রম-পরিদর্শক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘সর্বশেষ গত মঙ্গলবার আমি দিওন্দি টি অ্যাস্টেটের চারটি চা-বাগানের প্রায় ৪ হাজার স্থায়ী শ্রমিকের এক সপ্তাহের বকেয়া মজুরি পরিশোধের উপায় নিয়ে মালিক ও শ্রমিক-প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসেছি। বাগানটির এক সপ্তাহের বেতন প্রায় ৮০ লাখ টাকা।’
ব্রিটিশ মালিকানাধীন দিওন্দি চা-বাগানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পর্যাপ্ত আয় না থাকায় মজুরি বকেয়া পড়েছে। এর আগে ৬ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া ছিল। সেটি কমিয়ে আমরা এক সপ্তাহে এনেছি। কৃষি ব্যাংক সাধারণত আমাদের ঋণ দেয়। আমরা ঋণ পেলে বকেয়া মজুরি পরিশোধ করার ব্যবস্থা করব। এ ব্যাপারে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কথা হয়েছে। শিগগির ঋণের অর্থ ছাড় হবে এবং আমরা বকেয়া মজুরি পরিশোধ করতে সক্ষম হব।’
চা-শ্রমিকের বকেয়া মজুরি পরিশোধ করতে আরও কয়েকটি চা-বাগানের মালিক ব্যাংকঋণ পাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
চা-শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের নির্বাচন অনুষ্ঠানে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে শ্রম অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট উপপরিচালক মহব্বত হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছি। শ্রমিকদের এক পক্ষের রিট থাকায় নির্বাচন অনুষ্ঠানে দেরি হচ্ছে। শ্রম অধিদপ্তর মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। শিগগিরই রিট খারিজের ব্যবস্থা হচ্ছে। এরপর নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করা হবে।’
উপপরিচালক বলেন, ‘এখন বিশৃঙ্খলভাবে শ্রমিকরা আন্দোলন করছে। নির্বাচনের শিডিউল ঘোষিত হলে এ পরিস্থিতি থাকবে না। নতুন পঞ্চায়েত নির্বাচিত হলে সবকিছু শৃঙ্খলায় ফিরে আসবে।’
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ, এনডিসি, দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চা-শিল্পে মালিক-শ্রমিক দুই-ই গুরুত্বপূর্ণ। এক পক্ষকে ঠকিয়ে অন্য পক্ষ টিকতে পারবে না। উভয় পক্ষকেই বাঁচাতে হবে। তাহলে এ শিল্পের সংকট দূর হবে; টেকসই উন্নয়নের দিকে এগোবে এ শিল্প।’