মেঘ হও মাছরাঙা

আট বছর আগের কথা। বিরল ও দুর্লভ পাখির সন্ধানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর ইউনিয়নে এসেছি। দিনভর ভারত সীমান্তবর্তী রহনপুরের চরলই বিলে ঘুরে খুন্তে বক, সোনাজঙ্ঘা ও মাঝারি পানকৌড়ির মতো তিন-তিনটি বিরল পাখির দেখা পেলাম। জীবনের প্রথম দেখা পাখি তিনটির চমৎকার সব ছবি তুলে সন্ধ্যার বাসে রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা দিলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরি হাউজে রাত কাটালাম। পর দিন শহরসংলগ্ন পদ্মা নদীর চরে গিয়ে আরেকটি অতি বিরল পাখি খৈরের দেখা পেলাম। বিরল এই পাখিটিকে খুঁজতেই সারাটা দিন চলে গেল।

পরের দিন অর্থাৎ ১ জুলাই ২০১৮-এ ক্যাম্পাসের পাখি দেখতে বের হলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রচুর পাখির বাস। প্রথমেই গেলাম উদ্ভিদ উদ্যানে। হাঁটতে হাঁটতে উদ্যানের একপ্রান্তে পুকুরের কাছে চলে এলাম। আর পুকুরপাড়ের বিশাল তুলাগাছটির ডালে পেয়ে গেলাম বিশাল এক ঈগলের। মাছখেকো এই ঈগলটির নাম বউলি ঈগল। ওর ছবি তুলে ফিরতি পথ ধরতেই বাগানের আলো-আঁধারিতে বাদামি মাথা ও কমলা গলা-বুক-পেটের একটি পাখিতে গাছের ডালে বসে থাকতে দেখলাম। আগেও ওকে দেখেছি বহুবার, কিন্তু এত কাছে কখনো পাইনি সারসের মতো লম্বা ঠোঁটের নীলচে-সবুজ ডানার পাখিটিকে। ডালে বসে ও যেভাবে লেজ নাড়াচ্ছিল তাতে না হেসে পারলাম না। প্রায় দুই মিনিটে ১৩টি ক্লিক করার পর হঠাৎ করেই সে তীরবেগে উড়ে গেল। আর খুঁজে পেলাম না। ঠিক পাশেই আরেকটি পুকুর রয়েছে। কাজেই মাছখেকো পাখিটি কোথায় যেতে পারে তা অনুমান করতে মোটেও কষ্ট হলো না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দেখা সারসের মতো লম্বা ঠোঁটের এই পাখিটি এ দেশে সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি মেঘ হও মাছরাঙা। মঘু মাছরাঙা নামেও পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে বলে ঢোঁসা বা গুড়িয়াল। ইংরেজি নাম ঝঃড়ৎশ-নরষষবফ করহমভরংযবৎ। অ্যালসেডিনিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম চবষধৎমড়ঢ়ংরং পধঢ়বহংরং। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাখিটির দেখা মেলে।

ঠোঁটের আগা থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত লম্বায় মেঘ হও মাছরাঙা ৩৫-৩৮ সেন্টিমিটার। ওজনে স্ত্রী ১৮২-২২৫ গ্রাম ও পুরুষ ১৪৩-১৮০ গ্রাম অর্থাৎ স্ত্রী খানিকটা ভারী। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথাসহ মুখম-ল কালচে-বাদামি। পিঠ ও লেজের উপরিভাগ নীল। ডানা নীলচে-সবুজ। ঘাড়-গলা হলুদ। বুক ও পেট হলদে-কমলা, গলায় একই রঙের বৃত্ত। চোখ গাঢ় বাদামি। ছোরার মতো লম্বা ৯ সেন্টিমিটার ঠোঁটটির রঙ রক্ত লাল, যার গোড়া কালচে ও আগা কালো। পা ও পায়ের পাতা প্রবালের মতো লাল ও নখ কালো। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের পালক গাঢ় কমলা ও বুকে ডোরা থাকে।

সুন্দরবনসহ সারা দেশজুড়েই রয়েছে মেঘ হও। সচরাচর বন-বাগানের জলধারা, নদী, খাল, সেচের নালা, পুকুর, খাড়ি ইত্যাদিতে একাকী বা জোড়ায় বিচরণ করে। নিজের এলাকায় অন্য প্রজাতির পাখিকে, তা সে সারসের মতো বড় পাখিও হোক না কেন বরদাশত করে না, তাড়িয়ে নিয়ে যায়। তবে পাখিটি মূলত বেশ লাজুক। ওর ডাক অহরহ শোনা গেলেও ওকে সচরাচর দেখা যায় কম। কারণ সে গাছের পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে। জলাশয়ের ধারের ছায়াময় গাছে বসে শিকারের অপেক্ষায় থাকে ও টার্গেট আওতার মধ্যে এলেই সঙ্গে সঙ্গে ঝপ করে পানিতে ডুব দিয়ে মাছ, ব্যাঙ ইত্যাদি শিকার করে অন্য গাছের ডালে গিয়ে বসে। এ ছাড়া টিকটিকি, সরীসৃপ, কীটপতঙ্গ, অন্য পাখির ছানা ইত্যাদি খেতে পারে। সচরাচর ‘ক্যা-ক্যা-ক্যা-ক্যা-ক্যা...’ স্বরে ডাকে। তবে প্রজননকালে সুমধুর ‘পিউ-পি-উ...’ কণ্ঠে অবিরাম ডাকতে থাকে।

জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর প্রজননকাল। এ সময় পুকুর, জলাশয় ইত্যাদির খাঁড়া পাড়ে প্রায় ১০০ সেন্টিমিটার দীর্ঘ ও ১০ সেন্টিমিটার চওড়া সুড়ং খুঁড়ে বাসা বানায়। স্ত্রী তাতে সাদা রঙের ৪-৫টি ডিম পাড়ে, যা ১৮-২৬ দিনে ফোটে। স্ত্রী-পুরুষ উভয়েই ডিমে তা দেয় ও ছানাদের যতœ নেয়। ছানারা ওড়া শিখে স্বাবলম্বী হয় ৩৬-৪০ দিনে। আয়ুষ্কাল প্রায় ছয় বছর।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ