খুলনায় অর্ধেকের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। এসব বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদটি শূন্য থাকায় বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
খুলনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মোট ১ হাজার ১৫৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬০৫টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। এর মধ্যে খুলনা সদরে ১২৬টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫৬টিতে এবং জেলার ৯ উপজেলার ১ হাজার ৩৩টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫৪৯টি প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক নেই। সেই হিসাবে জেলার প্রায় ৫৩ শতাংশ বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই।
উপজেলাভিত্তিক প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ ডুমুরিয়ায় ২১৩টি স্কুলের ১১৩টি, পাইকগাছায় ১৬৭টি স্কুলের ৭৩টি, কয়রায় ১৪২টি স্কুলের ৮৫টি, দাকোপে ১১৯টি স্কুলের ৫৫টি, বটিয়াঘাটায় ১১৫টি স্কুলের ৫২টি, তেরখাদায় ১০২টি স্কুলের ৬২টি, রূপসায় ৬৮টি স্কুলের ৩৭টি, ফুলতলায় ৫৭টি স্কুলের ৩৯টি এবং দিঘলিয়ায় ৫০টি স্কুলের ৩৩টিতে।
থানা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, খুলনা মহানগরের সাতটি ক্লাস্টারের (কাছাকাছি কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিয়ে গঠিত প্রশাসনিক ও একাডেমিক দল) মোট ১২৭টি স্কুলের (জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত শিশু কল্যাণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ) মধ্যে ৩৯টিতে প্রধান শিক্ষক নেই।
সদরে ক্লাস্টারভিত্তিক প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ ১নং ফুলবাড়ি বি কে ক্লাস্টারের ১৭টি স্কুলের ৪টিতে, ২নং বীণাপাণি ক্লাস্টারের ১৯টি স্কুলের ৯টিতে, ৩নং স্যাটেলাইট ক্লাস্টারের ১৫টি স্কুলের পাঁচটিতে, ৪নং কাজী আব্দুল বারী ক্লাস্টারের ১৭টি স্কুলের সাতটিতে, ৫নং সোনাডাঙ্গা ক্লাস্টারের ২৩টি স্কুলের দুটিতে, ৬নং সোনাপোতা ক্লাস্টারের ২০টি স্কুলের ছয়টিতে এবং ৭নং দক্ষিণ টুটপাড়া ক্লাস্টারের ১৬টি স্কুলের ছয়টিতে।
থানা শিক্ষা অফিস সূত্রে আরও জানা গেছে, সদরের জহির উদ্দিন গণ বিদ্যালয় ও সোনাডাঙ্গা আবু বকর খান আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে মামলা চলমান থাকায় এই দুইটি প্রতিষ্ঠানে আপাতত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে না। এ ছাড়া শিক্ষকরা শহরমুখী হওয়ায় শহরের প্রাণকেন্দ্রের ৫, ৬ ও ৭নং ক্লাস্টারে শিক্ষক সংকট কম হলেও বাকি চারটি ক্লাস্টারে ব্যাপক সংখ্যক প্রধান শিক্ষকের পদ খালি আছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি জাতীয় পর্যায়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ-সংক্রান্ত আইনি জটিলতা দূর হলেও মাঠপর্যায়ে এখনো শূন্য পদ পূরণের কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। শুধু প্রধান শিক্ষক নয়, খুলনা জেলায় সহকারী শিক্ষক সংকটও উদ্বেগজনক। জেলায় অনুমোদিত ৬ হাজার ৩০৭টি সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত ৫ হাজার ৭৯৭ জন। ফলে ৩৯৮টি (সদরসহ) সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে।
বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের রুটিন ক্লাসের পাশাপাশি প্রতিদিনের দাপ্তরিক কাজ, বিভিন্ন মিটিং এবং সরকারি নির্দেশনাবলী বাস্তবায়ন করতে হয়। এর ফলে তারা শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান করতে পারছেন না। যেসব স্কুলে সহকারী শিক্ষকের সংকট আছে। সেইসব স্কুলে আরও বেশি সমস্যা হচ্ছে। অতিরিক্ত কাজের চাপে একদিকে শিক্ষকরা যেমন হিমশিম খাচ্ছেন, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পড়াশোনা।
অভিভাবকদের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়গুলোয় চেইন অব কমান্ড বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেক স্কুলেই শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার গুণগত মানের ওপর।
প্রাথমিক বিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় এক যুগের বেশি সময় ধরে সরাসরি প্রধান শিক্ষক পদে বড় পরিসরে নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতা, পদোন্নতি-সংক্রান্ত রিট মামলা এবং নতুন নিয়োগ বিধিমালার কারণে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
সূত্র মতে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সর্বশেষ ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা-২০২৫’ প্রণয়ন ও প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, সেই বিধিমালা অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক পদের ৮০ শতাংশ পূরণ করা হবে পদোন্নতির মাধ্যমে (সহকারী শিক্ষক হিসেবে ১২ বছরের অভিজ্ঞতা ও চাকরি স্থায়ীকরণসহ) এবং বাকি ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে, কিন্তু মামলা জটিলতায় প্রধান শিক্ষক পদে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ ও পদোন্নতি কার্যক্রম বন্ধ আছে।
স্ত্রূটি আরও জানিয়েছে, ২০১৩ সালে ‘অধিগ্রহণকৃত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিধিমালা-২০১৩’ এর বিধি ৯ (১) এর একটি ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে জাতীয়করণকৃত শিক্ষকরা হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। ২০১৯ সালের মার্চে হাইকোর্ট জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের পক্ষে রায় দেওয়ার কারণে প্রধান শিক্ষকে পদোন্নতি ও নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আটকে যায়। পরে সরকার আপিল করলে মামলাটি দীর্ঘসূত্রিতার মধ্যে পড়ে। সম্প্রতি এ বছরের জুলাই মাসে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সরকারের আপিল মঞ্জুর করে রায় দেওয়ায় প্রধান শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির ওপর আইনি বাধা দূর হয়।
খুলনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ অহিদুল আলম বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকার পর প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদগুলোয় দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আমরা প্রধান শিক্ষক সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি।’ সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতি এবং পিএসসির মাধ্যমে নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে দ্রুতই এই সংকট কেটে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
থানা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শাহনাজ বেগম বলেন, ‘খুলনা সদরের ব্যাপক সংখ্যক স্কুলে প্রধান শিক্ষক না থাকায় প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রমের তদারকি ব্যাহত হচ্ছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা করায় পাঠদান ও দাপ্তরিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।’ তবে তিনি আইনি বাধা দূর হওয়ায় পদোন্নতি ও নিয়োগের ভিত্তিতে এই কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছেন।