দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও সেচ সংকট থেকে স্বস্তি পেয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন বরগুনার তালতলীর হাজারো কৃষক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেশব্যাপী খাল পুনঃখনন কর্মসূচির আওতায় উপজেলার বড়বগী ও বড় ভাইজোড়া খালের প্রায় ৫ কিলোমিটার পুনঃখননের পর বদলে যেতে শুরু করেছে স্থানীয় কৃষির চিত্র। খালে ফিরেছে পানিপ্রবাহ, কমেছে জলাবদ্ধতা; পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনায় কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক আশাবাদ।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির’ আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বড়বগী ও বড় ভাইজোড়া খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৭ টাকা ব্যয়ে ৫ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। বড়বগী ইউনিয়নের ছাতনপাড়া এলাকার মোশাররফ হোসেন খানের বাড়ি থেকে খননকাজ শুরু হয়ে খাজুরা কালভার্ট অতিক্রম করে ছোটবগী ইউনিয়নের বলের তবক এলাকার ওয়াজেদ কমিশনারের বাড়ি পর্যন্ত প্রকল্পটি বিস্তৃত।
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন পলি জমে খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হতো। এতে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গিয়ে ফসল নষ্ট হতো। আবার শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির তীব্র সংকটে কৃষকদের এক ফসলের ওপর নির্ভর করতে হতো। পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাত করতেও ভোগান্তি পোহাতে হতো।
খাল পুনঃখননের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। বর্ষা মৌসুমে পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় জলাবদ্ধতা কমেছে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে খালের পানি সেচকাজে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হওয়ায় একই জমিতে দুই থেকে তিনটি ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। খালের দুই পাশে রাস্তা ও বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়ায় কৃষিপণ্য পরিবহন, যোগাযোগ ও পরিবেশের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
স্থানীয় কৃষক জব্বার শরীফ, মোয়াজ্জেম মৃধা, রিপন মৃধা ও দুলাল হাওলাদার বলেন, আগে সেচের পানির জন্য অনেক কষ্ট করতে হতো। বর্ষায় আবার পানিতে ফসল নষ্ট হতো। এখন খাল পুনঃখনন হওয়ায় আমাদের সেই দুর্ভোগ অনেকটাই কমেছে। সেচ সুবিধা নিশ্চিত হলে বছরে দুই থেকে তিনবার ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এতে কৃষি উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি আমাদের আয়ও বাড়বে।
তারা আরও বলেন,প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগ আমাদের মতো সাধারণ কৃষকদের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি করেছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে গ্রামের কৃষকের ভাগ্য আরও বদলে যাবে।
বড়বগী ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য সোহেল আকন বলেন, খাল পুনঃখননের ফলে কৃষিখাতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এক ফসলি জমি দুই থেকে তিন ফসলি জমিতে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন বাড়বে, স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি আরও বলেন, খাল পুনঃখনন প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় কার্ডধারী শ্রমিকদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে কৃষির পাশাপাশি শ্রমজীবী পরিবারগুলোর আয়-রোজগারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
তালতলী প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান বলেন, খালের দুই পাশে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, কার্বন শোষণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও সবুজায়নেও ভূমিকা রাখবে এ প্রকল্প। একই সঙ্গে খালটি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও দখল-দূষণমুক্ত রাখা গেলে এর সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে।
তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দেশব্যাপী খাল পুনঃখনন কর্মসূচির অংশ হিসেবে তালতলীতে ৫ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। এ উদ্যোগ কৃষি ও মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি, পানি নিষ্কাশন এবং জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি খালের দুই পাশে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব সবুজ বলয় তৈরি করা হচ্ছে।