দেশের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবৈধ বসতি ও কৃষিকাজের কারণে এশীয় হাতির নিরাপদ আবাসস্থল ও প্রজনন চরম হুমকির মুখে পড়েছে। চুনতি অভয়ারণ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় হাতির করিডর বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মানুষ-হাতি সংঘাত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বন ধ্বংস, আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া এবং মানুষ ও হাতির প্রাণঘাতী সংঘাতে গত কয়েক বছরে অনেক হাতির প্রাণহানি ঘটেছে। চলাচলের পাশাপাশি খাদ্যের অভাবে এই বিশাল আকৃতির প্রাণীর অস্তিত্ব সংকট কতটা প্রকট হয়ে উঠেছে এরই সাক্ষ্য মিলেছে ৮ আগস্ট দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে। প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, এশিয়ান হাতির অন্যতম আবাসস্থল এবং হাতির প্রাকৃতিক প্রজনন কেন্দ্র চুনতি অভয়ারণ্যে আশঙ্কাজনক হারে কমছে হাতির সংখ্যা। এ সংরক্ষিত বনে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে হাতির নিরাপদ প্রাকৃতিক প্রজনন। তা ছাড়া অবৈধ বসতির কারণে চুনতি বন হারাচ্ছে তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও।
একদিকে হাতির জীবন-ঝুঁকি, অন্যদিকে চুনতি অভয়ারণ্যের বৈশিষ্ট্য বিনাশের বার্তা, এই দুই-ই চরম অশুভ। ওই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, ২০০৪ সালের জরিপ অনুসারে বাংলাদেশে হাতির সংখ্যা ছিল ২২৭টি। এর মধ্যে বন বিভাগ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ধারণা অনুসারে চুনতি বনে ৫০-৭০টি বুনোহাতি স্থায়ী ও পরিযায়ী হিসেবে বিচরণ করলেও বর্তমানে রয়েছে মাত্র ২০-২৫টি। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ জোট (আইইউসিএন) হাতিকে মহাবিপন্ন প্রাণী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, বাংলাদেশে হাতি বিলুপ্তির কতটা উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। এই চিত্র দেশের প্রাকৃতিক বন ও পরিবেশের জন্যও হুমকিস্বরূপ। চুনতি অভয়ারণ্যে পর্যাপ্ত বন না থাকা ও অভয়ারণ্যের বাইরেও মানুষের পাতা বিভিন্ন ফাঁদে পড়ে হাতির মৃত্যুর কেন কাক্সিক্ষত প্রতিবিধান মিলছে না, এর উত্তর দেওয়ার দায় কার? চুনতি অভয়ারণ্যের চুনতি রেঞ্জ ও বাঁশখালীর জলদি রেঞ্জ মিলে বিগত ৫ বছরে ২০টির অধিক হাতি নানা কারণে প্রাণহানির খবরে আমরা উদ্বিগ্ন। হাতির জীবনাচারে বনদস্যুদের লোভের থাবা পড়েছে। হাতি নিধনের তাদের বিভিন্ন অপকৌশলের নানা খবর ইতিপূর্বে সংবাদমাধ্যমেই মিলেছে।
চুনতি অভয়ারণ্যের বিপর্যস্ততার দায় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলের এড়ানোর অবকাশ নেই। বন বিপন্ন হওয়ায় বনবাসী প্রাণীগুলোর জীবন-হুমকি-প্রকট হয়ে উঠেছে এবং তা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষায় অভিঘাত ফেলেছে। এই অভয়ারণ্যকে যেভাবে খ-িত করা হয়েছে তা দায়িত্বশীলদের অদূরদর্শিতা তো বটেই, একই সঙ্গে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার নামান্তর। চুনতি অভয়ারণ্য পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি হাতির জীবন সংকটের অপছায়া সরাতেই হবে। আমরা জানি, হাতিকে বলা হয় বনের কারিগর। তার দেহটা যেমন বড়, স্মৃতিশক্তিও তেমনি প্রখর। এমনিতে হাতি শান্তশিষ্ট ও নিরীহ প্রাণী হলেও তার ওপর আক্রমণ হলে ভয়ংকর প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে। স্থলজগতের সবচেয়ে বড় এই প্রাণী নানা দিক থেকে বিস্ময়করও। হাতির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের মধ্যে দীর্ঘ শুঁড়, গজদন্ত, বড় কর্ণপর্দা, স্তম্ভাকৃতি চারটি পা এবং ধূসর বর্ণের শক্ত অথচ সংবেদনশীল চামড়া উল্লেখযোগ্য এবং এগুলোর বেশ কয়েকটি অমূল্যও।
হাতির চলাচলের পথগুলো দখলমুক্ত করে অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করা জরুরি। বনের ভেতরে হাতির উপযোগী ফলদ ও খাদ্যোপযোগী গাছ রোপণ এবং কৃত্রিম জলাধার নির্মাণ করা সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ করে হাতি নিধনকারীদের দৃষ্টান্তযোগ শাস্তির বিকল্প নেই। জলবায়ু পরিবর্তনেও হাতির অস্তিত্ব সংকটে বৈরী ভূমিকা রাখছে। এর মধ্যে মনুষ্যসৃষ্ট ফাঁদে হাতি ক্রমাগত বিপন্ন হবে আর এর কোনো প্রতিবিধান নিশ্চিত হবে না, তা তো মেনে নেওয়া দুরূহ। বন এখন আর হাতির চাহিদা মেটাতে পারছে না। একটি প্রাপ্তবয়স্ক হাতির প্রতিদিন প্রায় ২৭০ কেজি খাবার এবং ৩০০ লিটার পানির প্রয়োজন। বর্তমান বনাঞ্চল এই চাহিদা পূরণে অক্ষম। আমরা মনে করি, বিদ্যমান এই ঘাটতির নিরসন কঠিন কোনো বিষয় নয়, যদি পরিকল্পিত উদ্যোগ বাস্তবায়নে দায়িত্বশীলরা মনোনিবেশ করেন। ইংরেজ কবি ও ধর্মযাজক জন ডন বলেছেন, ‘প্রকৃতির এক মহান সৃষ্টি হলো হাতি। এটিই একমাত্র বিশাল প্রাণী, যা সম্পূর্ণ অহিংস ও ক্ষতিকর নয়।’ অথচ কি বিস্ময়কর সভ্যতায় কালি ছিটিয়ে কতিপয় মানুষ হাতির ওপর কি ভয়াবহ সহিংসতা ঘটিয়ে চলেছে।