অভ্যুত্থানের উত্তেজনা কমে এসেছে। দুই বছর পর সময় এসেছে বিবেচনার, কতদূর আমরা এগোলাম। দেশের জনগণ কোনো অন্যায়, জবরদস্তি, দুঃশাসন মেনে নেয় না। কোনো স্বৈরাচারকে ক্ষমতায় থাকতে দেয় না। বুকের রক্তে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। জীবন দিয়ে জীবনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে, আবার প্রমাণ করেছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে। দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরাচার ও স্বেচ্ছাচারবিরোধী সংগ্রাম যেন কেন্দ্রীভূত হয়েছিল জুলাই মাসে। কারফিউ দিয়ে, হেলিকপ্টার উড়িয়ে, পুলিশ, আর্মি, গোয়েন্দা সংস্থা আর দলীয় অস্ত্রধারীদের দিয়ে দমন করা যায়নি প্রতিবাদী ছাত্র-জনতাকে। পুলিশ বলেছে, একটা গুলি করি একটাই মরে। কিন্তু কেউ সরে না। এত অল্প সময়ে এত মৃত্যু, স্বাধীনতা যুদ্ধের পর দেশের মানুষ আর দেখেনি। জীবন দিয়েছে হাজারের বেশি মানুষ। এদের মধ্যে ছিল ছাত্র, শ্রমিক, নারী, শিশু, পথচারী। আহত হয়েছেন ২০ হাজারের বেশি। যাদের অনেকে কোনোদিন চোখে দেখবে না, নিজ পায়ে হাঁটবে না, কারও ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে পেটের ভেতরের অংশ, স্বাভাবিকভাবে মলমূত্র ত্যাগ করতে পারবে না অনেকে। মৃতরা ফিরে পাবে না জীবন আর আহতরা পাবে না জীবনের ছন্দ।
বাংলাদেশ আন্দোলন আর অভ্যুত্থানের দেশ। রক্ত দিয়ে স্বৈরাচারী শাসককে ক্ষমতা থেকে নামানোর উদাহরণ বারবার সৃষ্টি করেছে জনগণ। ১৯৬৯ এর অভ্যুত্থানে জীবন দিয়েছিল ৬১ জন, ১৯৯০ সালের সামরিক শাসনবিরোধী অভ্যুত্থান সফল করতে জীবন দিয়েছিল ২৫০ জনের বেশি মানুষ, আর ২০২৪ সালে সরকারি হিসেবে জীবন দিয়েছেন ৮৪৪ জন। এ সংখ্যা হাজারের বেশি বলে মনে করেন সবাই। জীবন দেওয়ার তালিকায় ২৮৪ জন শ্রমিক, ২৬৯ জন ছাত্র, ১৩৬ জন কর্মচারী, ১৩৩ জন শিশু, ১২৫ জন ক্ষুদ্র পুঁজির ব্যবসায়ীর কথা বলা হয়। ফলে সমাজের সব অংশের মানুষের জীবন দেওয়া প্রমাণ করে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ কেমন ছিল। আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রমাণিত হয়েছে নির্যাতন, খুন, গুমের ভয় দেখিয়ে আন্দোলন থামানো যায় না, দমন করে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না। বরং ধারাবাহিক আন্দোলন কোনো কোনো মৃত্যুতে যেন দুর্বার হয়ে ওঠে। গত ১৫ বছর আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে একের পর এক আন্দোলনে অসংখ্য মানুষ জীবন দিয়েছে। কিন্তু ১৬ জুলাই সাঈদের জীবনদান অসংখ্য জীবনকে জাগিয়ে তুলেছিল, ভয়ের শাসনকে উচ্ছেদের শক্তি দিয়েছিল এবং শাসকদের মনেই ভয়ের কাঁপন জাগিয়ে তুলেছিল।
যে উদ্দেশ্যে লড়াই তা যদি বিজয়ের পর বাস্তবায়িত না হয়, পুরনো পথেই যদি দেশ চলতে থাকে, তখন প্রশ্ন জাগে এত রক্ত দিয়ে আমরা কী পেলাম? এই অপূর্ণতা থেকে আবার ক্ষোভের আগুন জলে ওঠে মানুষের মনে। সামাজিক রাজনৈতিক আন্দোলন এভাবেই গড়ে ওঠে। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই ছিল স্বাধীনতার জন্য, পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াই ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক সুবিচারের জন্য। কিন্তু ব্রিটিশ গেছে স্বাধীনতা আসেনি, জনগণকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করা হয়েছে, ভাষার অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, শিক্ষার অধিকার সংকুচিত করা হয়েছে। বাইরের এই আক্রমণের আড়ালে শক্তিশালী হয়েছে শোষণ। এর ফলে শোষণ মুক্তি, অসাম্প্রদায়িকতার আন্দোলন স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। পাকিস্তান ছিল ২২ পরিবারের শোষণ, সামরিক শাসন, ধর্মীয় নিপীড়ন আর সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাধা রাষ্ট্র। এই শোষণের তীব্র রূপ প্রত্যক্ষ করেছে বাংলার মানুষ। ফলে ৬ দফা এবং ১১ দফা জনগণের আন্দোলনের দাবিনামায় রূপান্তরিত হয়েছিল। ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০ সালের নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল। স্বাধীনতার অপূর্ণ স্বপ্ন আর শাসন ক্ষমতায় যারা অধিষ্ঠিত হয়েছিল, তাদের লুটপাট দেশের মানুষকে বারবার আন্দোলনের পথে টেনে এনেছে।
স্বাধীনতার পর থেকে ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট, টাকা পাচার তো ছিলই। কিন্তু আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে তা যেন সীমাহীন রূপ নিয়েছিল। বেকারত্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিয়োগ বাণিজ্য, পুলিশের গ্রেপ্তার বাণিজ্য, বিচার বহির্ভূত হত্যা-গুম-খুন মিলে দেশে দুর্বিষহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ২০১৪ সালে দলীয় সরকারের অধীনে একদলীয় নির্বাচন, ২০১৮ সালে রাতের ভোটের নির্বাচন, ২০২৪ সালে আমি-ডামির নির্বাচন, নির্বাচনীব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। নির্বাচনে পুলিশ, প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশনকে ন্যক্কারজনকভাবে কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন অপকৌশলের মাধ্যমে নির্বাচনীব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করবে এবং ক্ষমতা ছাড়বে না। বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের নামে লুটপাট-নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন, ক্যাপাসিটি চার্জের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা পছন্দের ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেওয়া, মেগা প্রকল্পের মেগা দুর্নীতির বোঝা জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া, ব্যাংকগুলোকে লুণ্ঠনের ক্ষেত্র বানানো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ভয়াবহ দুর্নীতি, পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসকে নিয়মিত বিষয়ে পরিণত করা, প্রচার মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা, নদী, বন, পাহাড় দখলসহ নানা বিষয়ে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে লাখ লাখ ছাত্র, শ্রমিক, নারীকে রাজপথে নামিয়ে এনেছিল। ছাত্র-শ্রমিক-জনতার অংশগ্রহণ ছিল অভ্যুত্থানের প্রধান শক্তি।
কোনো অভ্যুত্থানকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় আকস্মিক। কিন্তু যে কোনো বড় আন্দোলন অনেক আন্দোলনের যোগফল। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ৬ দফা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলেছিল। স্বাধীনতার পর পুঁজিপতিদের স্বার্থে দেশ পরিচালনার কারণে, মুক্তিযুদ্ধের অপূর্ণ আকাক্সক্ষা মানুষকে বারবার আন্দোলনে পথে নামিয়েছে। মানুষ পথে নামে, বিজয়ী হয়। কিন্তু দুঃখজনক অভিজ্ঞতা হলো, জনগণ জীবন ও রক্তের বিনিময়ে স্বৈরাচারকে পরাজিত করে আর পরবর্তীকালে শাসকরা তাদের পথই অনুসরণ করে। ফলে এক দখলবাজের পরিবর্তে আর এক দখলবাজ, এক দুর্নীতিবাজের পরিবর্তে আর একজন ক্ষমতায় আসীন হয়। তাই অভ্যুত্থানের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা বারবার ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। স্বৈরাচারী সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয় কিন্তু স্বৈরাচারী ব্যবস্থা থেকে যায়। লুণ্ঠনকারী পালিয়ে যায়, কিন্তু লুটপাট বন্ধ হয় না।
অতীতের এই বেদনাময় অভিজ্ঞতা থেকে, প্রত্যাশা ছিল অভ্যুত্থানের পর পুরনো পথে যেন ফিরে না যায় দেশ। কিন্তু অভ্যুত্থানের দুই বছর পর, এক হতাশা ঘিরে ধরেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা ও চেতনাকে পদদলিত করা শুরু হয়েছিল। জনগণের অভ্যুত্থানকে মেটিকুলাস ডিজাইন বলে চিহ্নিত করা, মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানকে ব্যবহার করার চেষ্টা করা, বাউল, নারী ও সংস্কৃতিকর্মীদের ওপর আক্রমণ নামিয়ে আনা, সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভাঙা, জোরপূর্বক চাঁদাবাজি, মব সৃষ্টি করে হামলা ও হত্যা, নারীর সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ, ধর্ষণ, সংখ্যালঘু নির্যাতন, প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা দখল, দুর্নীতির নানা খবরে দেশের মানুষ একদিকে বেদনাহত ও ক্ষুব্ধ হয়েছে। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের নানা পদক্ষেপ জনগণের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের টাকা রাখার পরিমাণ ৪১ শতাংশ বেড়েছে আর খেলাপিদের ঋণ আদায় করা হয়নি। বরং ক্ষমতায় থেকে নানা সুবিধা নেওয়া দেখেছে মানুষ।
স্বৈরাচার অবসানে এমনটা হবে মানুষ সেটা চায়নি। একটা ফ্যাসিস্ট দুঃশাসনের পর গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা ঘটবে, এটাই তো স্বাভাবিক। বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্রদের লড়াই শত-সহস্র মানুষকে পথে নামিয়েছিল। মানুষ ভুলতে চেয়েছিল নারী-পুরুষ, ধর্মীয় পার্থক্য, আদিবাসীর অবহেলা। প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল মানবিক মর্যাদা, দূর করতে চেয়েছিল বৈষম্যের বেদনা। কিন্তু সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন ও উন্মাদনা, নারীর লাঞ্ছনা, আদিবাসীর ভীতি, নানা ধরনের চুক্তি যা জনগণ জানে না এবং মব সৃষ্টি করে ভীতির পরিবেশ তৈরি এসব কি জুলাইকে ভুলিয়ে দিচ্ছে না? জুলাই কি শুধু দিবস উদযাপনে পর্যবসিত হবে? এটি কি পথ হারিয়ে ফেলবে? নানা ঘটনার পর নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচিত সরকারের ওপর দায়িত্ব, অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা পূরণের পথে দেশকে এগিয়ে নেওয়া। জনগণ চায় বিচার, প্রশাসন, পুলিশ কোনো কিছুই যেন জবাবদিহির বাইরে না থাকে। সংস্কার যেন শুধু সংসদীয় বিতর্কের বিষয় হয়ে না পড়ে। ক্ষমতার দম্ভে জনগণের প্রত্যাশা যেন পদদলিত না হয়, বৈষম্য মুক্তির স্বপ্নগুলো অধরা না
থাকুক। এত আত্মত্যাগের পর অতীতের ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, এটাই চাওয়া। অথচ চাওয়ার বিপরীতে, আশঙ্কার কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছে। দুই বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে আন্দোলনকারী শক্তিগুলোর বিভক্তি, অসহিষ্ণুতা ও উত্তেজনা নতুন করে দুর্ভাবনার জন্ম দিচ্ছে। কোন দিকে অগ্রসর হচ্ছি আমরা!
লেখক : রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক
