শিক্ষার্থীরা যাচ্ছে কোন দিকে

দিনের শুরুতে যদি কেউ ভালো কাজ করার সংকল্প করে, তবে তার আচরণ ও চরিত্র ধীরে ধীরে উন্নত হয়। কবি মদনমোহন তর্কালঙ্কার এই বিষয়টি বোঝাতে লিখেছিলেন, ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি/ সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি।’ ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগরও তার ‘বর্ণপরিচয়’ রচনাতে শিশুদের বর্ণশিক্ষার পাশাপাশি সততা, নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা এবং মূল্যবোধ নিয়ে কথা বলেছেন। উনিশ শতকের এই দুজন সাহিত্যিকের মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট শিশুদের চরিত্র গঠন কেবল পাঠাভ্যাসের মাধ্যমে হয় না, এর পেছনে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের বড় ভূমিকা রয়েছে। বাল্যশিক্ষার এ ধরনের বইয়ের মাধ্যমেই একসময়ে ছিল শিশুদের হাতেখড়ি। বিষয়গুলো মাথায় এলো কয়েক দিন আগে ঘটা এক সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে। সন্ধ্যার পর চা-দোকানে আড্ডা দেওয়া বা অকারণে ঘোরাঘুরির ব্যাপারে মাইকিং করে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে ফেনী জেলা প্রশাসন। এর আগেও বরিশালের এক উপজেলায় অনুরূপ ঘোষণা দেয় স্থানীয় প্রশাসন। প্রশ্ন হলো শিক্ষার্থীদের সন্ধ্যার পরে যেখানে সেখানে আড্ডা দেওয়ার ব্যাপারে যদি স্থানীয় প্রশাসনকে মাথা ঘামাতে হয়, তাহলে তাদের অভিভাবক আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের পরিধি কি দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে? একটা শিশুর জন্য প্রথম প্রতিষ্ঠান তার পরিবার। শিশুরা যেহেতু অনুকরণপ্রিয়, সেহেতু পরিবারে রোজ রোজ সে যা দেখে, শুনে বা অবলোকন করে তা-ই তার মন-মগজে স্থান দেয়। শিশুর আচরণ থেকে শুরু করে ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিবিকাশ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর পরিবারের প্রভাবই প্রকট। মারিয়া মন্টেসরি ও সিগমুন্ড ফ্রয়েড দুজনই শিশুর প্রথম ও প্রধান শিক্ষার পরিবেশ ও ব্যক্তিত্ব গঠনের জন্য পরিবার ও পারিবারিক অভিজ্ঞতার কথাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলেছেন। আমাদের যুগে (আশি-নব্বইয়ের দশকে) স্কুলে বেত্রাঘাত ছিল নৈমিত্তিক ব্যাপার। পাঠে অমনোযোগী বা দূরন্তপনার স্বভাব কিংবা খামখেয়ালিপনার বিনিময় ছিল শিক্ষকদের কড়া শাসন। কিন্তু এই কড়া শাসনের পশ্চাতে দৃঢ় অনুশাসনও ছিল। আজকাল শাসনের গ-ি থেকে অনুশাসন উধাও হয়েছে। কর্মকা-ে নিয়ম-কানুন ও শৃঙ্খলাবোধের উপস্থিতি আজকাল খড়ের গাদায় সুই খোঁজার মতো বিষয়ে পরিণত হয়েছে। পড়ার টেবিল থেকে মনোযোগ ধাবিত হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত আড্ডায়। শাসন ও অনুশাসন এই দুয়ের সন্নিবেশ যে ছাত্রদের ওপর ভর করেছে, খোঁজ নিলে দেখা যাবে তারাই পরবর্তী সময় সমাজের ওপর তলায় পৌঁছেছে। শৈশবে স্কুল ছুটির পর আমরা বিকেলে বাড়ির আশপাশে খেলাধুলা করতাম বা যেখানেই যেতাম সন্ধ্যার আগে বিশেষত মাগরিবের আজানের আগে অবশ্যই বাসায় পৌঁছার বিষয় মাথায় থাকত। এটাই ছিল অলিখিত রেওয়াজ। আর এখনকার জামানার চিত্র ভিন্ন। আজকের কিশোরদের দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন এসেছে। তাদের অনেকেই এখন সন্ধ্যার পর ঘর ছেড়ে বের হয়। সন্ধ্যার পর ঠিকানা এখন পাড়ার গলিতে, দোকানে বা বন্ধুর বাসায়। আর অলি-গলিতে আড্ডার বিষয়বস্তু আর যা-ই হোক, পঠন-পাঠন হওয়ার কথা নয়। এই অভ্যাস গড়ার দোষ ওদের কাঁধে চাপানোর আগে প্রশ্ন জাগা উচিত ওই যে সারা বিকেলটা ওরা ঘরে আলস্যে কাটালো, সেই সময়টায় খেলাধুলার জন্য আমরা তার জন্য মাঠ-ময়দান রেখেছি কি? দুরন্তপনার বিকেলের  মুহূর্তগুলো যে আমরা তার জীবন থেকে উপড়ে ফেলেছি, তার কথা কে ভাবে এখন? পারিবারিক অবহেলা, সামাজিক বৈষম্য, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং কুসঙ্গও তাদের ঘরের বাইরে নিয়ে আসছে। পরিবারের বন্ধনহীনতা যে এই ঘটনার অনুঘটক তা ভাবা হয় না। শিশু-কিশোরদের আচরণ গড়ে ওঠে তাদের চারপাশের পরিবেশ, সঙ্গ এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। অপরাধবিজ্ঞানের ডিফারেনশিয়াল অ্যাসোসিয়েশন তত্ত্বও তা-ই বলে।

‘কিশোরদের বিচার হয় না’ বা ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে শাস্তি নেই এমন অপব্যাখ্যাকে পুঁজি করে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধচক্র কিশোরদের ব্যবহার করছে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক পরিবহন, মারামারি, এমনকি হত্যাকা-ের মতো গুরুতর অপরাধে। এর ফলে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারের মাধ্যমে অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। এমনিতেই ২০১১ সালে হাইকোর্টের এক নির্দেশের প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেতের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। এক সময় শিক্ষক যখন বইয়ের সমান্তরালে বেতকে ক্লাস চালানোর উপযুক্ত উপকরণ মনে করেছে, বেতের মারে কচিকাঁচাদের জীবন হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে, তখন বিচারালয় ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে আমরা ভুলে যাই, শাসন নিষিদ্ধ হয়েছে, অনুশাসন নয়। কিশোরদের আড্ডা মানে বিপথগামিতা এমনটি নয়। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকা-, পাঠচক্র বা সৃজনশীল সামাজিক আড্ডা শিশু-কিশোরদের ব্যক্তিত্ব বিকাশে অবশ্যই ভূমিকা রাখে। কিন্তু এই আড্ডা যখন হয় উদ্দেশ্যহীন, অনিয়ন্ত্রিত ও অসংযত, তখনই নেমে আসে তাদের জীবনে বিপর্যয়। স্কুলের যে শিক্ষকরা একসময় ক্লাসের বাইরে শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর রাখতেন, পড়াশোনার হাল জানতে কদাচিৎ ছাত্রের বাড়িতে উপস্থিত হতেন, সেই শিক্ষক আজ ক্লাসের বাইরে পরামর্শ দিতে গিয়ে দশবার ভাবেন। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান বা সিঙ্গাপুরের মতো অনেক দেশে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের বিপথগামিতা প্রতিরোধে সরকারি সংস্থা রয়েছে। আমাদের নেই, তাই এই বিষয় নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

তা ছাড়া বিশ্বের অনেক দেশ নির্দিষ্ট বয়সের নিচে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধের ব্যাপারে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছে। আমাদের দেশে এ নিয়ে এখন পর্যন্ত শক্ত আওয়াজ পাওয়া যায়নি। সন্তানের আবদারে পরিবার সন্তানের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিয়েছে, কিন্তু এই স্মার্টফোন সে কখন কীভাবে ব্যবহার করছে তার তদারকি কি করা হচ্ছে? আবার ওদিকে বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা, জীবনদক্ষতা, সহশিক্ষা কার্যক্রম ও কাউন্সেলিং নিয়ে কতটুকু কাজ করছে? যদি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আরও সচেতনতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে উদ্যোগী হয়, তাহলে সন্ধ্যার পর শিক্ষার্থীদের অযাচিত আড্ডা নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনকে ভাবার কোনো কারণ নেই।

লেখক : ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও গবেষক

soheleng83@gmail.com