অপেক্ষার অবসান এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের

এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবসরে যাওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে দীর্ঘশ্বাসের অপর নাম উঠেছিল অবসর সুবিধা বোর্ড এবং কল্যাণ ট্রাস্ট। বছরের পর বছর অপেক্ষা আর নানা জায়গায় ধরনা দিয়েও যথাসময়ে মেলেনি অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা। অবসরে যাওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের অনেকেই অভাবে-অনটনে চিকিৎসা করাতে না পেরে মারা গেছেন। অনেকে শেষ বয়সে এসে হিমশিম খাচ্ছেন সংসার চালাতে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে নানা খাতে দেদার খরচ হলেও অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের দুর্দশা লাঘবে তারা ছিলেন উদাসীন। তবে আশার কথা, দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর ধরে আটকে থাকা এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবসর ভাতার অচলাবস্থা অবশেষে কাটতে চলেছে। চলতি মাসেই অবসরে যাওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের হাতে তুলে দেওয়া হবে তাদের পাওনা।

অবসরে যাওয়া বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের মানবেতর জীবনযাপনের কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার আংশিক বকেয়া পরিশোধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুরুতে ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে যেসব শিক্ষক-কর্মচারী অবসরে গেছেন ও ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে যেসব আবেদনকারীর কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা বকেয়া রয়েছে তাদের বকেয়া পরিশোধ করা হবে। আগামী ১৫ আগস্ট রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই টাকা বিতরণ করা হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে ৭৫ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীকে শুধু অবসরের টাকা এবং তাদের মধ্যে ৪৪ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীকে কল্যাণের টাকাও দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে ১ লাখ ১৯ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী এই টাকা পাবেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক উপস্থিত ছিলেন। এই সূত্র আরও জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া ২ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ এবং অবসর ও কল্যাণ বোর্ডের বিভিন্ন এফডিয়ার থেকে মাসিক জমা হওয়া লভ্যাংশ এবং প্রতি মাসে কল্যাণ সুবিধার জন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে কেটে নেওয়া টাকা থেকে এই টাকার সংস্থান করা হবে। সাধারণত অবসর সুবিধার জন্য চাকরিকালীন শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের ৬ শতাংশ করে টাকা মাসে কেটে রাখা হয়। আর কল্যাণ সুবিধার জন্য কাটা হয় আরও ৪ শতাংশ। এ ছাড়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে ১০০ টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৭০ টাকা অবসরের জন্য এবং ৩০ টাকা কল্যাণের জন্য। বাকি অর্থ সরকার ও জমা অর্থের সুদ থেকে সমন্বয় করা হয়।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে সফটওয়্যার জটিলতায় অবসরে যাওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের তথ্য অ্যানালগ পদ্ধতিতে হালনাগাদ করছিল অবসর সুবিধা বোর্ড এবং কল্যাণ ট্রাস্ট। হঠাৎ করে অল্প সময়ে বড় কর্মযজ্ঞ সম্পাদনের কারিগরি ও লজিস্টিক সাপোর্ট তাদের নেই। ফলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে আইবাস (সরকারের অর্থ বিভাগের একটি সমন্বিত বাজেট ও হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার) ও ইএফটির (ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার) মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীদের হিসাব নম্বরে এই টাকা সরাসরি পাঠানো হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ৫০ জন দক্ষ লোক দিন-রাত কাজ করছেন যেন একই দিনে সবার কাছে টাকা পৌঁছানো যায়। কোনো ধরনের মধ্যস্বত্বভোগী কিংবা দালালরা যাতে অপকর্ম করতে না পারে তাই সংশ্লিষ্ট সবার ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হবে এই টাকা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যে একটা  টিম গঠন করে দেওয়া হয়েছে, যারা সবার ব্যাংক হিসাব নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করছেন। যাদের তথ্যে ঘাটতি রয়েছে তাদের থেকে ফোনে ব্যাংকের হিসাব নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর নেওয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, এবার একসঙ্গে পুরো টাকা দেওয়া হবে না, আংশিক টাকা দেওয়া হবে। আবেদনের সময় ও প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে, কে কত টাকা পাবেন।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অবসরে যান সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার মাদ্রাসা শিক্ষক আসলাম আলী। তিনি বলেন, অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা পেতে দীর্ঘদিন মন্ত্রণালয়, ব্যানবেইজ ও বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরছি। কিন্তু কিছুই পাইনি। এখন সরকার যদি আমাদের অবসর ও কল্যাণের টাকা পরিশোধ করে তাহলে বেঁচে যাই। তবে এই শিক্ষক আশঙ্কা প্রকাশ করে জানান, গতকাল শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত তার থেকে কেউ ব্যাংকের হিসাব নম্বর কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্রবিষয়ক তথ্য জানতে চায়নি। তিনি আবেদন করার সময় অনলাইনে ব্যাংক হিসাব নম্বর উল্লেখ করেছিলেন কি না তা মনে করতে পারেননি। শুধু আসলাম আলীই নন, দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে একাধিক শিক্ষক এই উদ্বেগের কথা জানান।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেন, অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্ট মিলিয়ে প্রতি আবেদনকারী অন্তত ৫ লাখ টাকা পাবেন। তবে এই পরিমাণ বাড়তে বা কমতে পারে। একসঙ্গে সব টাকা দেওয়া হলে সর্বোচ্চ ১০ হাজার আবেদনকারীকে পুরো টাকা দেওয়া সম্ভব হতো। যেন সবাই উপকৃত হন, সেই বিবেচনায় এবারে আংশিক দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ইতিমধ্যে অবসরে যাওয়া অনেকেই মারা গিয়েছেন, কেউ কেউ টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না, তাই প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন ২০২১ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত যারা আবেদন করেছেন সবাইকে টাকা দিতে।

অনেক শিক্ষক তথ্যের ঘাটতির জন্য টাকা না পাওয়ার শঙ্কা জানিয়েছেন এমন বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে শিক্ষা সচিব বলেন, যাচাই করে দেখা হচ্ছে। যাদের তথ্যের ঘাটতি আছে তাদের ফোনে সরাসরি কল দেওয়া হচ্ছে। জেলা ও উপজেলার দায়িত্বশীলদের চিঠি পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ বহুমুখী তৎপরতা হাতে নেওয়া হয়েছে। ফলে টাকা না পাওয়ার সুযোগ নেই। এরপরও যাদের তথ্য পাওয়া যাবে না তারা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের অফিস থেকে টাকা সংগ্রহ করতে পারবেন।

অবসর ও কল্যাণ সুবিধার আওতায় থাকা ব্যক্তিদের তালিকা জেলা প্রশাসককে দেওয়া হবে জানিয়ে শিক্ষা সচিব বলেন, কেউ টাকা না পেলে জেলা প্রশাসকের অফিসে যোগাযোগ করবেন। এরপরও যদি কোথাও ভুল হয় কিংবা যান্ত্রিক ত্রুটি হয় তাহলে পরে আমরা ঠিক করে দেব।