ডা. মো. আরেফ রহমান
অধ্যাপক, চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগ
ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
আর্সেনিক রোগ মূলত ত্বকে দেখা যায়। দীর্ঘদিন ধরে পানি বা খাবারের মাধ্যমে শরীরে আর্সেনিক জমে গেলে হয় এই রোগ হয়। দেশের অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক থাকায় এ রোগের ঝুঁকি বেশি। আর্সেনিক যুক্ত পানি খেলে ত্বকে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।
যেমন ত্বকে ছোট ছোট কালো দাগ কিংবা পুরো ত্বক কালো হয়ে যেতে পারে। হাত ও নখের চামড়া শক্ত ও খসখসে হয়ে পরে। এছাড়া ত্বকের বিভিন্ন স্থানে সাদা-কালো দাগ দেখা দেয়। হাত ও পায়ের তালুর চামড়ায় শক্ত গুটি হয়। দীর্ঘদিন আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করলে কিডনি ও লিভারের কর্মক্ষমতা লোপ পেতে পারে। ত্বক, ফুসফুস ও মূত্রথলির ক্যানসার হয়। ত্বকে সৃষ্ট নানা রকম লক্ষণ থেকে আর্সেনিকের সুস্পষ্ট সংক্রমণ বোঝা যায়। এইসব লক্ষণ প্রকাশের আগেই কিছু এনজাইম বিনষ্ট হয়ে ত্বকে নানা রকম জীবাণু সংক্রমণে বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ হয়।
কেন হয়
ভূগর্ভস্থ পানিতে প্রাকৃতিকভাবে আর্সেনিক মিশে থাকলে এবং সেই আর্সেনিকযুক্ত পানি দীর্ঘদিন পান করলে, ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক আছে এমন জায়গায় ধান ও সবজি চাষ করে সেই চাল ও শাকসবজি খেলে, শিল্পকারখানা বা কীটনাশকে ব্যবহৃত আর্সেনিকের সংস্পর্শে এলে।
লক্ষণ
আর্সেনিক ধীরে ধীরে শরীরে জমে নানা জটিলতা সৃষ্টি করে। বাহ্যিক সমস্যার মধ্যে হাত-পায়ের তালু ও শরীরে কালো-সাদা দাগ (সবষধহড়ংরং), চামড়া মোটা হয়ে যাওয়া, খসখসে হওয়া (শবৎধঃড়ংরং) অস্বাভাবিক আঁশযুক্ত ভাব।
অভ্যন্তরীণ সমস্যা
ডায়রিয়া, পেটব্যথা, ক্ষুধামন্দা, লিভার, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, স্নায়ুর দুর্বলতা, হাত-পায়ে ঝিনঝিন করা।
দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা হলো ফুসফুস, লিভার, ব্লাডার, ত্বক ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যায়, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া। পাঁচ থেকে দশ বছরের ক্রনিক আর্সেনিক থাকলে পরে কেরাটোসিস দেখা দেয়।
শরীরের নানা জায়গায়, বিশেষ করে হাত ও পায়ের পাতার ত্বক রুক্ষ হওয়া ও গুটি দানা দেখা দেওয়া। হাতের চেটো ও পায়ের তালু শক্ত ও পুরু হয়ে যায়। পায়ের তলা ফেটে যাওয়া। পাঁচ থেকে দশ বছরের ক্রনিক আর্সেনিক থাকলে পরে কেরাটোসিস দেখা দেয়।
চিকিৎসা
উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। গুরুতর হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। আর্সেনিক রোগের কোনো ওষুধ এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়, তবে সহায়ক চিকিৎসা দেওয়া হয়
দেশে বিশেষ করে দক্ষিণ অঞ্চলে এ ধরনের রোগীর সংখ্যা বেশি। যেসব চাষিরা সরাসরি মাঠে কাজ করে তাদের এ ধরনের রোগের আশঙ্কা থাকে। এ রোগ এমন অবস্থায় ধরা পড়ে যখন চিকিৎসা করে আশানুরূপ ফল আর পাওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। দেহে আর্সেনিক সংক্রমণ হলে সম্ভবত রঙ তৈরির কোষ উত্তেজিত হয়। অধিক মেলানিন উৎপাদনে চামড়ায় কালো কালো ছোপ পড়ে। পরে সেই কোষগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কালো মেলানিন উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এসবের ফলে সাদা, কালো ছিট দেখা যায়।
কখনো কখনো কিছু রোগীর পায়ের চেটো ফুলে যায়, যা আঙুলের চাপে টোল খায় না। একে টোলহীন শোথ বলে। কারও আবার চোখে দেখতে পাওয়া যায় কনজাংটিভাইটিসের মতো হয়ে চোখ লাল হয়ে যাওয়া অবস্থা। এ ধরনের লক্ষণ দেখামাত্রই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে। কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না।
প্রতিকার ও করণীয়
গভীর নলকূপ, ফিল্টার, বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে ব্যবহার ও পান করতে হবে। আর্সেনিক পরীক্ষা করে নিতে হবে। পানির উৎস পরীক্ষা করা সাধারণত <০.০৫ সম/খ নিরাপদ ধরা হয়। পুষ্টিকর খাবার যেমন ভিটামিন এ, সি এবং ই সমৃদ্ধ খাবার শরীরকে আর্সেনিকের ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দেয়।