ধানমন্ডির সোবহানবাগের জনপ্রিয় রেস্টুরেন্ট তেহারি ঘর। প্রতিষ্ঠানটি এক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে গ্রাহকদের জানিয়েছে নতুন মূল্য তালিকা নির্ধারণের কথা। হাফ প্লেট তেহারি ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়েছে ২৫০ টাকা এবং ফুল প্লেটের দাম ৪০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা নির্ধারণ করেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে চাল, মাংস, মসলা, ভোজ্য তেল, এলপিজি, বিদ্যুৎ, শ্রমিকের মজুরি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় খাবারের মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে। যা গত ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়েছে। তবে দাম বাড়ালেও পরিমাণ ও খাবারের গুণমানে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানানো হয় বিজ্ঞপ্তিতে।
জানা গেছে, একদিকে যেমন বিদ্যুৎ জ্বালানির সংকট রয়েছে, তেমনি চাল, তেলসহ নানা খাতে খরচও বেড়েছে। ফলে চাপে পড়েছে দেশের রেস্টুরেন্ট খাত। এই চাপে কেউ হয়তো দাম বাড়াচ্ছে, কোনো রেস্টুরেন্ট আবার নির্ধারিত দামে কম পরিমাণে পরিবেশন করছেন। এতে করে এ খাতের উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন ভোক্তারা। রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীদের দাবি, গ্যাস-বিদ্যুৎসহ সব মিলে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ খরচ বেড়েছে।
জানা গেছে, গত ২ আগস্ট ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৭০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৫৯৮ টাকা নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এর সঙ্গে গত ৩ জুন গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। শুধু গ্যাস-বিদ্যুৎই নয়, বেড়েছে পোলাও চালের দাম। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর তথ্য বলছে, প্রতি কেজি খোলা সুগন্ধি চালের দাম ১৬০-১৭০ টাকা থেকে বেড়ে ২০০ টাকায় উঠেছে। প্যাকেটের সুগন্ধি চালের প্রতি কেজির দাম ১৯০ টাকা থেকে বেড়ে ২৩০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। এর সঙ্গে সবজি থেকে শুরু করে মাছ, মাংসের দামও বাড়তি। অনলাইন ডেলিভারি, দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন ভাতাও বেড়েছে বলে জানা গেছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ, জ¦ালানি থেকে শুরু করে চাল, শ্রমিকের মজুরিসহ সব ধরনের পরিচালন ব্যয় বেড়েছে রেস্টুরেন্ট খাতে। তবে সে অনুযায়ী সব রেস্টুরেন্ট দাম সমন্বয় করেনি। কোনো কোনো রেস্টুরেন্ট অবশ্য পরিমাণ কমিয়ে এনেছে। আর এর সবটুকু চাপ পড়ছে ভোক্তার ওপর। কারণ প্রতিদিনই সারা দেশে লাখ লাখ মানুষ রেস্টুরেন্টের খাবার খেয়ে অভ্যস্ত। বিশেষ করে চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশই ছোট-বড় রেস্টুরেন্টের খাবারে প্রতিদিনই অভ্যস্ত। তাদের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে রেস্টুরেন্ট মালিকদের লাভ ছোট হয়ে আসছে। এতে করে ছোট ছোট রেস্টুরেন্টগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে বলে জানা গেছে।
রেস্টুরেন্ট মালিকরা জানান, রাজধানীর গুলশান, বনানী, ধানম-ি ও উত্তরার মতো বাণিজ্যিক এলাকায় পরিচালিত রেস্তোরাঁগুলোর ব্যয় তুলনামূলক বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে রান্নার জন্য প্রতিদিন একাধিক এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার হয়। পাশাপাশি সারা দিন শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, রেফ্রিজারেটর, ডিপ ফ্রিজ, ওভেন, কফি মেশিন এবং আলোকসজ্জা চালাতে বিদ্যুৎ প্রয়োজন। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।
গুলশানের একটি মাঝারি আকারের রেস্তোরাঁর মালিক খালেদ মাহমুদ জানান, গ্যাস, বিদ্যুৎ, কাঁচামাল ও শ্রমিক ব্যয় একসঙ্গে বাড়তে থাকলে খাবারের দাম একই অবস্থায় ধরে রাখা কঠিন। আবার দাম বাড়ালে তাতে ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বাড়লেও অনেক হোটেল ও রেস্তোরাঁ এখনো খাবারের মূল্য বাড়ায়নি। তবে দাম অপরিবর্তিত রাখতে গিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে। ভাত থেকে শুরু করে তরকারি, সালাদ সবদিকেই কাটছাঁট করা হচ্ছে।
বাড্ডার এক ছোট রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করেন শফিউল ইসলাম। তার রেস্টুরেন্টে বেশিরভাগই নিম্নআয়ের মানুষ খাবার খান। তবে মূল্যবৃদ্ধির এই সময়ে তিনি দাম না বাড়ালেও মাংসের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন, মাছের আকার খানিকটা ছোট করে এনেছেন। খাবারের সঙ্গে সালাদের কোনো পদই রাখছেন না।
তেজগাঁও নাখালপাড়ার একটি রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, অধিকাংশ গ্রাহকই আশপাশের অফিসের চাকরিজীবী। ভোক্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে এখনো খাবারের দাম বাড়ানো হয়নি। তবে এই অবস্থায় মূল্য সমন্বয় না করেও উপায় নেই। কারণ ইতিমধ্যেই লাভ সীমিত হয়ে এসেছে। যতটা সম্ভব রেস্টুরেন্টের ব্যয় সংকোচন করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, হঠাৎ করে মূল্যবৃদ্ধি করা হলে অনেকেই রেস্টুরেন্টে খাওয়া কমিয়ে দেন। বেশিরভাগ ক্রেতাই তুলনামূলক কম খরচের খাবারের দিকে ঝুঁকে যান। এর সঙ্গে করপোরেট অর্ডার, পারিবারিক অনুষ্ঠান, সামাজিক আয়োজন এবং অনলাইন ফুড ডেলিভারির চাহিদাও কিছুটা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ভোক্তারা ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছেন। ফলে খাবারের দাম সামান্য বাড়লেও এর প্রভাব বিক্রিতে পড়তে পারে।
সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, ‘ব্যয়ের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে না পেরে ইতিমধ্যে আমি নিজেই ৪টি রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি। কারণ গ্যাস-বিদ্যুৎসহ সব মিলে খরচ বেড়েছে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে বিক্রি কমে গেছে ৪০ শতাংশ। এই অবস্থায় রেস্টুরেন্ট চালানোই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ছাড়াও গ্যাসের সিলিন্ডার এখন আর সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে পাওয়া যায় না। নির্ধারিত দামের চেয়ে অন্তত ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেশি দাম দিতে হয়।’ তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি ঠিক না হলে এ খাতের ব্যবসায়ীরা টিকতে পারবেন না। এ জন্য দ্রুত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন।