ড্রেজারের নিচে হারিয়ে যাচ্ছে মেঘনার চর

একসময় মেঘনার বুকে জেগে ওঠা চর ছিল নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষের শেষ আশ্রয়। সরকারি উদ্যোগে সেখানে গড়ে ওঠে আশ্রয়ণ প্রকল্প, শুরু হয় চাষাবাদ, গড়ে ওঠে গবাদিপশুর খামার। কিন্তু এখন সেই চরগুলোই আবার নদীর গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, চরসংলগ্ন এলাকায় অব্যাহত বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙনের তীব্রতা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। প্রতিদিনই ঝুপঝুপ শব্দে নদীতে ধসে পড়ছে চর, আর মানুষের চোখের সামনে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও জীবিকার শেষ সম্বল।

সম্প্রতি ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা ইউনিয়নের কালুপুর এবং দৌলতখান উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের মধুপুর ও বৈরাগীর চর এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভোলা-লক্ষ্মীপুর সীমান্তঘেঁষা মেঘনা নদীতে সারিবদ্ধভাবে শতাধিক ড্রেজার ও বাল্কহেড বালু উত্তোলনে ব্যস্ত। যেখানে খনন চলছে, তার খুব কাছেই নদীতে ধসে পড়ছে চরের মাটি। স্থানীয়দের ভাষ্য, চর থেকে অল্প দূরত্বে ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলার কারণেই নদীর তলদেশ অস্বাভাবিকভাবে গভীর হচ্ছে এবং দ্রুত বাড়ছে ভাঙন।

কাচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ইউনিয়নের আটটি মৌজার মধ্যে সাতটি মৌজার প্রায় ৩ হাজার ৭০৫ একর জমি ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নব্বইয়ের দশকে নদী থেকে জেগে ওঠা বারাহিপুর ও রামদেবপুর মৌজাসহ প্রায় এক হাজার একর জমিতে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ৫২০টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, গত দুই বছরে অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের প্রভাবে ওই চর দুটি প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বর্তমানে সেখানে মাত্র ২০ থেকে ২৫টি পরিবার টিকে আছে। একই হুমকিতে রয়েছে মধুপুর ও বৈরাগীর চর।

কাচিয়া মাঝের চরের বাসিন্দা তানজির আলম মাঝি বলেন, ‘সরকার আমাদের পাকা ঘর দিয়েছিল। মনে হয়েছিল এবার হয়তো স্থায়ীভাবে বাঁচতে পারব। কিন্তু সেই ঘরও নদীতে চলে গেছে। এখন অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে জীবন কাটাতে হচ্ছে।’

বৈরাগীর চরের কৃষক আবুল হাসান বলেন, ‘প্রাকৃতিক ভাঙন আমরা বহু বছর ধরে দেখছি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে, তাতে মানুষের তৈরি বিপর্যয়ই বড় হয়ে উঠেছে। রামদেবপুর, বারাহিপুর, মধুপুর ও বৈরাগীর চর দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে ইলিশা লঞ্চঘাট, ফেরিঘাটের ব্লকবাঁধ, রাজাপুর ও শিবপুর এলাকার জমিতেও।’

মহিষ খামারি আবুল কাশেম জানান, ‘তার বাথানে প্রায় ৬৫০টি মহিষ রয়েছে। চরের ঘাসের মাঠই ছিল আমাদের ভরসা। এখন বালু কাটার কারণে সেই মাঠও নদীতে চলে যাচ্ছে। রাতে ড্রেজার চরের গা ঘেঁষে কাজ করে, দিনে কিছুটা দূরে সরে একইভাবে বালু তোলে।’

জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখা সূত্রে জানা গেছে, বাংলা ১৪২৮ সাল থেকে ধনিয়া, ইলিশা ও কাচিয়া ইউনিয়নের জলসীমায় চারটি বালুমহাল ঘোষণা করা হয়। চলতি বাংলা ১৪৩৩ সালে চারটির মধ্যে দুটি মহাল ইজারা দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্ধারিত মহালের বাইরে বিভিন্ন স্থানে বালু উত্তোলন চলছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ইজারা দেওয়া মহালের পরিবর্তে সুবিধাজনক স্থান থেকে বালু তোলা হচ্ছে। এতে চরসংলগ্ন এলাকায় ভাঙনের ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে।

এ বিষয়ে চার নম্বর বালুমহালের ইজারাদার ও ভোলা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি জামিল হোসেন বলেন, লাইসেন্স তাঁর নামে থাকলেও ইজারা পরিচালনার বিষয়টি জেলা বিএনপি দেখছে। তিনি বলেন, অনুমোদিত সীমার মধ্যেই বালু উত্তোলন হচ্ছে বলে শুনেছেন। তবে ভাঙনের অভিযোগের বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করবেন।

ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে সংস্থাটির কয়েকজন সাবেক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চরের খুব কাছ থেকে বালু উত্তোলন করলে নদীর তলদেশ দ্রুত গভীর হয়ে যায়। এতে পাড় ধসে পড়ে এবং ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

ভোলার নদীভাঙনের ইতিহাস দীর্ঘ। মেঘনার গতিপথ, স্রোত, পলি পরিবহন ও তীরের পরিবর্তনের সঙ্গে বহু বসতি ও জনপদের অস্তিত্ব বদলে গেছে। বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে ভোলার বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। ফলে নদীভাঙনের স্বাভাবিক প্রবণতার সঙ্গে মানুষের কর্মকাণ্ড যুক্ত হলে তার প্রভাব কতটা বাড়ছে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চরাঞ্চলের এই পরিবর্তন শুধু বসতভিটা বা কৃষিজমির ক্ষতি নয়। চরগুলোর ঘাসের মাঠের ওপর নির্ভর করে গবাদিপশুর বাথান, জলাভূমির ওপর নির্ভর করে মাছ ও নানা জলজ প্রাণী, আর এসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবিকা। ফলে একটি চর হারিয়ে গেলে ক্ষতির পরিধি শুধু জমির হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

ভোলা নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব এস এম বাহাউদ্দিন বলেন, ‘অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে বহুবার মানববন্ধন, স্মারকলিপি ও বিক্ষোভ হয়েছে। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় মানুষ একের পর এক ঘরবাড়ি হারাচ্ছে। নদী ও চর রক্ষায় এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।’

মেঘনার চর শুধু ভূমিখণ্ড নয়; এটি হাজারো মানুষের বসতি, কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও জীবিকার ভিত্তি। স্থানীয়দের প্রশ্ন, এই ভিত্তি যদি বালু উত্তোলনের চাপে একের পর এক নদীগর্ভে হারিয়ে যায়, তবে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনের সব উদ্যোগ কি শেষ পর্যন্ত আবারও মেঘনার স্রোতেই বিলীন হবে?