ইসলামে ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা

ইসলাম জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য চায়। ইবাদতে ভারসাম্য। ব্যয়ে ভারসাম্য। কথাবার্তায় ভারসাম্য। আবেগ ও আচরণে ভারসাম্য। ইসলামের এই ভারসাম্যপূর্ণ নীতিই মধ্যপন্থা। এটি ইসলামের সৌন্দর্যের অন্যতম দিক। একজন মুমিন দুনিয়াকে পুরোপুরি ছেড়ে দেয় না। আবার দুনিয়ার মোহেও ডুবে যায় না। সে আখেরাতকে সামনে রাখে। একই সঙ্গে দুনিয়ার দায়িত্বও পালন করে।

কোরআন মুসলিম উম্মাহকে মধ্যপন্থী জাতি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘এভাবেই আমি তোমাদের একটি মধ্যপন্থী জাতি করেছি, যাতে তোমরা মানুষের ওপর সাক্ষী হতে পারো এবং রাসুল তোমাদের ওপর সাক্ষী হন।’ (সুরা বাকারা ১৪৩)

এখানে মধ্যপন্থা শুধু মাঝামাঝি অবস্থান নয়। বরং ন্যায়, ভারসাম্য ও সঠিক পথ অবলম্বন করাই এর মূল কথা। কোনো বিষয়ে সীমালঙ্ঘন না করা। আবার দায়িত্ব পালনে অবহেলাও না করা।

ইবাদতে ভারসাম্য : ইসলাম মানুষকে ইবাদতের প্রতি উৎসাহিত করেছে। কিন্তু এমন ইবাদত করতে বলেনি, যার কারণে মানুষের স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনে সমস্যা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের ইবাদতে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, তিনি নামাজ পড়েন এবং ঘুমান। তিনি রোজা রাখেন এবং রোজা ছাড়েন। এরপর বলেছেন, যে তার সুন্নাহ থেকে বিমুখ হবে, সে তার অন্তর্ভুক্ত নয়। (সহিহ বুখারি)

একজন মুসলিম নামাজ পড়বে। কোরআন তেলাওয়াত করবে। রোজা রাখবে। জিকির করবে। পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্ব পালন করবে। জীবিকার চেষ্টা করবে। মানুষের অধিকার আদায় করবে।

দুনিয়া ও আখেরাতের ভারসাম্য : ইসলাম দুনিয়াকে অস্বীকার করে না। আবার দুনিয়াকেই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানাতেও নিষেধ করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তা দ্বারা আখেরাতের আবাস অনুসন্ধান করো। তবে দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেও না।’ (সুরা কাসাস ৭৭)

এই আয়াত মুসলিম জীবনের একটি সুন্দর ভারসাম্য তুলে ধরে। আখেরাত হবে প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু দুনিয়ার বৈধ প্রয়োজনও উপেক্ষা করা যাবে না। একজন মুসলিম হালাল উপার্জন করবে। নিজের পরিবারকে দেখবে। মানুষের উপকার করবে। নিজের প্রয়োজন পূরণ করবে। তবে এসব কিছু যেন তাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে না সরিয়ে দেয়।

ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা : ইসলাম অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও ভারসাম্যের শিক্ষা দিয়েছে। অপচয় যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি কৃপণতাও প্রশংসনীয় নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা যখন ব্যয় করে, তখন অপচয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না। বরং এ দুয়ের মধ্যবর্তী অবস্থান অবলম্বন করে।’ (সুরা ফুরকান ৬৭)

এ আয়াত মধ্যপন্থার একটি চমৎকার উদাহরণ। অপ্রয়োজনীয় কাজে অর্থ ব্যয় করা ঠিক নয়। আবার প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও সম্পদ আঁকড়ে ধরে রাখা ইসলাম সমর্থন করে না। একজন মুমিন নিজের প্রয়োজন পূরণ করবে। পরিবারের জন্য ব্যয় করবে। আত্মীয়স্বজন ও দরিদ্রদের সাহায্য করবে। পাশাপাশি অপচয় থেকে নিজেকে রক্ষা করবে।

খাদ্য ও পোশাকে ভারসাম্য : ইসলাম মানুষের বৈধ সৌন্দর্য ও ভালো খাবার গ্রহণকে নিষিদ্ধ করেনি। তবে সীমা লঙ্ঘন করতে নিষেধ করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা খাও ও পান করো। কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ ৩১)

অতিরিক্ত খাওয়া শরীরের জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত ভোগ মানুষকে অলস করে। আবার প্রয়োজনীয় খাবার থেকে নিজেকে বঞ্চিত করাও সঠিক নয়। একইভাবে পোশাকেও ভারসাম্য দরকার। পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পোশাক পরা বৈধ। কিন্তু অহংকার ও লোকদেখানো থেকে বেঁচে থাকা জরুরি।

কথাবার্তায় মধ্যপন্থা : মুমিনের কথাবার্তাও ভারসাম্যপূর্ণ হওয়া উচিত। অতিরিক্ত কথা যেমন অনেক সমস্যার কারণ হতে পারে, তেমনি প্রয়োজনীয় কথা না বলাও কখনো ক্ষতির কারণ হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমার চলার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করো এবং তোমার কণ্ঠস্বর নিচু করো।’ (সুরা লুকমান ১৯)

মুমিন অশালীন ভাষা ব্যবহার করবে না। কাউকে অপমান করবে না। অহেতুক তর্কে জড়াবে না। আবার সত্য বলার প্রয়োজন হলে নীরবও থাকবে না। তার কথা হবে সংক্ষিপ্ত, সুন্দর, প্রয়োজনীয় ও সত্যনিষ্ঠ।

রাগ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ : মানুষের স্বাভাবিক আবেগ আছে। রাগও তার একটি অংশ। ইসলাম রাগকে পুরোপুরি অস্বীকার করেনি। বরং রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখিয়েছে। মহান আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাদের গুণ বর্ণনা করে বলেছেন, ‘যারা রাগ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে।’ (সুরা আলে ইমরান ১৩৪)

রাগের সময় প্রতিশোধ নেওয়া সহজ। ক্ষমা করা কঠিন। কিন্তু মুমিন নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে। এর অর্থ এই নয় যে, অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে হবে। বরং ন্যায়বিচার বজায় রেখেও রাগকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

ধর্মীয় বিষয়ে বাড়াবাড়ি নয় : ইসলাম দ্বীন পালনে আন্তরিকতা চায়। বাড়াবাড়ি পছন্দ করে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দ্বীন সহজ। তিনি আরও সতর্ক করেছেন, যারা দ্বীনের বিষয়ে বাড়াবাড়ি করেছে তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। (সহিহ মুসলিম)

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। মধ্যপন্থা মানে ইসলামের বিধানকে নিজের ইচ্ছামতো সহজ করে নেওয়া নয়। ফরজকে ফরজ মানতে হবে। হারামকে হারাম মানতে হবে। সুন্নাহকে সম্মান করতে হবে।

পরিবার ও সমাজে ভারসাম্য : ইসলাম মানুষের সামাজিক দায়িত্বকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। একজন মানুষ শুধু নিজের জন্য বাঁচবে না। তার পরিবার আছে। আত্মীয়স্বজন আছে। প্রতিবেশী আছে। সমাজের মানুষ আছে। তাই নিজের ইবাদতের পাশাপাশি পরিবারের অধিকার আদায় করতে হবে। নিজের উন্নতির পাশাপাশি অন্যের কল্যাণের কথাও ভাবতে হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমার রবের তোমার ওপর অধিকার আছে। তোমার নিজেরও তোমার ওপর অধিকার আছে। তোমার পরিবারেরও তোমার ওপর অধিকার আছে। সুতরাং প্রত্যেক অধিকারীকে তার অধিকার দাও। (সহিহ বুখারি)

মতভেদেও মধ্যপন্থা : মানুষের মধ্যে মতভেদ থাকবে। চিন্তার পার্থক্য থাকবে। মতের অমিল থাকবে। ইসলাম মতভেদকে কেন্দ্র করে অন্যায়, বিদ্বেষ ও সম্পর্কচ্ছেদকে উৎসাহিত করে না। বরং ন্যায় ও শিষ্টাচার বজায় রাখতে শেখায়। নিজের মতকে সঠিক মনে করা যেতে পারে। কিন্তু অন্যকে অপমান করার অধিকার পাওয়া যায় না। মুমিন সত্যের পক্ষে থাকবে। তবে তার ভাষা হবে মার্জিত। আচরণ হবে সংযত।

মধ্যপন্থা মানে শিথিলতা নয় : অনেকে মনে করেন, মধ্যপন্থা মানে দ্বীনের ব্যাপারে কম কঠোর হওয়া। ধারণাটি সঠিক নয়। মধ্যপন্থা হলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকা। যেখানে কঠোরতা প্রয়োজন সেখানে দৃঢ় থাকা। যেখানে নমনীয়তা প্রয়োজন সেখানে নমনীয় হওয়া।

আজকের জীবনে মধ্যপন্থার প্রয়োজন : বর্তমান সময়ে মানুষের জীবনে ভারসাম্যের অভাব স্পষ্ট। কেউ দুনিয়ার পেছনে ছুটতে গিয়ে আখেরাত ভুলে যাচ্ছে। কেউ আবার দায়িত্বকে উপেক্ষা করে শুধু বাহ্যিক ধার্মিকতায় ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। কেউ অর্থ ব্যয়ে লাগামহীন। কেউ আবার পরিবারের প্রয়োজনেও ব্যয় করতে চায় না। কেউ রাগের বশে সম্পর্ক নষ্ট করছে। কেউ অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে নীরব থাকছে। ইসলামের মধ্যপন্থা এসব সমস্যার একটি সুন্দর সমাধান দেয়।

মুমিনের জীবন হবে ভারসাম্যপূর্ণ। তার ইবাদতে আন্তরিকতা থাকবে। জীবনে দায়িত্ববোধ থাকবে। কথায় সংযম থাকবে। ব্যয়ে পরিমিতি থাকবে। আচরণে নম্রতা থাকবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ়তা থাকবে। মানুষের প্রতি থাকবে দয়া ও সহমর্মিতা।

সুরা ফুরকানে আল্লাহ ‘রহমানের বান্দাদের’ বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। তারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে। অজ্ঞরা তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা শান্তির কথা বলে। তারা ব্যয় করার সময় অপচয়ও করে না, কৃপণতাও করে না।

এটাই ইসলামের সৌন্দর্য। এখানে ইবাদত আছে। আবার মানবিকতাও আছে। তাকওয়া আছে। আবার দায়িত্ববোধও আছে। দৃঢ়তা আছে। আবার কোমলতাও আছে। সুতরাং মধ্যপন্থা একজন মুমিনের জীবনধারার অংশ।

যে ব্যক্তি কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গড়ে তুলতে পারে, তার জীবন দুনিয়াতেও সুন্দর হয়। আখেরাতের জন্যও প্রস্তুত হয়।

লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক