মাদক আমাদের জাতীয় সংকট। এর ভয়াল থাবায় ধ্বংস হচ্ছে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র। বিশেষ করে, তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ মাদকাসক্ত হয়ে নিজেদের সম্ভাবনাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। চুরি, ছিনতাই, হত্যা, ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা, সড়ক দুর্ঘটনা এবং নানা ধরনের অপরাধের পেছনে মাদকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা প্রায়ই দেখা যায়। তাই মাদকমুক্ত সমাজ গঠন করা পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের প্রতিটি সচেতন মানুষের সম্মিলিত দায়িত্ব।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মানুষের আত্মিক, নৈতিক ও সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য ইসলাম এমন সব নীতিমালা দিয়েছে, যা অনুসরণ করলে মাদকাসক্তিসহ বহু সামাজিক ব্যাধি থেকে মানুষ নিরাপদ থাকতে পারে। ইসলাম শুধু মাদক গ্রহণকেই নিষিদ্ধ করেনি, বরং মাদকের দিকে নিয়ে যায় এমন সব পথও বন্ধ করার শিক্ষা দিয়েছে।
মাদক কেন এত ভয়াবহ : মাদক মানুষের বিবেককে অচল করে দেয়। মানুষ তখন ভালো-মন্দের পার্থক্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি নিজের পরিবার, সন্তান, সমাজ কিংবা ধর্মীয় দায়িত্বের প্রতিও উদাসীন হয়ে পড়ে। অনেক সময় সে নিজের সম্মান, সম্পদ এমনকি জীবনও ধ্বংস করে ফেলে।
বিশ্বজুড়ে পরিচালিত নানা গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ গুরুতর অপরাধের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে মাদকের সম্পর্ক রয়েছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি কর্মক্ষমতা হারায়, মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়, অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়ে এবং সমাজের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
ইসলামে মাদকের অবস্থান : ইসলামের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মানুষের জীবন, বুদ্ধি, সম্পদ, বংশধারা ও ধর্মকে সংরক্ষণ করা। মাদক মানুষের বুদ্ধি ও বিবেককে নষ্ট করে দেয়। তাই ইসলাম নেশাজাতীয় সবকিছুকে হারাম ঘোষণা করেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে বস্তু অধিক পরিমাণে নেশা সৃষ্টি করে, তার অল্প পরিমাণও হারাম।’ এই একটি নীতিই ইসলামের মাদকবিরোধী অবস্থানকে স্পষ্ট করে। অল্প হোক কিংবা বেশি, যে কোনো নেশাজাতীয় বস্তু থেকে মুসলমানকে দূরে থাকতে হবে।
কোরআনের ধাপে ধাপে শিক্ষা : কোরআনে নেশাজাতীয় বস্তুর নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে এসেছে। প্রথমে মানুষকে এর ক্ষতির কথা চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। পরে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ইবাদত থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। সবশেষে স্পষ্টভাবে মাদক ও জুয়াকে শয়তানের অপবিত্র কাজ হিসেবে বর্জনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই ধাপভিত্তিক শিক্ষা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেখায়। তা হলো, সমাজ সংস্কারে শুধু আইন যথেষ্ট নয়, বরং সচেতনতা, নৈতিক শিক্ষা এবং আত্মশুদ্ধিও জরুরি।
আত্মশুদ্ধিই সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিরোধ : মাদকবিরোধী সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে ওঠে মানুষের অন্তরে। যে ব্যক্তি আল্লাহভীতি, জবাবদিহির অনুভূতি এবং আখেরাতের বিশ্বাস ধারণ করে, সে সহজে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে না।
প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, দোয়া এবং সৎ মানুষের সাহচর্য একজন মানুষকে আত্মিকভাবে শক্তিশালী করে। ফলে শয়তানের প্ররোচনা এবং কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।
পরিবারই প্রথম দুর্গ : একটি শিশুর প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার পরিবার। বাবা-মা যদি সন্তানকে সময় দেন, তার বন্ধুদের সম্পর্কে খোঁজ রাখেন, ধর্মীয় শিক্ষা দেন এবং ভালোবাসাপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তোলেন, তাহলে সে বিপথে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।
অন্যদিকে পারিবারিক কলহ, অবহেলা, অতিরিক্ত শাসন কিংবা সীমাহীন স্বাধীনতা অনেক সময় সন্তানকে ভুল পথে ঠেলে দেয়। তাই পরিবারকে হতে হবে সচেতন ও দায়িত্বশীল।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব : স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা শুধু পাঠ্যবই পড়ানোর জায়গা নয়। এগুলো মানুষ গড়ার প্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা, চরিত্র গঠন, মাদকবিরোধী সচেতনতা এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা জরুরি।
শিক্ষক শুধু পাঠদানকারী নন, তিনি একজন অভিভাবকও। কোনো শিক্ষার্থীর আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা গেলে দ্রুত তার পরিবারকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
যুবসমাজকে ইতিবাচক কাজে সম্পৃক্ত করা : বেকারত্ব, হতাশা, উদ্দেশ্যহীন জীবন এবং খারাপ মানুষের সঙ্গ অনেক তরুণকে মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। তাই যুবকদের জ্ঞানচর্চা, খেলাধুলা, স্বেচ্ছাসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন, ইসলামি সাহিত্য পাঠ এবং সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। একজন ব্যস্ত ও লক্ষ্যনির্ভর তরুণের মাদকাসক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
বন্ধু নির্বাচনের গুরুত্ব : ইসলাম ভালো সঙ্গ গ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। মানুষ সাধারণত তার বন্ধুদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। ভালো বন্ধু মানুষকে নেক কাজের দিকে আহ্বান করে, আর খারাপ বন্ধু ধীরে ধীরে তাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়।
তাই তরুণদের উচিত এমন বন্ধু নির্বাচন করা, যারা নামাজ পড়ে, সত্য কথা বলে, মিথ্যা ও অন্যায় থেকে বিরত থাকে এবং ভালো কাজে উৎসাহ দেয়।
সমাজ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা : মসজিদ, মক্তব, মাদ্রাসা, ইসলামি সংগঠন এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো মাদকবিরোধী সচেতনতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। জুমার খুতবা, ওয়াজ-নসিহত, সেমিনার, আলোচনা সভা এবং যুবসমাজের জন্য নিয়মিত দিকনির্দেশনামূলক কার্যক্রম আয়োজন করা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের করণীয় : মাদক নির্মূলে কঠোর আইন প্রয়োগ যেমন জরুরি, তেমনি সীমান্তে মাদক পাচার রোধ, অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান, পুনর্বাসন কেন্দ্রের মানোন্নয়ন এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র, সমাজ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে মাদকমুক্ত সমাজ গঠন সম্ভব নয়।
লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ
