দেশে বড় ঋণখেলাপিদের কেউ কেউ ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন, আবার অনেকে অর্থ পরিশোধ না করে বিদেশে অবস্থান করছেন। দেশে থাকা তাদের সম্পদ থেকে মিলছে না পাওনা টাকা। দীর্ঘদিন মামলা করেও কাক্সিক্ষত ফল না আসায় এবার তাদের দেশের বাইরে থাকা সম্পদে হাত দিতে যাচ্ছে ব্যাংকগুলো। গতকাল রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য জানান।
মুখপাত্র বলেন, ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন ৪২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে বিদেশে তাদের অর্থ-সম্পদ খুঁজতে নামানো হয়েছে আটটি আন্তর্জাতিক আইন ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানকে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, বেলজিয়ামসহ ১২টি দেশে চলছে এ অনুসন্ধান। এ পদক্ষেপের বড় বৈশিষ্ট্য সম্পদ উদ্ধার না হলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো পারিশ্রমিক দিতে হবে না। সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধার করতে পারলে তবেই চুক্তি অনুযায়ী উদ্ধারকৃত অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে পাবে তারা। ফলে ব্যাংকগুলোকে শুরুতেই বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের ঝুঁকিও থাকছে না।
আরিফ হোসেন খান বলেন, ২০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে যারা খেলাপি হয়েছেন, তাদের কিছু ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে থাকতে পারে। আবার কোনো কোনো ঋণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক বা ঋণগ্রহীতাকে দেশে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ ধরনের ঋণের বিষয়ে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। এ ক্ষেত্রে বিদেশে থাকা অর্থ-সম্পদ শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্র্যান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি ও পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার ও ক্রল, ইওয়াই ও ডেন্টনস, রহমান রাভেলি ও ইন্টারপাথ, বিসিজি ও এইচএইচআর এবং অ্যানিমাস অ্যাসোসিয়েটস।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঋণখেলাপি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে বিদেশে থাকা বাড়ি, জমি, ব্যবসা, ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগসহ বিভিন্ন ধরনের সম্পদের অবস্থান ও পরিমাণ শনাক্তের চেষ্টা করছে। সম্পদের তথ্য পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী তা স্থগিত, জব্দ বা আটকের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বিদেশে পাচার করা অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ অবশ্য আরও আগে শুরু হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে সরকার গঠিত যৌথ তদন্ত দলের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পাচার করা অর্থ পুনরুদ্ধারে কাজ করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), কাস্টমসের গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি) এবং আয়কর বিভাগের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)। একই সঙ্গে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর পাওনা খেলাপি ঋণ আদায়েও বিদেশি আইন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে অর্থঋণ আদালতে মামলা চললেও বিদেশে থাকা সম্পদের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর এককভাবে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ সীমিত। কারণ, কোন দেশে কীভাবে সম্পদ জব্দ করা যাবে, ব্যাংক হিসাব স্থগিত করা যাবে কি না; কিংবা সম্পদ বিক্রি করে অর্থ দেশে ফেরত আনা যাবে কি না এসব বিষয় নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর। এ কারণে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থপাচারবিরোধী আইন সম্পর্কে অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগানো হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে যেসব দেশে পাচার করা অর্থ বা সম্পদ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, সেসব দেশকে অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড, হংকং, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব দেশ বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। দেশগুলোতে বিশেষ করে রিয়েল এস্টেট, ব্যাংক আমানত, কোম্পানির মালিকানা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ-সম্পদ গড়ে তোলা হয়ে থাকতে পারে। তাই ঋণখেলাপিদের আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের তথ্য ধরে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, এ পদ্ধতিতে অনুসন্ধানকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোরও সম্পদ উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপের চাপ থাকবে। কারণ, শুধু অনুসন্ধানে তারা পারিশ্রমিক পাবে না; অর্থ বা সম্পদ উদ্ধার করতে পারলেই তাদের আয় হবে।
তবে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলেছেন, বিদেশে সম্পদ শনাক্ত করাই শেষ কথা নয়। সম্পদ জব্দ, আদালতের অনুমোদন, মালিকানা প্রমাণ, মামলা পরিচালনা এবং শেষ পর্যন্ত অর্থ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে।
জনতা ব্যাংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, বিদেশে সম্পদ শনাক্ত ও আইনগতভাবে জব্দ করার পর তা নিষ্পত্তি করে অর্থ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। ফলে পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লাগতে পারে। তবে বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত করা গেলে দীর্ঘদিনের বড় খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর অগ্রগতি হবে। তবে উদ্যোগটির সফলতা নির্ভর করবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকরভাবে সম্পদ শনাক্ত করতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেসব সম্পদ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা যায় কি না, তার ওপর।