সালমান শাহ হত্যা মামলা

অভিনেতা ডন গ্রেপ্তার, কারাগারে প্রেরণ

নায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলার আসামি খল চরিত্রের অভিনেতা ডনকে (আশরাফুল হক) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত বছরের ২১ অক্টোবর রমনা থানায় ডনসহ ১১ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর। ওই মামলায় তাকে চার নম্বর আসামি করা হয়। এরপর থেকে আত্মগোপনে যান ডন। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থেকে গতকাল রবিবার সকালে একটি ফ্লাইটে ওমরাহ করতে সৌদি যাওয়ার সময় শাহজালাল বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে হেফাজতে নেয়। বিষয়টি সিআইডিকে জানালে তারা গিয়ে ডনকে গ্রেপ্তার করে। পরে আদালত তাকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেয়। গতকাল বিকেলে সিআইডির ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের বিশেষ পুলিশ সুপার গোলাম বেনজীর এসব তথ্য জানান।

পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সালমান শাহ (চৌধুরী মুহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন) হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত অভিনেতা ডন। গত বছর আদালত আসামিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ওই সময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে আসামিদের দেশত্যাগে বাধা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেয়। এর মধ্যে গতকাল রবিবার সকাল ৬টার দিকে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যাওয়ার জন্য ডন বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন করার সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গোলাম বেনজীর বলেন, সালমান শাহর মৃত্যুর ২৯ বছর পর আদালতের নির্দেশে গত বছর ২১ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় একটি হত্যা মামলা করেন সালমান শাহর মামা আলমগীর। মামলায় ১১ জনকে আসামি করা হয়। আদালতের নির্দেশে মামলার তদন্ত করছে সিআইডি। ওই মামলায় আসামিরা হলেন সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, সামিরা হকের মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, অভিনেতা ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবি, আব্দুস সাত্তার, সাজু ও রিজভি আহমেদ ফারহাদ।

এর আগে, গত বছর ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক রমনা থানার ওসিকে সালমান শাহর ‘অস্বাভাবিক মৃত্যু’ মামলাকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। গত ২৩ জুলাই ষষ্ঠবারের মতো পিছিয়ে আগামী ৩০ আগস্ট সালমান শাহ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করা হয়।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর নীলা চৌধুরী, তার স্বামী কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী ও ছোট ছেলে শাহরান শাহ রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহর সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, সালমান ঘুমাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর প্রডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে সালমানের কিছু হয়েছে বলে জানান। দ্রুত বাসায় ফিরে তারা সালমানকে শয়নকক্ষে নিথর অবস্থায় দেখতে পান। তখন কয়েকজন নারী তার হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন। পাশের কক্ষে সামীরার আত্মীয় রুবি বসে ছিলেন।

জানা যায়, ঘটনার দিন ওই বাসায় মারা যান জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ। তার মৃত্যুর ঘটনায় বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী অপমৃত্যুর মামলা করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে নেওয়ার আবেদন করেন তিনি। অপমৃত্যু ও হত্যার অভিযোগ একসঙ্গে তদন্তের জন্য আদালত সিআইডিকে নির্দেশ দেন।

১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। সেখানে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়। ওই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালত প্রতিবেদনটি গ্রহণ করেন। তবে সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন মামলা করেন সালমানের বাবা।

দীর্ঘদিন মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে জল্পনাকল্পনা থাকলেও তেমন অগ্রগতি ছিল না। সর্বশেষ আসামি ডন গ্রেপ্তারের পর মামলার তদন্তে অগ্রগতি হবে বলে আশা সিআইডি। এসএসপি গোলাম বেনজীর বলেন, ডনকে বিকেলে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তোলা হয়। সেখানে তাকে সালমান শাহ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে নেওয়ার আবেদন করা হয়।

এদিকে মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে চলতি বছরের ২০ মে সালমান শাহর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। ২৪ মে আদালত মরদেহ উত্তোলন ও ময়নাতদন্তের অনুমতি দেন। তবে বাদীপক্ষ ওই আদেশ বাতিল চেয়ে আবেদন করলে তা নথিভুক্ত করেন আদালত।

ডনের গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী বলেন, সালমান শাহকে হত্যাকা-ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল এই ডন। শুধু তা-ই নয়, সালমানের মৃত্যুর পর সে আমাকে নানাভাবে অপমান করেছে এবং আমার ছেলের নামে অনেক মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। আজ সে গ্রেপ্তার হয়েছে। সব প্রমাণ একদিন হবে। সালমান হত্যার সঙ্গে জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তার করা হোক। আশা করি, সন্তান হত্যার বিচার একদিন পাব।

আদালতে মাথা নিচু ছিল ডনের : এজলাসে মাথা নিচু করে রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত অভিযোগ শোনেন মামলার আসামি ডন। পরে শুনানি শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয় আদালত। এদিন আদালতে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। এক আসামির স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে সালমান শাহকে হত্যার চুক্তির কথা সেখানে উঠে আসে। বিকেল ৫টার দিকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা এজলাসে উঠলে ডনের বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। এ সময় ডনকে মাথানিচু করে দাঁড়িয়ে আদালতে উপস্থাপিত অভিযোগ শুনতে দেখা যায়। শুনানির শুরুতে তাকে পুলিশের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলতেও দেখা যায়।

শুনানিতে ঢাকা মহানগর আদালতের পিপি ওমর ফারুক ফারুকী আদালতকে বলেন, সালমান শাহ হত্যা মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে চলমান এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা। ডন দেশ ছাড়ার সময় বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তিনি বিদেশ চলে গেলে আজীবনের জন্য পলাতক থাকতে পারেন। একটি ঘটনার পর সালমান শাহ হত্যা মামলার মোড় ঘুরে যায়। সালমান শাহকে হত্যার পর তার ছোট ভাইকে অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি অভিযোগ করা হয়েছিল।

ওই মামলায় এক আসামির স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আদালতে বলেন, ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে সালমান শাহকে হত্যার চুক্তির কথা সেখানে উঠে আসে। এমন আসামিকে কারাগারে রাখা প্রয়োজন বলেও আদালতে যুক্তি দেন তিনি। শুনানি শেষে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ডনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয় আদালত। তবে ডনের পক্ষে কোনো জামিন আবেদন করা হয়নি। ফলে তার পক্ষে জামিনের বিষয়ে কোনো শুনানি হয়নি।