গেল বছরের ন্যায় এবারও পবিত্র হজের কোটা হারানোর শংকায় আছে বাংলাদেশের এজেন্সিগুলো। গতবার হজযাত্রী কম হওয়ায় এজেন্সিগুলো তাদের কোটা পূরণ করতে পারেনি। এদিকে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত কোটা পূরণে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হলে সৌদি কর্তৃপক্ষও আগামীতে বাংলাদেশের জন্য হজযাত্রীর কোটা কমিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। গত ২৭ জুলাই হজের নিবন্ধন শুরু হলেও আশানুরূপ ফল পাচ্ছে না এজেন্সিগুলো। ইতিমধ্যে তিন ক্যাটাগরির প্যাকেজ ঘোষণা করা হলেও গতবারের চেয়ে খরচ বেড়েছে। গত ১৫ দিনে ১১২ জন হজে যাওয়ার জন্য প্রাথমিক নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় নিবন্ধন করার সংখ্যা কিছুটা বেশি। এ নিয়ে এজেন্সিগুলো আছে দুশ্চিন্তায়।
২০২৭ সালে এক লাখ ২৭ হাজার হজযাত্রী যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে সৌদি সরকার। গত বছরও একই সংখ্যক হজযাত্রী যাওয়ার অনুমতি দিলেও কোটা পূরণ হয়নি। সাকল্যে ৮০ হাজারের মতো হজে গেলেও এবার আরও কমে যাওয়ার শংকা দেখা দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশের কোটা হারানোর শংকা আছে।
এজেন্সির মালিকরা বলছেন, বিমান ভাড়া কিছুটা কমলেও অন্যান্য খরচ আগের মতোই আছে। সৌদি সরকারের সঙ্গে আলোচনা না করলে হজের খরচ কিছুতেই কমবে না। এ ক্ষেত্রে সৌদি সরকারকে কৌশলে চাপ দিতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে, গত কয়েক বছর ধরে খরচের পরিমাণ বেশি হওয়ায় হজযাত্রী কমে গেছে। আর না হয় বিমান ভাড়া আরও কমলেও যাত্রী বাড়বে না। সৌদি আরবে আবাসন, পরিবহনসহ অন্যান্য সেবার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় হজের সার্বিক ব্যয় কমছে না। খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক মন্দা, অতিরিক্ত হজ প্যাকেজ মূল্য এবং দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতাই এবারের হজের নিবন্ধনে চরম স্থবিরতার অন্যতম কারণ। হজের খরচ কমাতে প্রধানমন্ত্রীকে এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন তারা।
সার্বিক বিষয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, যারা হজে যাবেন, তারা অনেক আগে থেকেই নিয়ত করে রাখেন। তারা নির্ধারিত সময়েই নিবন্ধন করবেন বলে আশা করছি। তবে নিবন্ধনের সময় বাড়ানোর সুযোগ না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। তিনি বলেন, হজের খরচ কমাতে আমরা সৌদি সরকারের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছি। সামনে আরও বৈঠক হবে। চেষ্টা করছি হজের খরচ কমাতে।
হজ অনুবিভাগ সূত্র জানায়, প্রতি বছরের মতো সৌদি সরকার এবারও বাংলাদেশের জন্য একটি নির্দিষ্ট কোটা নির্ধারণ করে দিয়েছে। নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে আবেদনকারীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক কম। কোটা পূরণ না হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য কোটা কমিয়ে দিতে পারে সৌদি কর্তৃপক্ষ। নিবন্ধনে সাড়া না মেলার প্রধান কারণগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তদের জন্য বর্তমান হজ প্যাকেজের খরচ বহন করা প্রায় অসম্ভব। বিমান ভাড়া, সৌদিতে হোটেল ভাড়া ও মোয়াল্লেম ফি অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে হজ প্যাকেজের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। আবার টাকার বিপরীতে রিয়াল ও ডলারের বিনিময় হারও বেড়েছে। মুদ্রাস্ফীতির কারণে মানুষের সঞ্চয়ও কমে গেছে, যার প্রভাব পড়েছে হজের মতো বড় ব্যয়ের ক্ষেত্রে।
ফ্লাইট সংখ্যা বেড়ে ৮৫, লাভবান হবেন হজযাত্রী : বেবিচক চেয়ারম্যান মোস্তফা মাহমুদ হাসান সিদ্দিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ৩ আগস্ট তিনি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে সৌদি আরব সফরে যান। সফরে দুই দেশের মধ্যে নতুন বিমান চলাচল চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে সপ্তাহে ৪৯টি ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি ছিল। নতুন চুক্তির ফলে সাপ্তাহিক ফ্লাইট ৩৫টি বেড়ে ৮৫-তে উন্নীত হয়েছে। এতে টিকিটের সংকট ও দাম কমবে। পাশাপাশি হজ ও ওমরাহ ফ্লাইট পরিচালনায় দীর্ঘদিনের বিভিন্ন জটিলতারও সমাধান হবে। সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে চুক্তির বিষয়টি ঘোষণা করা হবে।
বিমান মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পবিত্র হজের পুণ্য ভূমি মক্কা ও মদিনার উদ্দেশ্যে যাত্রার সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই ঘনীভূত হচ্ছে এক নতুন সংকট। সাধারণ বছরগুলোতে যেখানে হজের নিবন্ধন শুরুর পর কোটা পূরণের জন্য রীতিমতো হুড়োহুড়ি পড়ে যায়, সেখানে এবার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২৪ সেপ্টেম্বর হজের নিবন্ধনের সময় শেষ হবে। কিন্তু এখনো নিবন্ধনে কাক্সিক্ষত সাড়া মিলছে না। গত বছরের মতো এবারও কোটা হারানোর ঝুঁকি আছে। তা ছাড়া নিবন্ধনের এই মন্দা পরিস্থিতির মধ্যেই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, সৌদি এয়ারলাইনসের বাইরে তৃতীয় এয়ারলাইনসকে যুক্ত করে হজের ডেডিকেটেড ফ্লাইট বাড়ানোর তোড়জোড় চলছে গত এক মাস ধরে।
সøট সংকট কেটে যাবে : প্রতি বছর হজ মৌসুমে শেষ মুহূর্তে স্লট সংকট, ফ্লাইট পুনঃতফসিল ও পরিচালনাগত জটিলতার কারণে হাজিদের যে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়, সৌদির সঙ্গে নতুন চুক্তির ফলে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। স্থায়ী ও কার্যকর স্লট ব্যবস্থাপনার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে নতুন চুক্তিতে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে সুবিধাজনক সময়ে অবতরণ ও উড্ডয়নের স্লট পেতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে গভীর রাত বা অনুপযুক্ত সময়ে স্লট পাওয়ায় পরিচালন ব্যয় বেড়েছে এবং যাত্রীদেরও ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।
নতুন পদক্ষেপ কার্যকর হলেই সমস্যা : সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) মহাসচিব ফরিদ আহমেদ মজুমদার বলেছেন, ‘সৌদি সরকারের নতুন নিয়মে ক্যাটারিং সার্ভিস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া ডি ক্যাটাগরি প্রত্যাহারসহ আরও বেশ কিছু নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বাংলাদেশিদের স্বাচ্ছন্দ্যে হজ পালন করা কঠিন হবে। আমরা বিষয়টি নিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলেছি এবং দ্রুত পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
প্যাকেজ ঘোষণাতেও কাজ হচ্ছে না : ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা উল্লেখ করে সরকারি ও বেসরকারিভাবে একাধিক হজ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। তিন দিনের হজ মেলাও হয়েছে। তবু সাড়া মেলেনি। সরকারি ব্যবস্থাপনায় এবার হজ পালনে খরচ হবে ন্যূনতম ৫ লাখ ৫ হাজার ৬৪৮ টাকা, যা গতবারের চেয়ে ৩৮ হাজার ৫১১ টাকা বেশি। আর বেসরকারিভাবে সর্বনিম্ন খরচ হবে ৫ লাখ ১৩ হাজার ৬৪৮ টাকা। এবার বিমান ভাড়া প্রায় ২৫ হাজার টাকা কমানোর পরও হজের মোট খরচ বাড়ল কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গতবারের প্যাকেজটি ছিল খাবার ছাড়া। এবার খাবার বাবদ নতুন করে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া মিনা ও আরাফাতে সৌদি সরকার সর্বনিম্ন ক্যাটাগরি (ডি ক্যাটাগরি) বাদ দেওয়ায় খরচ বেড়েছে ৭০০ রিয়াল (২৩ হাজার ২৪০ টাকা)। আবার বিনিময় হারের জন্য বৃদ্ধি পেয়েছে তিন হাজার ৮২৫ টাকা। যার কারণে খরচ কিছুটা বেড়েছে। অনেক এজেন্সি লোভনীয় প্যাকেজ ঘোষণা করেও হজযাত্রী পাচ্ছে না।
ভোগান্তি এড়াতে বেবিচকের প্রস্তুতি : বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিবন্ধনের হার কম হলেও বেবিচক কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে নেই। তাদের যুক্তি, শেষ মুহূর্তে যদি নিবন্ধনের সংখ্যা হঠাৎ বৃদ্ধি পায় কিংবা সৌদি সরকার যদি কোটা সমন্বয়ের কোনো বিশেষ সুযোগ দেয়, তবে পরিবহন সংকটের কারণে যেন কোনো হজযাত্রীর যাত্রা ব্যাহত না হয়, সে প্রস্তুতি রয়েছে বেবিচকের। তা ছাড়া হজ ফ্লাইটের সিডিউল বিপর্যয় রোধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।