সবুজ উন্নয়নের সুযোগ উপেক্ষিত

স্বাধীনতার পরের বছর ১৯৭২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে মোট চা উৎপাদিত হয়েছিল ৩ কোটি কেজি। ২০২৩ সালে দেশে রেকর্র্ড পরিমাণ ১০ কোটি কেজি চা উৎপাদিত হয়। পরের ২ বছরও (২০২৪ ও ২০২৫) চায়ের উৎপাদন কাছাকাছি পর্যায়েই ছিল। জনসাধারণের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় চা অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় পুরোটাই পূরণ করছে। এতে সাশ্রয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার।

উৎপাদন না বাড়লে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর চা আমদানিতে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হতো। চা-শিল্প যুক্ত করেছে অসংখ্য ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের ব্যবসাকে, যার মাধ্যমে বাগানঘন এলাকায় কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বেড়েছে। কিন্তু চা-শিল্পকে ঘিরে শ্রমিক ও মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগের অন্ত নেই। অভিযোগ রয়েছে মালিকপক্ষেরও।

মালিকপক্ষ বলছে, উৎপাদিত চায়ের সঠিক বা ন্যায্য মূল্য তারা পায় না। ভূমি মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরের বিধিনিষেধও রয়েছে। অর্থায়ন বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। এসব সমস্যার নিরসনে সরকারের নীতি-সহায়তাও মেলে না। অর্থ সংকটে গত ১০ বছরে কোনো বাগানই নতুন চা-গাছ লাগাতে পারেনি। অধিকাংশ বাগানের বড় অংশ জুড়ে চা-গাছ পুরনো ও বৃদ্ধ হয়ে পড়েছে। এসব চা-গাছের প্রুনিং (ছাঁটাই) ও প্লাকিং (উপড়ে ফেলা) করা হয়নি। ফলে কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া যাচ্ছে না।

এতকিছুর পরও মালিকপক্ষ চা-শিল্পকে নিয়ে দেশ রূপান্তরকে বিপুল সম্ভাবনার গল্প শুনিয়েছেন। তারা জানান, পরিবেশের ক্ষতি না করেই ব্যাপকভাবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে চা-বাগান ব্যবহৃত হতে পারে। সরকারের সদিচ্ছার অভাবে সে সুযোগ উপেক্ষিতই থেকে গেছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বিদ্যমান বিধিনিষেধের প্রত্যাহারসহ অর্থায়ন-সুবিধা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের (বিটিবি) তথ্য অনুযায়ী দেশে মোট ১৭২টি চা বাগান আছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আওতাধীন ভূমিসহ এসব বাগানে চা চাষের উপযোগী সম্মিলিত জমির পরিমাণ ২ লাখ ৯৪ হাজার একর। তার মধ্যে ‘চায়ের দেশ’ বলে পরিচিত সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলায় বড় ৯২টি চা-বাগান রয়েছে। ১৮৪০ সালে বাংলাদেশে পরীক্ষামূলকভাবে চট্টগ্রামে প্রথম চা চাষ হলেও ১৪ বছর পর বাণিজ্যিকভাবে প্রথম সফল চা চাষের শুরু হয় ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়া চা-বাগানে। চা-বাগানগুলোতে এই বিপুল পরিমাণ জমির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অনাবাদি থাকে। কারণ, সব স্থানে চা হয় না। অনাবাদি জমি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করতে চান বাগানমালিকরা। এতে দুটি লাভ। এক. জনবহুল এ দেশের আবাদি জমি বা বসবাসের জমি সৌরবিদ্যুতের প্যানেল বসানোর হাত থেকে রক্ষা পাবে। দুই. বাগানমালিকরা বিকল্প অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে বিনিয়োগের মাধ্যমে সরকারের জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আর্থিকভাবে লাভবান হবে। তাতে অর্থনীতির ওপর চাপ কমানোসহ অনেক উপকার হবে। প্রথমত. দেশের মানুষ স্বল্প দামে চা খেতে পারবে। দ্বিতীয়ত. চা-বাগানে নতুন ক্ষেত তৈরিতে অর্থের সংকুলান হবে, উৎপাদন বাড়বে ও আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় হবে না। তৃতীয়ত. শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও তা নিয়মিত পরিশোধে বাগানমালিকদের ঋণের জন্য বসে থাকতে হবে না। চতুর্থত. সবুজ উন্নয়নে ব্যাঘাত ঘটবে না।

দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান বলেছেন, ‘চা-শিল্পের উদ্যোক্তাদের দাবি-দাওয়ার মধ্যে রয়েছে, ব্যাংকে খেলাপি হয়ে পড়া ঋণ অন্য শিল্পের মতো একটি পৃথক হিসাবে স্থানান্তর করে দীর্ঘমেয়াদে পরিশোধের ব্যবস্থা করা, কৃষিঋণের সুদহারে নতুন ঋণ বিতরণ, চা-বাগানের জমিতে চা ছাড়া অন্য শস্য চাষে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে বহুমুখী ও অর্থকরী ফসল চাষের অনুমোদন, চা-বাগানের অব্যবহৃত জমিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প করার অনুমতি, চা-বাগানকেন্দ্রিক পর্যটন গড়ে তোলা এবং উৎপাদিত চা নিলামে বিক্রিতে ন্যায্যমুল্য নিশ্চিত করা।’

বিটিএ সভাপতি বলেন, ‘বাগানে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল স্থাপনের অনুমতি পেলে বাগানমালিকরাই বিনিয়োগ খুঁজে আনবে। ন্যায্যমুল্যে সরকারকে আমরা বিদ্যুৎ দেব। সরকার আমাদের দাবি-দাওয়া পূরণ করলে চা-বাগানের উদ্যোক্তারা স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে। শ্রমিকদের প্রতি আরও যত্নবান হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করবে এবং শ্রমিককে স্বল্প মজুরি দেওয়ার কলঙ্ক থেকে মুক্তি পাবে। নন-ওয়ার্কার বা শ্রমিকদের যে অংশ চা-বাগানে কাজ করার সুযোগ পায় না তারা কর্মসংস্থান পাবে এবং শ্রমিক-পরিবারের জীবনমানের উন্নতি ঘটবে।’

গত ২৬ জুলাই বাংলাদেশ সচিবালয়ে এসব দাবি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন চা-বাগান মালিকপক্ষ। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু বৈঠকের পরে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘চা-শিল্পের সমস্যা চিহ্নিত করে কার্যকর সমাধানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং চা শিল্প-সংশ্লিষ্ট কমিটির প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।’

তিনি জানান, ‘বৈঠকে দেশের বাগানমালিক ও সংশ্লিষ্টরা চা-শিল্পের বর্তমান অবস্থা, উৎপাদন ব্যয়বৃদ্ধি, খেলাপি ঋণ, অর্থায়ন সংকট এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে কিছু প্রস্তাব পেশ করেছেন। এ শিল্পের বিকাশে সরকার প্রয়োজনীয় নীতিগত, আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেবে।’

প্রসঙ্গত, ব্রিটিশরা এ দেশে চা-চাষ শুরু করলেও সময়ের পরিক্রমায় অনেক বাঙালি উদ্যোক্তা এ শিল্পে সাফল্য পেয়েছে।

ব্রিটিশ মালিকানার কোম্পানি দিওন্দি টি অ্যাস্টেটের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্যাস-বিদ্যুতের বাড়তি খরচ, কারখানা (প্রক্রিয়াজাতকরণ) এবং মেশিনারিজ, পরিবহন, ওভারহলিং ও অন্যান্য ইনপুট কেনার খরচ সামলাতে গিয়ে অনেক বাগানমালিক শ্রমিকদের মজুরি সময়মতো পরিশোধ করতে পারছে না। নতুন বাগান সৃজন করাও সম্ভব হয়নি। পুরনো চা-গাছ থেকে যে ফলন হয় তা বিক্রি করেও উৎপাদন খরচ উঠে না।’ তিনি জানান, তার বাগানে প্রায় ৪ হাজার শ্রমিকের ছয় সপ্তাহের বেতন বকেয়া হয়েছিল। তা কমিয়ে ১ সপ্তাহে আনা হয়েছে। ব্যাংকঋণ না পেলে অবশিষ্ট অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। মজুরি পরিশোধের দাবি নিয়ে বাগানে বর্তমানে শ্রমিকদের আন্দোলন চলছে।

ম্যাকসন ব্রাদার্স টি অ্যাস্টেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মালিক হুমায়ুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশীয় চা-শিল্পকে ঘিরে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। শ্রমিকদেও উসকানি দিয়ে প্রায়ই কর্মপরিবেশ নষ্ট করা হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাগানের সার্বিক উৎপাদন। ষড়যন্ত্রকারীরা দেশের চা-শিল্পকে ধ্বংস করতে পারলে প্রতিবেশী দেশ থেকে চা আমদানি করে  ফায়দা লোটার চেষ্টা করবে। সব সরকারের আমলেই ষড়যন্ত্রকারীরা সক্রিয় থাকে।’

চা উৎপাদনে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে দেশের উত্তরের জেলা পঞ্চগড়। সেখানে সমতল ভূমিতেও বাণিজ্যিকভাবে বিপুল পরিমাণ চা উৎপাদিত হচ্ছে। চট্টগ্রামেও চা চাষের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।