পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বাজেট বরাদ্দ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে নতুন টানাপড়েন শুরু হয়েছে। আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকর্মের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিত ইউজিসি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব পদ্ধতিতে তা বণ্টন ও তদারকি করত। গবেষণা-বরাদ্দের প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিবর্তন করে তদারকি ও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নিতে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, গবেষণার অর্থ বরাদ্দ ও ব্যবহারে ইউজিসির নিয়ন্ত্রণ বাড়লে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা সংকুচিত হবে; পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্বিত হবে।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ইউজিসির দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত গবেষণা-প্রকল্প নির্বাচন, অর্থ বরাদ্দ, অর্থ ছাড় ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে কার কতটুকু কর্তৃত্ব থাকবে তা নিয়েই বিরোধ তৈরি হয়েছে। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা খাতে অনিয়ম, অস্বচ্ছতা বা অর্থের যথাযথ ব্যবহার না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে; অন্যদিকে এসব সমস্যার সমাধানের নামে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ গবেষণার স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের ওপর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গবেষণায় অর্থের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি গবেষণার বিষয় নির্বাচন ও পরিচালনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বাধীনতাও জরুরি। ইউজিসি ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সমঝোতা হওয়া উচিত।
জানা গেছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের একাধিক বৈঠকে উপাচার্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইউজিসির বিরুদ্ধে। এরপর তারা ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদের সঙ্গে গত ৯ জুলাই এক বৈঠকে মিলিত হন। ওই বৈঠকে কোনো সমঝোতা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ ইউজিসির সঙ্গে আলোচনার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করেছে। ওই কমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ রক্ষা করে করণীয় নির্ধারণ করবে। কমিটির সদস্যরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের সভাপতি ও রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) ভিসি অধ্যাপক ড. এসএম আবদুর রাজ্জাক, অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম শহিদুল ইসলাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. একেএম মতিনুর রহমান, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল লতিফ। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ইউজিসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে কমিটির পুনরায় বৈঠকে হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি। আগামী ১২ আগস্ট ইউজিসিতে তাদের বৈঠকের তারিখ চূড়ান্ত করা হয়েছে।
গত ৮ আগস্ট বিকেলে দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ড. এসএম আবদুর রাজ্জাকের। তিনি বলেন, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অহংকারের জায়গা হচ্ছে তার স্বায়ত্তশাসন। এখন ইউজিসি যদি গবেষণা-বরাদ্দ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় তাহলে তা খর্বিত হবে। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে নেবে না। এ ছাড়া ৫৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম ম্যানেজ করা ইউজিসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। এ মুহূর্তে সে সক্ষমতা ইউজিসির আছে বলে আমরা মনে করি না।’
অধ্যাপক রাজ্জাক বলেন, ‘প্রত্যেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা আছে। একেক বিশ্ববিদ্যালয়ের একেক ধরনের। ফলে ইউজিসি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কীভাবে পরিচালনা করবে সেটি এক বড় প্রশ্ন। বরাদ্দ ও প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় অনেক সময় চলে গেলে গবেষণার সময় কমে যাবে। এতে গবেষণা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার নিজস্ব লক্ষ্য থাকে, এক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকর্মের পার্থক্য থাকে।’
উপাচার্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইউজিসি একটি কোডের মাধ্যমে গবেষণার অর্থ বরাদ্দ দেয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা-প্রকল্প যাচাই-বাছাই এবং আর্থিক বরাদ্দের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের গবেষণা সেলের মাধ্যমে প্রথমে গবেষণা-প্রস্তাব আহ্বান করে; আগ্রহী গবেষকেরা সংশ্লিষ্ট অনুষদের ডিনদের মাধ্যমে আবেদন জমা দেন। এরপর একটি কমিটি নির্ধারিত ক্রাইটেরিয়ার ভিত্তিতে প্রজেক্টগুলো মূল্যায়ন করে, আর উপাচার্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন। মনোনীতদের গবেষণার জন্য অগ্রিম টাকা দেওয়া হয়। গবেষণা শেষে গবেষকরা টাকার সমন্বয় করেন ও গবেষণা-প্রতিবেদন রিসার্চ সেলে জমা দেন।’
ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে ইউজিসি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে, যা গত অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গবেষণা খাতের টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোডে না দিয়ে ইউজিসির হাতে রাখা হবে। এতে ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণার জন্য বেশি টাকা বরাদ্দ দিতে পারবে এবং অধিকতর মূল্যায়ন ও প্রতিযোগীর কারণে গবেষণার মান বাড়বে। এতদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা তুলনামূলকভাবে দুর্বল প্রস্তাবকেও মনোনীত করতেন; নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকরী হলে তা বন্ধ হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থাটি জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বার্থ সংরক্ষণ করে সরকারের এ সিদ্ধান্ত কীভাবে কার্যকর করা যায় তা নিয়ে কাজ চলছে। প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিনিধি নিয়ে কমিটি করে নতুন নীতিমালা তৈরি করে গবেষণা-বরাদ্দ ও মূল্যায়ন এবং বাজেট ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হবে। এ কমিটি সরকারের সিদ্ধান্ত কার্যকরী করার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বাতন্ত্র্য রক্ষার চেষ্টা করবে।
সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা গবেষণার জন্য বরাদ্দ দিয়ে থাকে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে গবেষকদের বিশেষ গবেষণা অনুদান দিয়ে থাকে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতি বছর গবেষণা-প্রস্তাব আহ্বান করে এবং মনোনীতদের গবেষণা-বরাদ্দ দেয়। ইউজিসি বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর গবেষণা এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিশেষ অনুদান দিয়ে থাকে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের আইসিটি বিভাগ এবং বিভিন্ন জাতীয় গবেষণা ইনস্টিটিউট নিজ নিজ খাতের ওপর প্রজেক্টভিত্তিক গবেষণা-বরাদ্দ দেয়।
ইউজিসির সাবেক সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের গবেষণার ধরন ও বিষয়ে পরিবর্তন জরুরি। গবেষকদের বুঝতে হবে, দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে কোন বিষয়ে কাজ করা জরুরি। ঢালাওভাবে ইউজিসির কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার টাকা খরচ হলে মৌলিক কোনো পরিবর্তন হবে না। বিক্ষিপ্তভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও মন্ত্রণালয় যে অনুদান দিয়ে থাকে সেগুলোকে একই ছাতার নিচে নিয়ে আসতে হবে। তাতে গবেষণার পরিধি যেমন বাড়বে, তেমনি ফান্ড-সংকট কিছুটা দূর হবে।’
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ঢালাওভাবে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউজিসিকে একসঙ্গে বসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম মনে করেন, বরাদ্দ ইউজিসি থেকে নিয়ন্ত্রিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কমে যাবে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাড়বে এবং একাডেমিক স্বাধীনতাও বাধাগ্রস্ত হবে। আগের বরাদ্দ পদ্ধতিই বজায় রাখা উচিত।
গবেষণা খাতের অর্থ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ইউজিসির হাতে আসায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসন ও বিদ্যমান গবেষণা-পদ্ধতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এমন আশঙ্কা অমূলক বলে মনে করছে ইউজিসি। সংস্থাটির সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিজের ইচ্ছায় নয়, সরকারের নির্দেশনায় গবেষণার এ দায়িত্বে নিয়েছে ইউজিসি। সরকারের দেওয়া অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে কীভাবে বিতরণ করা হবে সে বিষয়ে একটি নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। নীতিমালায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসন, বিদ্যমান চর্চা ও গবেষণার স্বাধীনতা অক্ষুণœ রাখার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছিল তা অনেকটাই দূর হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ একটি কমিটি করেছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং দ্রুতই এ বিষয়ে সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে। চলতি মাসের মধ্যেই সমাধানে পৌঁছানোর আশা রয়েছে।’
অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, ‘গবেষণা খাতে বরাদ্দ করা টাকার সুষ্ঠু, কার্যকরী ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। ইউজিসি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দ কমাবে না। বরং তারা আরও বেশি অর্থ পাওয়ার সুযোগ পাবে। আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও গবেষণা-বরাদ্দের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পাবে; বৈষম্য হবে না।’