দেশের সিটি করপোরেশনগুলোর মধ্যে একমাত্র চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনই (চসিক) নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বৃহৎ পরিসরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে আসছে।
বর্তমানে সংস্থাটির অধীনে পরিচালিত হচ্ছে ৪৮টি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। তবে ২০২৬ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষার প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বছরের পর বছর ধরে ‘অর্পণাচরণ সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ’ কেন্দ্রিক যে সাফল্যের বৃত্ত তৈরি হয়েছে, তা থেকে চসিক পরিচালিত অন্য স্কুলগুলো বের হতে পারছে না।
চলতি বছর চসিকের ৪৮টি বিদ্যালয় থেকে মোট ৭ হাজার ১৬০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করেছে ৪ হাজার ৯৮৯ জন। সার্বিক পাসের হার ৬৯.৬৮ শতাংশ। চসিকের স্কুলগুলো থেকে মোট জিপিএ-৫ এসেছে ৫৪৮টি। তবে এই ৫৪৮টি জিপিএ-৫ এর অর্ধেকেরও বেশি এসেছে মাত্র ১০টি সেরা স্কুল থেকে, আর বাকি ৩৮টি স্কুলের অধিকাংশই জিপিএ-৫ এর তীব্র খরায় ভুগছে।
ফলাফলের সার্বিক দিক বিবেচনায় চসিকের সেরা ১০টি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় যথারীতি প্রথম স্থানে রয়েছে অর্পণাচরণ সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ। প্রতিষ্ঠানটি থেকে ৫০৮ জন অংশ নিয়ে ৪৭১ জন পাস করেছে। পাশের হার ৯২.৭২%। চসিকের মোট জিপিএ-৫ এর ২১ শতাংশেরও বেশি, একাই ১১৫টি জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। তালিকার ২ নম্বরে থাকা কৃষ্ণকুমারী সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ২৩২ জনের মধ্যে ১৯৮ জন পাস করেছে (৮৫.৩৪%) এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৪ জন।
৩ নম্বরে জামাল খান কুসুম কুমারী সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০৬ জনের মধ্যে ১৭০ জন পাস (৮২.৫২%) ও ৩৩টি জিপিএ-৫ এসেছে। ৪ নম্বরে ইমারাতুন্নেসা সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ১০৭ জনের মধ্যে ৮৮ জন পাস (৮২.২৪%) এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬ জন। ৫ নম্বরে চসিক মিউনিসিপ্যাল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ৩০২ জনের মধ্যে ২৪৮ জন পাস (৮২.১২%) ও ৪৩টি জিপিএ-৫ এসেছে।
৬ নম্বরে থাকা কাপাসগোলা সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪৮৭ জনের মধ্যে ৩৮৫ জন পাস করে (৮৯.০৬%) এবং ৮০ জন জিপিএ-৫ পায়। ৭ নম্বরে থাকা গুল-এজার বেগম সিটি করপোরেশন মুসলিম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৬২ জনের মধ্যে ১২৮ জন পাস (৭৯.০১%) ও ১৬টি জিপিএ-৫ এসেছে। ৮ নম্বরে আইয়ুব বিবি সিটি করপোরেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১৯২ জনের মধ্যে ১৪৯ জন পাস (৭৭.৬১%) ও ৮টি জিপিএ-৫, ৯ নম্বরে কদম মোবারক সিটি করপোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৫২ জনের মধ্যে ১১৬ জন পাস (৭৬.৩২%) ও ১৬টি জিপিএ-৫ এবং ১০ নম্বরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন হাতেখড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজে ২০২ জনের মধ্যে ১৫৩ জন পরীক্ষার্থী পাস করেছে (৭৫.৭৪%), যেখানে জিপিএ-৫ এসেছে ১১টি।
অন্যদিকে, চসিকের সর্বনি¤œ ও খারাপ ফলাফল করা ১০টি প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকালে শিক্ষার নিন্মমান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তালিকার একদম তলানিতে রয়েছে রামপুর সিটি করপোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়; এখান থেকে ৩৮ জন পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছে মাত্র ১৩ জন, যার পাসের হার সর্বনি¤œ ৩৬.১১ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ শূন্য।
সমানভাবে খারাপ করেছে ভোলানাথ মনোরমা সিটি করপোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়, যেখানে ৩৮ জনের মধ্যে পাস করেছে মাত্র ১৩ জন (৩৪.২১% পাস, জিপিএ-৫ শূন্য)। চর চাকতাই সিটি করপোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ে ১০৩ জনের মধ্যে পাস করেছে মাত্র ৪৪ জন (৪২.৭২% পাস, জিপিএ-৫ ১টি)। দক্ষিণ পতেঙ্গা সিটি করপোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ে ৯৬ জনের মধ্যে মাত্র ৪৪ জন পাস করেছে (৪৪.৭৯% পাস, জিপিএ-৫ ১টি)। রেলওয়ে হাসপাতাল কলোনী সিটি করপোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ে ১১৩ জনের মধ্যে পাস করেছে ৫১ জন (৪৫.১৩% পাস, জিপিএ-৫ ৩টি)।
এছাড়া শহীদনগর সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ১০৪ জনের মধ্যে ৫৩ জন (৫১% পাস, জিপিএ-৫ ৩টি), পোস্তারপাড় আছিয়া খাতুন সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৯৭ জনের মধ্যে ৫২ জন (৫৩.৬১% পাস, জিপিএ-৫ ১টি), পশ্চিম মাদারবাড়ী সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬৭ জনের মধ্যে ৩৬ জন (৫৩.৭০% পাস, জিপিএ-৫ ১টি), পূর্ব বাকলিয়া সিটি করপোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৩৫ জনের মধ্যে ৭৩ জন (৫৪.০৭% পাস, জিপিএ-৫ ৫টি) এবং ছালেহ্ জহুর সিটি করপোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫২ জনের মধ্যে ২৯ জন পাস করে (৫৫.৭৭% পাস, জিপিএ-৫ ১টি)।
খারাপ ফলাফল কেন?
সিটি করপোরেশনের ৪৮টি বিদ্যালয়ের মধ্য ফলাফলের দিক থেকে নিচের দিকে থাকা কয়েকটি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে খারাপ ফলাফলের কারণ জানতে চাইলে তারা শিক্ষক সংকট, অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া, তুলনামূলক খারাপ শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়াকে দায়ী করেছেন। তালিকায় সবার শেষে থাকা রামপুর সিটি করপোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এ আর ফারুকী বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ের অনিয়মিত শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।
শিক্ষকেরও প্রচুর সংকট। তুলনামূলক দুর্বল শিক্ষার্থীরা এখানে ভর্তি হয়। অনেকে খাতায় নাম লিখিয়ে আর আসে না। আমি এসেছি যে মাত্র এক বছরের মতো হবে। আমি শিক্ষার মান বাড়াতে কাজ করছি। আশা করছি আগামীতে ভালো ফল আসবে।
খারাপ ফলাফলের দিক থেকে ১২ নম্বর থাকা সরাই পাড়া সিটি করপোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নুরুল আবসার বলেন, এবছরের ব্যাচটা ভালো ছিল না। টেস্ট পরীক্ষায় দুই, তিন বিষয়ে যারা অকৃতকার্য হয়েছে, তাদেরও পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে ফল খারাপ হয়েছে। গতবছর ২৫ জন জিপিএ-৫ পেলেও এবছর পেয়েছে ১০ জন।
ভালো ফলাফলের পেছনের কারণ : খারাপ ফলাফলের বাহিরে যেসব স্কুল ভালো করেছে সেসব স্কুলের প্রধান শিক্ষকেরা ভালো ফলের জন্য শিক্ষার্থীদের একাগ্রতা, শিক্ষকদের আন্তরিকতা ও অভিভাবকদের সচেতনতার সমন্বিত চেষ্টা নিয়ামক ভূমিকা করেছে বলে জানান।
মিউনিসিপ্যাল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ শাহেদুল কবির চৌধুরী বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে গতবার জিপিএ-৫ পেয়েছিল ২৩ জন। এবার অনেকটা তার দ্বিগুণের মতো ৪৩ জন পেয়েছে। তবে কিছু ছাত্র ফেল করেছে। তাদের জন্য খারাপ লাগছে। তাদের অভিভাবকরা সচেতন না। ব্যবহারিক পরীক্ষার দিন তাদের ডেকে আনতে হয়েছে। আর সার্বিক দিক দিয়ে ভালো করার পেছনে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের সমন্বিত প্রচেষ্টা ভূমিকা রেখেছে।
বরাবরের মতো শীর্ষে থাকা অর্পণাচরণ সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ আবু তালেব বেলাল বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠান যখন ১৯৩২ সালে প্রথমবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেই, সেবারই ৮ জনের মধ্যে ৪ জন প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। বাকি ৪ জন দ্বিতীয় শ্রেণিতে। এই ঐতিহ্যটা এখনও অব্যাহত আছে। এই এতিহ্য ধরে রাখার জন্য শিক্ষকদের আন্তরিকতা, শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতাপূর্ণ মনোভাব ও অভিভাবকরা সমানভাবে কাজ করে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে চসিকের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা ড. কিসিঞ্জার চাকমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা সব বিদ্যালয়কে সমানভাবে দেখি। শিক্ষকদের একার উপর ভালো ফলাফল নির্ভর করে না।
শিক্ষার্থীদের একাগ্রতা ও অভিভাবকদের সচেতনতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চসিকের পরিচালিত সব স্কুল যাতে সমমানের হয়, সেজন্য আমরা কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মেয়র মহোদয়ও কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সবমিলিয়ে আশা করছি আগামী বছর ফলাফল আরও ভালো হবে।