চা শিল্প

সংকটের ছায়া সরান, সম্ভাবনা ছড়ান

চীনা দার্শনিক লাও যু সেই কবে বলেছিলেন, ‘চা হলো জীবনের অমৃত যা বেঁচে থাকার শক্তি জোগায়’। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় চায়ের অবদান শুধু ওখানেই বন্দি নয়, বরং বহুমুখী। বাংলাদেশের অর্থনীতি, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশে রূপ নিয়েছে এই শিল্প। ১৮৪০-এর দশকে চট্টগ্রামে প্রথম পরীক্ষামূলক চা চাষের মাধ্যমে যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল, তা আজ দেশের অন্যতম প্রধান শ্রমঘন শিল্পে রূপ নিয়েছে। দেশে এখন পাহাড়ে-সমতলে চায়ের আবাদ বিস্তৃত হলেও চা শিল্পে সংকট ও সম্ভাবনার যুগলবন্দি চিত্র উঠে এসেছে দেশ রূপান্তরের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে। যাদের শ্রমে-ঘামে এই শিল্পের বিকাশ তাদের জীবনমানের বহুমাত্রিক সংকট, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মালিক পক্ষ সৃষ্ট বিভাজন, সরকার নিয়ন্ত্রণাধীন ন্যাশনাল টি কোম্পানির বাগানগুলোতে শ্রমিকের বকেয়া মজুরি, বিদেশি মালিকানাধীন কোনো কোনো বাগানের ঔজ্জ্বল্যের ক্ষয়ে উৎপাদনব্যবস্থায় অভিঘাত লেগেছে। শুধু তাই নয়, বাগান মালিকরা চা বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন তাও জানা গেছে। ১৯৭২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে যেখানে মোট চা উৎপাদিত হয়েছিল ৩ কোটি কেজি, ২০২৩ সালে তা গিয়ে দাঁড়ায় ১০ কোটি কেজিতে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও  চায়ের উৎপাদন কাছাকাছি পর্যায়েই ছিল। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় পুরোটাই পূরণ হওয়ায় তাতে সাশ্রয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা।

‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ হলো আমাদের চা শিল্পের চিরচেনা পরিচিত সেøাগান ও রূপ। ইতিবাচক বার্তা হলো, সম্প্রতি দেশের চা শিল্পে যুক্ত হয়েছে এক স্বর্ণালি অধ্যায়। চট্টগ্রাম চা নিলামে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে অভূতপূর্ব মাইলফলক স্পর্শ করেছে ন্যাশনাল টি কোম্পানি (এনটিসি)। রেকর্ড দামে এক নিলামেই বিপুল পরিমাণ চা বিক্রি করে চা বাজারে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য ও ক্রেতাদের তুঙ্গস্পর্শী আস্থার প্রমাণ দিয়েছে এনটিসি। জলবায়ু পরিবর্তনের বৈরী পরিস্থিতি সত্ত্বেও আমাদের ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশ অনেকটাই এর অনুকূলে। কিন্তু এরপরও দৃশ্যমান সংকটের সূতিকাগার। চা শিল্পের ব্যক্তিমালিকানাধীন পক্ষের বক্তব্য, উৎপাদিত চায়ের ন্যায্যমূল্য থেকে তারা বঞ্চিত। ভূমি মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরের বিধিনিষেধও রয়েছে। অর্থায়ন বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই শিল্পের উন্নয়নের সুযোগ থেকে যাচ্ছে উপেক্ষিত। এর মধ্যে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটিতে সংকটের ছায়া আরও গাঢ় হয়ে উঠছে। বংশানুক্রমিকভাবে চা বাগানে কাজ করা শ্রমিকরা মৌলিক অধিকার ও ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত, এও সত্য। অন্যদিকে বাগান কর্র্তৃপক্ষের সামনে প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতার দাগও কম মোটা নয়।

বিশ্ববাজারে চায়ের কদর বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকারের শ্রমঘন এই শিল্পের দিকে জাতীয় স্বার্থেই মনোযোগ গভীর করা জরুরি। আমাদের রপ্তানি তালিকা খুব দীর্ঘ নয়। তাই সম্ভাবনার যে ক্ষেত্রগুলো রয়েছে সেগুলো উপেক্ষার বৃত্তবন্দি না রেখে কীভাবে বিকশিত করা যায় তা ভাবতে হবে। আমরা মনে করি, চা শিল্পের সম্ভাবনার দুয়ার বন্ধ হয়ে যায়নি। বিশ্ববাজারে চায়ের উপজাত পণ্যের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। এই অঞ্চলের দেশ ভারত ও শ্রীলঙ্কা চা শিল্পের বিকাশ ঘটিয়েছে সমন্বিত পদক্ষেপে। আমাদের চা শিল্পকে বাঁচাতে প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ। মালিক পক্ষকে সহজ শর্তে ঋণদান, কীটনাশক-সারসহ অন্যান্য উপকরণে ভর্তুকি দেওয়া, শ্রমিকদের মর্যাদাজনক মজুরি কাঠামো নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নীতি প্রণয়ন-বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। চা শিল্পের উন্নয়নে সব অংশীজনকে একযোগে কাজ করা চাই। একই সঙ্গে চোরাকারবারিদের পথ রুদ্ধ করতে হবে।

সঠিক নীতি, সময়োপযোগী বিনিয়োগ এবং পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ শুধু চা উৎপাদনকারী দেশ হিসেবেই নয়, একটি উচ্চমূল্য সংযোজনকারী, টেকসই এবং বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক চা অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, বাংলাদেশের চা শিল্পকে কোনো সংকটাপন্ন শিল্প হিসেবে নয়, একটি সম্ভাবনাময় কৌশলগত খাত হিসেবে দেখার প্রেক্ষাপট বিদ্যমান। এটা এমন একটা ক্ষেত্র যেখানে কৃষি, শিল্প, রপ্তানি, কর্মসংস্থান এত কিছু একসঙ্গে যুক্ত হয়েছে। খুব কম খাতেই এমন বহুমাত্রিক সম্ভাবনা রয়েছে। তাই  বিচ্ছিন্নভাবে নয়, চা শিল্পে সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সময়ের দাবি।