গ্যাস ও বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধিতে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এমন সিদ্ধান্তের পেছনে কিছু অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে আমদানিকৃত এলএনজির উচ্চমূল্য, ডলারের বিপরীতে টাকার মান হ্রাস এবং উৎপাদন খরচ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপ পাহাড়সম হয়ে ওঠে। অর্থনীতিকে স্থিতিশীল এবং বিপুল ঘাটতি সামাল দিতে মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্তটি অপ্রিয় হলেও, বাস্তব পদক্ষেপ। অর্থনৈতিক দিক থেকে চিন্তা করলে, সরকারকে যদি প্রতিনিয়ত বিশাল ভর্তুকির বোঝা টানতে হয়, তবে দেশের সামগ্রিক বাজেটে চাপ তৈরি হয়। দাম কিছুটা বাড়িয়ে এই খাতকে স্বাবলম্বী করা গেলে, নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত হবে। দাম সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে, জ্বালানি খাতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আমদানি প্রক্রিয়া গতিশীল হবে, যা অর্থনৈতিক ভিত্তিকে মজবুত করবে। জ্বালানি খাতের অভ্যন্তরীণ সংস্কার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও মেগা প্রজেক্টগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষায় জরুরি। বিশেষ করে, ডলার সংকটের সময় যদি বিদু্যুৎ ও গ্যাস খাতে অতিরিক্ত অর্থ সাশ্রয় করা যায়, তাহলে সেই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করা সম্ভব। বিশ্ববাজারের অস্থিরতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে, বাজারে সমন্বয় না আনলে ভবিষ্যতে এ ঘাটতি বিপর্যয় ডেকে আনতে পারত। এছাড়া বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা, বিশ^ জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। যার প্রভাবে এলএনজি ও জ্বালানি তেলের শিপিং কস্ট ও প্রিমিয়াম বেড়েছে। এই বৈশ্বিক ধাক্কা থেকে এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে, নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা অসম্ভব। ফলে সামর্থ্য অনুযায়ী, বাজেটের ভারসাম্য রক্ষা করতে মূল্য সংশোধন এড়ানো কঠিন। দেশীয় ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর জ্বালানি খাতের যে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের চাপ সৃষ্টি হয়েছিল, তা থেকে স্বস্তি মিলবে এমন সিদ্ধান্তে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে পেট্রোবাংলা ও পিডিবির মতো প্রতিষ্ঠানকে, এলএনজি ও জ্বালানি আমদানির জন্য প্রতিনিয়ত বড় অঙ্কের এলসি খুলতে হয়। এই খাতের আর্থিক ঘাটতি কমলে, ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট অনেকটা লাঘব হবে এবং দেশের বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি ও সার্বিক বিনিয়োগ পরিবেশ পুনরুজ্জীবিত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। শক্তির অপচয় রোধ এবং জ্বালানি ব্যবহারে সচেতনতা তৈরিতে, মূল্যবৃদ্ধি একটি মনস্তাত্ত্বিক ভূমিকা পালন করতে পারে। এতদিন অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে পাওয়ায়, শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে গৃহস্থালি পর্যায়ে অপচয়ের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, এখন থেকে প্রতি ধাপে জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে। এটি দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ সুরক্ষা এবং কার্বন নির্গমন কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের মতো বিকল্প উৎসগুলোতে, বেসরকারি বিনিয়োগ শ্লথ ছিল। কারণ সরকারি সস্তা বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা তাদের জন্য কঠিন হতো। বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি খাতে ক্রমান্বয়ে ভর্তুকি হ্রাস করে, আর্থিক খাত পুনর্গঠনের পরামর্শ দিয়ে আসছিল। এই সামঞ্জস্যের ফলে দেশের ক্রেডিট রেটিং উন্নত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। যা আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে এবং উন্নয়ন সহায়তা পাওয়ার পথকে সহজ করবে। তবে এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে। এমন সংকটময় সময়ে গ্যাস সংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মধ্যে বিলের বোঝা বেড়ে যাওয়ায়, সাধারণ নাগরিক ও শিল্পমালিকদের মধ্যে আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে, মধ্যবিত্ত ও খেটে খাওয়া মানুষের ওপর জ¦ালানি মূল্যবৃদ্ধিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। তবে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাস্তবসম্মত হওয়ায়, দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা রূপান্তরযোগ্য এনার্জি প্রকল্পে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। যদিও শিল্পকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির ফলে বহুমুখী ধাক্কা এলেও, জ¦ালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা গার্মেন্টস খাতের উৎপাদন খরচ বাড়লে, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। তখন মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক কিছু নয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও শিল্প খাতকে রক্ষা করতে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু সুরক্ষা বলয় বা প্রণোদনা ব্যবস্থার পরিকল্পনা রাখা প্রয়োজন। নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ বিলে ধাপে ধাপে কিছুটা রেয়াতি সুবিধা বহাল রাখলে ভালো। পাশাপাশি রপ্তানিমুখী ও সম্ভাবনাময় শিল্পগুলোকে, নীতিগত সহায়তা না দিলে সার্বিক উৎপাদনে ধীরগতি আসতে পারে। একইভাবে দেশীয় নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে মনোযোগ বাড়ানো সবচেয়ে বড় কর্তব্য। আমদানিকৃত এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, এই বৈশ্বিক ঝোড়ো হাওয়ার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বাপেক্স ও অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, স্থলভাগ ও গভীর সমুদ্রে নতুন নতুন গ্যাসকূপ খনন করে নিজস্ব উৎপাদন বাড়াতে পারলে ভবিষ্যতে বিশ্ববাজারের আকস্মিক অস্থিরতার ওপর আমাদের মুখাপেক্ষী হতে হবে না। শুধু দাম বাড়ালে হবে না, গ্রাহকের কষ্ট লাঘবে সিস্টেমলস বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি। একই সঙ্গে প্রিপেইড মিটারের বিস্তার ঘটানো এবং সাধারণ মানুষের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে, মূল্যবৃদ্ধির সুফল পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব না। সিদ্ধান্তটি সাময়িকভাবে নাগরিকদের পকেটে একটু টান ফেললেও, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাতকে সংকটমুক্ত এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য বাস্তবসম্মত ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তবে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত হতে পারে।
লেখক : সিইও, ইটিসি ইভেন্টস লিমিটেড
antora00111@gmail.com