বাংলাদেশের সামনে বহুমাত্রিক সমীকরণ

বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে এবং সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে প্রকাশ, সর্বপ্রথম সৌদি নেতৃত্বে একটি নৌজোট গঠন এবং সৌদি আরব ও বাংলাদেশসহ মোট ১৪টি দেশ সেই নৌজোটে অংশ নিয়েছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী সদস্যরা এই জোটে যোগ দেবেন বলে প্রশাসনের বিভিন্ন মহল থেকে  ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তবে নৌসদস্যদের কিংবা নৌবহরকে কীভাবে নিয়োজিত করা হবে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো ধারণা কোনো মহল থেকেই পাওয়া যায়নি। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনের বাইরে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরের সদস্যরা স্বল্প পরিসরে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল এবং সেবামূলক কাজ করে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছিল। ১৯৯০-৯১ সালে অপারেশন ডেজার্ট শিল্ড ও ডেজার্ট স্টর্ম নামক যুদ্ধে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক সামরিক জোটের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রায় ৩০০০ সদস্য সক্রিয়ভাবে নিয়োজিত ছিল। তারা ইরাক কর্র্তৃক দখলকৃত কুয়েত পুনরুদ্ধারে সক্রিয় অবদান রেখে সমগ্র বিশ্ববাসীর সমীহ  আদায় করতে সক্ষম হয়। ওই যুদ্ধের প্রায় ৩৫ বছর পরে বাংলাদেশের নৌসেনাদের একটি যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যোগদানের আহ্বান জানানো হয়েছে, যার সঙ্গে জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক অন্য কোনো সংস্থার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। মূলত এই কারণেই এমন যুদ্ধে যোগদানের যৌক্তিকতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। যদিও এটি কি যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ নাকি একটি সুনির্দিষ্ট জলসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য আন্তর্জাতিক বাহিনীর সঙ্গে অংশগ্রহণ তা এখনো সুস্পষ্ট নয়।

আমরা জানি- লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি এবং এডেন উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা এবং মুক্ত নেভিগেশন নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে ১৪টি দেশের এই  বহুজাতিক নৌপ্রতিরক্ষা জোট গঠিত হয়েছে। এ জোটের আনুষ্ঠানিক নাম ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’। সম্প্রতি ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের পক্ষে সৌদি আরবের ওপর নৌঅবরোধের ঘোষণা এবং বাণিজ্যিক জাহাজে ক্রমাগত হামলার প্রতিক্রিয়ায় তড়িঘড়ি করে এই জোট গঠন করা হয়। আবদুল্লাহ বিন সালেম আল-শেহরিকে এ বহুজাতিক নৌজোটের প্রথম কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ১৪টি দেশ হলো : বাংলাদেশ, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, ইয়েমেন (সরকারি পক্ষ), জিবুতি, সোমালিয়া, সুদান, কমোরোস (কিছু সূত্রে নাইজেরিয়ার নামও এসেছে)। উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম দুই গুরুত্বপূর্ণ দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমান এ জোটে যোগ দেয়নি।সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে রিয়াদ থেকে আরব নিউজ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জোট গঠন নিয়ে আলোচনায় ৫১টি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু অংশ নেয় ৪৩টি দেশ। এর মধ্যে সৌদি আরবসহ ১৪ দেশ নিয়ে জোট গঠন করা হয়।

একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নাম প্রকাশ না করার শর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এক মাসের বেশি সময় সৌদি আরব জোটের প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা করে আসছে। প্রাথমিকভাবে এতে অন্তত ৫০টি দেশকে যুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল সৌদি আরবের। তবে শুরুতে মোট ১৪টি দেশকে নিয়ে সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠিত হয়।’ জোটের সদর দপ্তর সৌদি আরবের কোথায় অবস্থিত, তা জানানো হয়নি। এটুকু বলা হয়েছে, জোটের সদস্যরা গোয়েন্দা তথ্যসহ বিভিন্ন তথ্য বিনিময় এবং যৌথভাবে অভিযানের পরিকল্পনা করবে। সামরিক মহড়া ও সমুদ্রে যৌথ অভিযান পরিচালনাও করবে। ওই দৈনিকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘সৌদি আরবের বিবৃতিতে জোটের কিছু লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে লোহিত সাগর, বাব আল-মানদেব ও এডেন উপসাগরে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি ভারত মহাসাগর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত নৌপথের নিরাপত্তা বজায় রাখা। সামুদ্রিক হুমকি মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও সমন্বয়ই জোটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে নৌপথগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সদস্য দেশগুলো কেমন ধরনের জাহাজ ও উড়োজাহাজ দেবে, তা বিবৃতিতে বলা হয়নি। জোটের সদর দপ্তর সৌদি আরবের কোথায় অবস্থিত, তাও জানানো হয়নি। এটুকু বলা হয়েছে, জোটের সদস্যরা গোয়েন্দা তথ্যসহ বিভিন্ন তথ্য বিনিময় এবং যৌথভাবে অভিযানের পরিকল্পনা করবে। সামরিক মহড়া ও সমুদ্রে যৌথ অভিযান পরিচালনাও করবে।’

এই প্রেক্ষাপটে সৌদি নেতৃত্বে নৌজোটে যোগ দেওয়া আমাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেহেতু বর্তমানে সৌদি আরব এবং যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে ইরানের কিছু লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করছে, তাই ধরে নিতে হবে সৌদি আরবের এই জোটের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ আছে এবং সৌদি আরব এবং যুক্তরাষ্ট্র্র উভয় দেশই বাংলাদেশকে এই জোটে চেয়েছে। সৌদি আরবে বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজার রয়েছে। তাই বংলাদেশের পক্ষে সৌদি আরবের এ আহ্বানের বিপক্ষে গেলে  একদিকে শ্রমবাজারে আঘাত লাগতে পারে আবার অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরাগভাজন হতে হবে। বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ট্যারিফ আরও বেশি আরোপিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকত। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে রয়েছে চীন এবং রাশিয়ারসহ আরও কিছু দেশ। তাছাড়াও বাংলাদেশে ইসরায়েলবিরোধী এবং আয়াতুল্লাহ খোমিনিভক্ত মুসলমানদের সংখ্যা অনেক। তাই সৌদির পক্ষে যাওয়া মানে ইরানের বিপক্ষে যাওয়া কিংবা সৌদির পক্ষে যাওয়া মানে ইসরায়েলের পক্ষে যাওয়া এমনটা ধরে নিলে দেশেও ভবিষ্যতে এটা নিয়ে একটা বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে এবং  কুচক্রী মহল এটাকে কাজে লাগিয়ে একটা অস্থির পরিবেশ তৈরি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারে। তবে সৌদি আরব যদি বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও অন্যান্য সহায়তা নিশ্চিত করে এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখে সর্বোপরি বাংলাদেশ কখনো বিদেশি শক্তির দ্বারা আক্রমণের শিকার হলে আমাদের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করে তবে এই জোটে যাওয়াটা অযৌক্তিক হয়েছে বলে মনে করি না।

আমাদের সীমান্তের প্রায় তিন দিকেই যেহেতু একটি মাত্র দেশ আছে তাতে ধরে নেওয়া যায়, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে পৃষ্ঠপোষকতার ফলে বাংলাদেশে প্রক্সি যুদ্ধ শুরু হওয়া অসম্ভব নয়। এটাও মনে রাখতে হবে ভারত এবং ইসরায়েল উভয়ে উভয়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র। এই জোটে যোগ দেওয়ার প্রথম ঝুঁকি হলো, সেখানে যদি আমাদের নৌবহর থাকে অথবা কোনো যুদ্ধ জলযান তৈরি হয় তবে তা ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। তাছাড়া ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা ইরানের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশি নৌবহর ও নৌবাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে। আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনী বিশেষত নৌবাহিনীর সাবমেরিন সক্ষমতা চীন থেকে এসেছে। অন্যান্য দেশেরও ভূমিকা আছে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সার্বিক শক্তিমত্তার পেছনে। চীনসহ অন্যান্য যেসব দেশ ইরানের পক্ষে রয়েছে বা যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে রয়েছে তারা সৌদি আরবের সঙ্গে নৌবহরে বাংলাদেশ নৌবাহিনী যুক্ত হওয়াকে কখনো মেনে নিতে পারবে না। ইরান এবং ইরানের মিত্ররা বর্তমান সরকারের বিপক্ষ শক্তিকে নেপথ্য থেকে সমর্থন দিতে পারে এবং এই নৌবহরে যুক্ত না হওয়ার কিংবা যুক্ত হলেও ফিরিয়ে আনার জন্য আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে। বিশেষত ইসরায়েলবিরোধী আবেগকে কাজে লাগিয়ে সরকারকে এমন সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসার জন্য বাধ্য করতে পারে। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে ইরানের ধ্বংসস্তূপ অপসারণ এবং নতুন করে একটি দেশ গড়ার জন্য ব্যাপক সমরশক্তি ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন নানা স্তরের ও নানা পেশার জনবল প্রয়োজন হবে। ইরানের বিপক্ষে গেলে এমন সুযোগ থেকে এবং একটি সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার থেকে বাংলাদেশ ছিটকে পড়বে, এই আশঙ্কাও হয়তো অমূলক নয়। ইরান যদি এই যুদ্ধে আমেরিকার বিপক্ষে ভিয়েতনাম কিংবা সোমালিয়ার মতো সফলতা লাভ করে তবে বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে বড় রকমের সংকটের মুখোমুখি পড়তে হতে পারে।

যেহেতু জাতিসংঘে শান্তিরক্ষী মিশনে দায়িত্ব পালন করেছি সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, নৌবাহিনী সদস্যরা বিশেষত অফিসাররা বিভিন্ন সদর দপ্তরে ও নৌঘাঁটিতে অপারেশনাল কার্যক্রম ও লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে পারেন। সামরিক পরিভাষায় যাকে স্টাফ ডিউটিস বলা হয়। এক্ষেত্রে সরাসরি কেউ রণাঙ্গনে নিয়োজিত হবেন না। আমাদের নৌবাহিনীর বিভিন্ন স্তরের অফিসার এবং নৌসেনারা স্থলভাগে অবস্থিত বিভিন্ন ঘাঁটি ও লজিস্টিক স্থাপনার নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত হতে পারেন। সৌদি আরবসহ এই জোটে অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন দেশের নৌসদস্যদের প্রশিক্ষণের কাজে আমাদের নৌবাহিনীর অফিসার ও অন্য সদস্যরা নিয়োজিত হতে পারেন। সর্বশেষ এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হলো, সামুদ্রিক জলসীমায় যুদ্ধজাহাজ নিয়ে নিয়োজিত হওয়া এবং টহলের মাধ্যমে ওই নৌসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আরও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, আমাদের নৌবহর থেকে হুতিদের ওপর বা ইরানের ওপর কোনো প্রকার আক্রমণ করা। আমরা এও জানি, বাংলাদেশ অতীতে কোনো সামরিক বা প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে রাখতে হবে, প্রথমবার আন্তর্জাতিক সামরিক জোটে যুক্ত হয়ে কোনো সংঘাতে যাতে বাংলাদেশ না জড়ায়। এ নিয়ে নানামাত্রিক সমীকরণ সংগত কারণেই সামনে আসছে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত মেজর, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।