নাটক কিংবা টেলিফিল্মের চেনা ফ্রেমে বহুল ব্যবহৃত প্লটকে নতুন প্রাণ দেওয়া বেশ চ্যালেঞ্জিং। মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজের পরিচালনায় নির্মিত ‘পথহারা মন’ ঠিক সেই কাজটিই করেছে পরম মমতায়। আসাদ জামানের সঙ্গে যৌথভাবে চিত্রনাট্য করেছেন পরিচালক নিজেই। চিরাচরিত পারিবারিক ও প্রেমকাহিনির আড়ালে এটি এমন এক আবেগের সুর বেঁধেছে, যা সাধারণ দর্শকেও ইমোশনালি কানেক্ট করে। লেখার শিরোনাম হতে পারত ‘সাহসী গল্পের জয়’! না সেই সাহসী গল্প পরবর্তী সময়ে হেঁটেছে চেনা গল্পে।
সিনেমাওয়ালা চ্যানেল থেকে সম্প্রতি প্রকাশ হয়েছে ‘পথহারা’। জাকিয়া হোসেন তৃষার গল্পের শুরুটা এমন শহরের রাস্তায় হুট করে ঘটে যাওয়া এক ছোটখাটো ঝামেলা থেকে পরিচয় হয় ইফতি (খায়রুল বাসার) ও তনুর (তানজিম সাইয়ারা তটিনী)। তনু স্পষ্টভাষী, কিছুটা একগুঁয়ে ও রাগী স্বভাবের; যার পেছনে লুকিয়ে আছে এক কঠিন অতীত। শৈশবে বাবাকে না পাওয়া এবং একা মায়ের সংগ্রাম দেখে বড় হওয়া তনু পুরুষজাতির প্রতি এক প্রকার ক্ষোভ লালন করে। অন্যদিকে ইফতি বেশ বিন্দাস ও চঞ্চল প্রকৃতির ছেলে। তনুর এই শক্ত আবরণের পেছনের ক্ষতকে ভালোবেসে সারিয়ে তোলার মিশনে নামে সে। তবে গল্পের মূল মোড় ঘুরতে শুরু করে যখন দুই পরিবারের অতীত ইতিহাস একবিন্দুতে এসে মিলে যায় যা তাদের সম্পর্কের সামনে তুলে ধরে এক অনাকাক্সিক্ষত পারিবারিক সংকট।
অভিনয়ের দিক থেকে খায়রুল বাসার ও তটিনী দুজনই অসাধারণ কেমিস্ট্রি ফুটিয়ে তুলেছেন। রাগী কিন্তু ভেতর থেকে নরম তনু চরিত্রে তটিনীর সূক্ষ্ম এক্সপ্রেশন এবং চঞ্চল প্রেমিকের চরিত্রে বাসারের সাবলীল অভিনয় চোখ জুড়ায়। বিশেষ করে জাহিদ হাসানের উপস্থিতি নাটকে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। তনুর সংগ্রামশীল মায়ের ভূমিকায় দীপা খন্দকারের অভিনয় ছিল আবেগময় ও জীবন্ত; দীর্ঘ বছরের একাকী লড়াই ও সন্তানের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশে তিনি ছিলেন অনন্য। পাশাপাশি স্নেহময়ী ফুফুর চরিত্রে মনিরা মিঠুর প্রাণবন্ত উপস্থাপনা দৃশ্যগুলোকে বেশ উপভোগ্য করে তুলেছে।
নাটকটির বেশ কিছু ইতিবাচক দিক স্পষ্ট। প্রথমত, সংলাপের গাঁথুনি এবং পারিবারিক সম্পর্কের গভীর উপস্থাপন। দ্বিতীয়ত, আবহ সংগীত ও ‘পথহারা মন’ শিরোনামের অফিশিয়াল টাইটেল গানটির নিখুঁত ব্যবহার। লুৎফর হাসানের কথায়, সজীব দাসের সুর ও সংগীতায়োজনে দিলশাদ নাহার কনা ও সজীব দাসের গাওয়া গানটি নাটকের আবেগঘন দৃশ্যকে চমৎকারভাবে সমৃদ্ধ করেছে।
তবে দুর্বলতা যে একেবারেই নেই, তা নয়। নাটকের শেষভাগের ক্লাইম্যাক্স কিছুটা কাকতালীয় মনে হতে পারে। দীর্ঘ ২৫ বছর পর দুটি পরিবারের অতীত সত্য এভাবে হুট করে মুখোমুখি দাঁড়ানোটা কিছুটা চেনা ফর্মুলার ছাঁচে ফেলা। এছাড়া প্রথমার্ধে ধীরগতি না হয়ে আরও জমাট হতে পারত।
সব মিলিয়ে, পরিচিত প্রেক্ষাপট হওয়া সত্ত্বেও চমৎকার নির্মাণ, চরিত্রগুলোর আন্তরিক পরিবেশনায় পারিবারিক ড্রামা ‘পথহারা মন’ শেষ পর্যন্ত দর্শকের মন জয় করে নিয়েছে।