জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাতক্ষীরা জেলা আহ্বায়ক কমিটিকে ‘অস্বচ্ছ’ ও ‘একপেশে’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়েছেন দলের একাংশের নেতাকর্মীরা। একই সঙ্গে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কমিটি পরিবর্তন করা না হলে গণপদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন তারা। এনিয়ে পৃথক দুটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আরও একটি সংবাদ সম্মেলন করার কথা থাকলেও তারা শেষে রাতে আর কোন সংবাদ সম্মেলন করবেন বলে জানিয়ে দেন।
সোমবার (১০ আগস্ট) বিকেলে সাড়ে ৫টায় সাতক্ষীরা শহরের (শহীদ আলাউদ্দিন চত্বরের) নিউমার্কেট মোড়ের আল বারাকা হোটেলে আয়োজিত পৃথক কর্মসূচি ও প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা জানানো হয়।
রবিবার আগামী ছয় মাসের জন্য সাতক্ষীরা জেলা এনসিপির ১৫ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। দলের কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব আখতার হোসেন ও দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ স্বাক্ষরিত চিঠিতে এ কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়।
কমিটিতে আহ্বায়ক করা হয়েছে অধ্যক্ষ মো. আখতারুজ্জামানকে। সদস্যসচিব হয়েছেন মো. কামরুজ্জামান (বুলু) এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আক্তারুল ইসলাম। সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম রজব আলী এবং যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন সি এম নাজমুল ইসলাম ও শেখ নাজমুল হুদা। কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করে কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা দিতে বলা হয়েছে।
নতুন কমিটি নিয়ে অসন্তুষ্ট নেতা–কর্মীরা বলেন, সাতক্ষীরায় দীর্ঘদিন সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকলেও বিভিন্ন কর্মসূচি ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে অনেকে শ্রম, সময় ও ত্যাগ দিয়ে সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু নতুন কমিটিতে মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিন কাজ করা অধিকাংশ নেতা–কর্মীকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ। তাঁদের দাবি, এই প্রতিবাদ কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়; বরং প্রশ্নবিদ্ধ সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে।
নতুন কমিটির সদস্যসচিবের দায়িত্ব পাওয়া মো. কামরুজ্জামান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কমিটি পরিবর্তন না হলে তার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে। তিনি তাঁর বিভিন্ন সাংগঠনিক পদ থেকে পদত্যাগ করবেন।
জেলা জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাকর্মীদের দেওয়া এক সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য বলা হয়, সাতক্ষীরা জেলায় দীর্ঘদিন সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকলেও বিভিন্ন কর্মসূচি ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে অনেকে শ্রম, সময় ও ত্যাগ দিয়ে সক্রিয় ছিলেন। সম্প্রতি প্রকাশিত জেলা কমিটিতে মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিন কাজ করা অধিকাংশ নেতাকর্মীকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি বলে তাদের অভিযোগ।
তাদের ভাষ্য, এটি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নয়, বরং ‘প্রশ্নবিদ্ধ সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার’ বিরুদ্ধে নীতিগত প্রতিবাদ। পদ-পদবি ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে নয়, বরং ত্যাগ, যোগ্যতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও মাঠপর্যায়ের ভূমিকার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা উচিত বলেও তারা দাবি করেন।
এছাড়া বঞ্চিত ও পদত্যাগকারী নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে সাংগঠনিক সংকটের দ্রুত সমাধান করতে হবে। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কমিটি পরিবর্তন না হলে গণপদত্যাগের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন, জেলা এনসিপির বার্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক সি.এম নাজমুল ইসলাম, বর্তমান সদস্য সচিব মো. কামরুজ্জামান বুলু, যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ আবদুল্লাহ, সদর উপজেলা কমিটির সমন্বয়কারী মাছুম আশরাফ উদ্দীন, শেখ আল ইমরান, রফিকুল ইসলাম, বার্নাবাশ দাদা ও আবদুল্লাহ আবদুল মালেক প্রমুখ ।
অন্যদিকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে জাতীয় ছাত্রশক্তি, সাতক্ষীরা জেলা শাখার পক্ষ থেকেও এনসিপির জেলা আহ্বায়ক কমিটি প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেওয়া হয়।
জাতীয় ছাত্রশক্তির প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি অনুমোদিত ‘সাতক্ষীরা জেলা আহ্বায়ক কমিটি (আংশিক)’ অস্বচ্ছ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থি। প্রকৃত আন্দোলনকারী ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন করে ‘একপেশে ও পকেট কমিটি’ করা হয়েছে বলে অভিযোগ সংগঠনটির।
জাতীয় ছাত্রশক্তির দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত মাঠপর্যায়ের ত্যাগী কর্মী এবং আন্দোলনের মূল ধারার প্রতিনিধিদের মতামত নিয়ে কমিটি পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। পাশাপাশি আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বর্তমান কমিটি স্থগিত করে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়েছে। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, জাতীয় ছাত্রশক্তির সাতক্ষীরা শাখার আহ্বায়ক হাসিবুল হাসান রুমন, সদস্য সচিব বখতিয়ার হোসেন ও মুখ্য সংগঠক মোজাহিদুল ইসলাম, সদর উপজেলা শাখায় আহ্বায়ক তাজিম হোসেন ও সদস্যসচিব পারভেজ ইমাম, দেবহাটা উপজেলা শাখায় সদস্যসচিব হিসেবে সাদিকুজ্জামান সাদিক প্রমুখ।
জাতীয় ছাত্রশক্তির জেলা শাখার সদস্যসচিব বখতিয়ার হোসেন বলেন, নতুন কমিটি অস্বচ্ছ এবং জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী। প্রকৃত আন্দোলনকারী ও ত্যাগী নেতা–কর্মীদের অবমূল্যায়ন করে ‘একপেশে ও পকেট কমিটি’ করা হয়েছে। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বর্তমান কমিটি পরিবর্তন করে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার দাবি জানান তিনি।
নতুন জেলা কমিটি নিয়ে অসন্তোষের বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির সাতক্ষীরা জেলা আহ্বায়ক অধ্যক্ষ মো. আখতারুজ্জামান বলেন, কামরুজ্জামান আহ্বায়ক পদপ্রত্যাশী ছিলেন। গণতান্ত্রিক সংগঠনে কোনো পদপ্রত্যাশী পছন্দের পদ না পেয়ে আপত্তি জানাতে পারেন। তবে কমিটি নিয়ে তাদের অভিযোগের বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দেখবেন।
আখতারুজ্জামান আরও বলেন, ‘কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন ও পরবর্তী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে যাঁরা ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছেন, তাদের মূল্যায়ন করেই কমিটি দিয়েছে। আমার মনে হয়, যথাযথ মূল্যায়ন হয়েছে। এখন কমিটি নিয়ে যাঁদের অভিযোগ, সেটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিষয়। আমি নতুন, নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের দিকে মনোযোগ দিতে চাই।’