‘আর দেখা হবে না, দোয়া করবেন’

কারখানার ভেতরে তখন আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়েছে। চারদিকে ধোঁয়া আর আতঙ্ক। বের হওয়ার দরজাটিও বন্ধ। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন দুই ভাই মোহন প্রামাণিক ও সুমন প্রামাণিক। বারবার ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করছিলেন তারা। কিন্তু বাড়িতে তখন বিদ্যুৎ ছিল না। মোবাইলে ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় সেই ফোন আর পৌঁছায়নি বাবা-মায়ের কাছে। বলা হয়নি শেষ কথাটুকুও।

পরে ভয়েস মেসেজে নিজেদের শেষ আকুতির কথা জানান দুই ভাই। বলেন, ‘কারখানায় আগুন ধরেছে। দরজা বন্ধ থাকায় বের হতে পারছি না। হয়তো আমরা মারা যাব। আমাদের সঙ্গে আর দেখা হবে না। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।’ এরপর আর কোনো ফোন আসেনি। ভয়েস মেসেজেই শেষ হয়ে যায় বাবা-মায়ের সঙ্গে দুই সন্তানের যোগাযোগ।

নিহত মোহন ও সুমন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গ-গোহালী গ্রামের গুফফার প্রামাণিকের ছেলে। গত রবিবার (বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে) সৌদি আরবের রিয়াদের খোরদাম শহরের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকা-ে দুই সহোদরসহ অন্তত ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন। তাদের মধ্যে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ১৩ জন। অন্যদের মধ্যে দুজন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার এবং একজন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার।

দুই ছেলের মৃত্যুতে নির্বাক হয়ে পড়েছেন বাবা গুফফার প্রামাণিক। একদিকে সন্তান হারানোর শোক, অন্যদিকে মৃত্যুর আগে তাদের সঙ্গে শেষবার কথা বলতে না পারার আক্ষেপ তাকে আরও ভেঙে দিয়েছে।

গুফফার জানান, তার তিন ছেলে ও এক মেয়ে। তিনি নিজে এবং ছোট ছেলে মামুন হোসেন (১৭) শারীরিক প্রতিবন্ধী। পরিবারের নিজস্ব কোনো জমিজমাও নেই। সংসারের অভাব দূর করতে প্রায় আট বছর আগে ধারদেনা করে বড় ছেলে মোহনকে সৌদি আরবে পাঠান তিনি। দুই বছর আগে ছোট ভাই সুমনকেও নিয়ে যান সেখানে। দুই ভাই একই সঙ্গে কাজ করতেন। তাদের স্বপ্ন ছিল, প্রবাসে কাজ করে টাকা জমিয়ে দেশে একটি পাকা বাড়ি করবেন। এরপর দুই ভাই একসঙ্গে দেশে ফিরে বিয়ে করে সংসার শুরু করবেন।

সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে গত বুধবার বাড়িতে নতুন ঘর নির্মাণের জন্য ভিত্তি স্থাপন করা হয়। কাজও শুরু হয়। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানেই দুই ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছায় বাড়িতে।

কান্নায় ভেঙে পড়ে গুফফার প্রামাণিক বলেন, ‘আগুন লাগার পর দুই ছেলে বারবার ইমু আর হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তখন আমাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না। তাই ফোনে নেট পায়নি। আমরা তাদের সঙ্গে শেষবারের মতো কথাও বলতে পারিনি।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ১৩ জন হচ্ছেন গ-গোহালী গ্রামের মো. রুবেল প্রামাণিক (বাবা : মো. সাইদুর রহমান), মো. কলিমউদ্দিন (বাবা : বজলুর প্রামাণিক), মো. মোহন ও মো. সুমন (বাবা : গুফফার প্রামাণিক), খরস্রোতা গ্রামের মজিদুল (বাবা : মজনু) ও আবদুল জলিল, উজানপই গ্রামের ফরিদ, ডুবাই গ্রামের শুভ ও সুমন, বোয়ালা গ্রামের হৃদয়, নওগাঁ গ্রামের শাহিন, সাদনগর গ্রামের সাগর এবং একই উপজেলার মিনহাজ। তাদের প্রত্যেকের বয়স ২৫-৩০ বছরের মধ্যে।

সৌদিতে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আত্রাই উপজেলার গ্রামগুলোতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনরা দ্রুত নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

দেশে ফিরে সন্তানকে কোলে নিতে চেয়েছিলেন শামীম: নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা ইউনিয়নের দিঘীরপাড় গ্রামের মো. জাকির হোসেনের ছেলে শামীম হোসেন ৮ মাস আগে সৌদি আরবে যান। বিদেশে যাওয়ার খরচ জোগাতে বন্ধক রাখেন জমি। এর মধ্যে এক কন্যা সন্তানের বাবা হন। মেয়ের বয়স এক মাস হলো। সন্তান হওয়ার খুশিতে আনন্দে দিন কাটছিল প্রবাসী শামীমের। সৌদি আরব থেকে ভিডিওকলে মেয়েকে দেখতেন আর প্রহর গুনতেন কবে দেশে ফিরে কোলে নিয়ে সন্তানকে আদর করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না শামীমের। সৌদিতে কারখানার আগুনে মারা যান তিনি।

শামীমসহ নলডাঙ্গা উপজেলার দুজন মারা যান। অন্যজন হচ্ছেন খাজুরা গ্রামের সাব্বির। অপর নিহত ব্যক্তি হলেন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার মরুগ্রামের শ্যামল।

প্র্রায় ৪ বছর আগে ৬ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে সৌদি আরবে যান সাব্বির। সংসারে বাবা-মা ও স্ত্রী রয়েছে। ঋণের টাকা কিছু পরিশোধ হলেও বাকি রয়েছে। ছোট বোনের বিয়ের কথা চলছিল। ছোট বোনের বিয়ে সম্পন্ন ও বাড়িঘরের জন্য টাকা নিয়ে দেশে ফেরার কথা ছিল সাব্বিরের। কিন্তু সেই স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল।

নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর : রিয়াদে অগ্নিকা-ে ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। পাশাপাশি নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় সব ধরনের মানবিক সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন। গতকাল সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর জরুরি নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পররাষ্ট্র সচিব, প্রবাসীকল্যাণ সচিব, বেসামরিক বিমান পরিবহন সচিব, রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতিনিধি (ভার্চুয়ালি), পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড, বিএমইটি, বাংলাদেশ বিমানসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তর/সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন।

সভায় মর্মান্তিক এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশের পাশাপাশি নিহতদের মরদেহ দ্রুত শনাক্তকরণ, বাংলাদেশে মরদেহ আনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা প্রদানের বিষয়ে আলোচনা হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ দূতাবাস সৌদি কর্তৃপক্ষ, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে নিহতদের মরদেহ দ্রুত শনাক্তকরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী, নিহত ১৬ জনের প্রত্যেক পরিবারের জন্য এককালীন বিশেষ মানবিক অনুদান প্রদান করা হবে।