ব্যাংক রেজল্যুশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়া অনুমোদন

‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’ এর ১৮ক ধারা বিলুপ্ত করতে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। চূড়ান্ত খসড়ায় রেজল্যুশন আইনের বিতর্কিত ১৮ক ধারা বিলুপ্ত করা হয়েছে।

গতকাল সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে খসড়াটি লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং সাপেক্ষে অনুমোদন দেওয়া হয়।

বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়। এ আইনের মাধ্যমে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ পুনরায় ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাবেন সাবেক মালিকরা, তাও তুলনামূলক সহজ শর্তে। ফলে নতুন সরকারের পদক্ষেপটিকে অনেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যাংক সংস্কার উদ্যোগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে সমালোচনা করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের দুর্বল ও সংকটাপন্ন ব্যাংকিং খাতকে পুনরুদ্ধারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’। এ অধ্যাদেশের মূল লক্ষ্য ছিল অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন এবং দায়ীদের স্থায়ীভাবে মালিকানা থেকে অপসারণ করা।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এ সংশোধনী আইনের খসড়া প্রণয়ন করেছে। তফসিলি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট, দেউলিয়াত্ব বা অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ যেকোনো ঝুঁকির সময়োপযোগী সমাধান এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ২০২৫ সালে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

অধ্যাদেশটি আইনে রূপান্তরের লক্ষ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিল আকারে উত্থাপন করা হলে বিশদ পর্যালোচনার জন্য তা সংসদীয় বিশেষ কমিটির কাছে পাঠানো হয়। বিশেষ কমিটি অধ্যাদেশটি সংশোধিত আকারে উপস্থাপনের সুপারিশ করে। ওই সুপারিশের ভিত্তিতে অধ্যাদেশের কিছু বিধান বিধিমালার মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য আলাদা করা হয়। পাশাপাশি সরকারের আর্থিক দায়ভার, গ্রাহকদের স্বার্থ এবং ব্যাংক খাতের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আইনে নতুন ১৮ক ধারা সংযোজন করে বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হয়। পরে উত্থাপিত আকারেই ব্যাংক রেজল্যুশন আইন পাস হয়।

এখন ওই অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেওয়ার সময় পরিবর্তন এনে একটি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়েছে, যার ফলে পরিস্থিতি বদলে গেছে। সংশোধিত আইনের ১৮(ক) ধারায় বলা হয়েছে, একীভূত ব্যাংক পরিচালনায় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যে অর্থ সহায়তা দিয়েছে, তার মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ পরিশোধ করেই সাবেক মালিকরা আবার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারবেন।

‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদন : একই দিনে মন্ত্রিসভা বৈঠকে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০২৬’-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

খসড়ায় বলা হয়, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ রাষ্ট্রের অন্যতম অঙ্গীকার এবং মানবাধিকার সংরক্ষণ, উন্নয়ন এবং নিশ্চিতকরণ রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য। এ ছাড়া জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণাসহ মানবাধিকারসংক্রান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন, সনদ এবং এ সংক্রান্ত চুক্তিগুলো পরিপালন করতে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মানবাধিকার সংরক্ষণ, উন্নয়ন এবং নিশ্চিতকরণের জন্য একটি কার্যকর ও স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন গঠন করা আবশ্যক। এর পরিপ্রেক্ষিতে, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রণীত হয়। ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’-এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো কমিশন গঠন এবং এর মেয়াদকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে; একজন চেয়ারপারসন ও চারজন কমিশনার সমন্বয়ে যে কমিশন গঠিত হবে, তাতে ন্যূনতম একজন নারী অন্তর্ভুক্তির বিধান রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে বাছাই কমিটির সুপারিশে নৃ-গোষ্ঠী, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর যোগ্য প্রার্থীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

বাছাই কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, নাগরিক প্রতিনিধি ও নৃ-গোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

কমিশনের কার্যপরিধি সুস্পষ্টকরণসহ অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা সহজ করা হয়েছে উল্লেখ করে এতে বলা হয়, কার্যকর তদন্তব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীর তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ কমিশনকে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে।

তদন্ত চলাকালীন ভুক্তভোগীর তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ বা ক্ষতি রোধে কমিশনকে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশদানের ক্ষমতার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জাতিসংঘের ‘নির্যাতনবিরোধী সনদের ঐচ্ছিক প্রটোকল’ অনুযায়ী হেফাজতে নির্যাতন, মৃত্যু বা গুম রোধকল্পে একটি জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা (এনপিএম) ইউনিট গঠনের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ভিসা পলিসি ২০২৬-এর খসড়া অনুমোদন : এ ছাড়া মন্ত্রিসভা বৈঠকে ভিসা পলিসি ২০২৬-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানা যায়, বিদেশিদের বাংলাদেশে আগমন ও প্রস্থানকে সহজ ও সুশৃঙ্খল করা; বিদেশি বিনিয়োগ, ব্যবসা ও দক্ষ মানবসম্পদ আকৃষ্ট করা; পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতকে উৎসাহিত করা; প্রযুক্তি ও জ্ঞান স্থানান্তর নিশ্চিত করা; জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা; পারস্পরিকতা (রেসিপ্রুসিটি) নীতির ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক এবং সেবামুখী অভিবাসন কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিদ্যমান ভিসা পদ্ধতি যুগোপযোগী, নিরাপদ, গতিশীল এবং সহজীকরণের উদ্দেশ্যে ‘ভিসা নীতিমালা-২০২৬’ প্রণীত হয়েছে।