সকাল থেকে যে মুখগুলোতে ছিল উৎকণ্ঠা, ফল প্রকাশের পর বদলে গেল সেই মুখগুলোর অভিব্যক্তি ফুটে উঠল হাসি। কেউ আনন্দে বন্ধুদের জড়িয়ে ধরছে, কেউ বাবা-মায়ের পা ছুঁয়ে দোয়া নিচ্ছে। আবার কেউ ছুটে যাচ্ছে প্রিয় শিক্ষকের কাছে। জিপিএ-৫ পাওয়ার আনন্দে শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস আর অভিভাবকদের আবেগে গতকাল সোমবার মুখর হয়ে ওঠে রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণ। ফল জানতে অনেক শিক্ষার্থী বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠানে আসে। মোবাইলে ফল দেখার পর কেউ আনন্দে চিৎকার করে ওঠে, আবার কেউ কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। পরে বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরে ভাগাভাগি করে নেয় সেই আনন্দ।
সকাল ৯টা থেকেই স্কুলের মাঠে জমায়েত হতে শুরু করেন এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলপ্রত্যাশী পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। ১০টায় সরকারিভাবে একযোগে ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীরা মোবাইলের (এসএমএস) মাধ্যমে নিজেদের ফল জেনে নেওয়া শুরু করে। তবে ফল প্রকাশের প্রথম প্রহরে বেশ দেখা পেলেও অনেকে না পাওয়ায় হতাশ হয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সবার মুখেই হাসি ফুটে ওঠে। দুপুর থেকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভিড় আরও বাড়তে থাকে প্রতিষ্ঠানে। ফল জানার পর একে অপরকে অভিনন্দন জানাতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। কেউ মোবাইল ফোনে ফল দেখিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেয়, কেউ পরিবারের সদস্যদের ফোন করে সুখবর জানায়। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলে সাফল্যের মুহূর্তটি স্মরণীয় করে রাখে। কারও চোখে আনন্দের পানি, কারও মুখে শুধুই উচ্ছ্বাসের হাসি। এই উচ্ছ্বাসের কমতি ছিল না অভিভাবকদের মধ্যেও।
এবার মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় দুই হাজার ৭৭৮ জন। এর মধ্যে দুই হাজার ৭২৩ জন পাস করেছে। পাসের হার ৯৮ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। এক হাজার ৪৯০ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।
জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ঘিরে ছিল বাড়তি উচ্ছ্বাস। ফল জানার পর জিপিএ-৫ পাওয়া এক শিক্ষার্থীকে মায়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। মা সন্তানের মাথায় হাত রেখে দোয়া করছিলেন। পাশে দাঁড়িয়ে বাবা মোবাইল ফোনে আত্মীয়স্বজনকে খবর জানাচ্ছিলেন। এক অভিভাবকের অনুভূতি যেন অন্য অনেক বাবা-মায়ের কথাই বলে দিচ্ছিল সন্তানের ভালো ফল শুধু সন্তানের নয়, বাবা-মায়ের দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও পরিশ্রমেরও স্বীকৃতি। পরীক্ষার আগে সন্তানের পড়াশোনা, রাত জাগা এবং ফল নিয়ে উদ্বেগের পর কাক্সিক্ষত সাফল্য পাওয়ায় তাদের চোখেমুখে স্বস্তি ছিল স্পষ্ট।
মতিঝিল আইডিয়ালের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জারীন তাসনিম পরবীর বাবা পুলিশ পরিদর্শক শেখ মো. কামরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরীক্ষার পর থেকে এই দিনটির অপেক্ষায় ছিলাম। সন্তান কী ফল করবে, তা নিয়ে ভেতরে ভেতরে চিন্তা ছিল। এখন মনে হচ্ছে এতদিনের কষ্ট সার্থক হয়েছে। মেয়েটি আজ জীবনের প্রথম পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। এর সব কৃতিত্ব তার মায়ের। আমি সারা দিন চাকরি নিয়ে ব্যস্ত থাকি। দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে সকাল-সন্ধ্যা স্কুলে ছুটেছে সে। বাসায় পড়াশোনা করিয়েছে। আজ আমি তাকেও অভিনন্দন জানাতে চাই।’
আবেগ চেপে রাখতে পারছিলেন না এই পুলিশ কর্মকর্তা। ভেজা চোখে বললেন, ‘একজন বাবার কাছে আজকের অনুভূতিটা ভাষায় বোঝানো অসম্ভব। সকালের পুরো টেনশনটা এক লহমায় কী ভীষণ এক স্বস্তিতে বদলে গেল!’ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীর মায়ের চোখেমুখেও তখন গর্ব। তিনি যোগ করলেন, ‘সন্তানদের দিন-রাত এক করা মেহনত আর শিক্ষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে আজকের এই দিনটা।’
স্কুল প্রঙ্গাণে শিক্ষার্থী তাসনিম মুনতারিন তাজরীর মা শামীমা আক্তার বলেন, ‘আমরা শুধু ভালো ফলের জন্য অপেক্ষা করিনি, সন্তান যেন নিজের সর্বোচ্চটা দিতে পারে, সেটাই চেয়েছি। আজ তার মুখের হাসি দেখে আমাদেরও খুব ভালো লাগছে। সামনে যেন আরও ভালো করতে পারে এটিই এখন প্রত্যাশা। তার সাফল্যে আমরা বাবা-মা দুজনেই গর্বিত। তবে এবার ফল প্রকাশ করতে দীর্ঘসময় লাগায় বেশ উদ্বেগে ছিলাম।’
জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী সিয়াম রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক নার্ভাস ছিলাম। ফল দেখে প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিল না। মাকে যখন বললাম জিপিএ-৫ পেয়েছি, তখন মায়ের মুখের হাসিটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।’
ফলের এসএমএসের অপেক্ষায় থাকা কয়েকটা মিনিট যেন শেষই হতে চাইছিল না শিক্ষার্থী রাফসান জামি আবরারের। ফোনে মেসেজটা আসতেই বুকের ওপর থেকে যেন মস্ত বড় একটা পাথর সরে গেল। আবরারের অকপট স্বীকারোক্তি ‘পরিশ্রম তো করেছি, কিন্তু শিক্ষক আর বাবা-মা পাশে না থাকলে এই দিনটি দেখাই হতো না। আমরা অনেক দিন একসঙ্গে পড়াশোনা করেছি। আজ সবাই মিলে ফল নিয়ে কথা বলছি। এই দিনটা আমাদের সবার জন্য অনেক স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী জাবের ইবনে জালাল বলেন, ‘ফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত খুব ভয় লাগছিল। যখন জিপিএ-৫ দেখলাম, তখন প্রথমে বিশ্বাসই হচ্ছিল না। বাবা-মাকে ফোন করে খবরটি দেওয়ার পর তাদের আনন্দ দেখে আমার সব কষ্ট সার্থক মনে হয়েছে।’
শিক্ষার্থী এসএমএ সোলাইমান বলেন, ‘পরীক্ষার সময় অনেক চাপ ছিল। অনেক রাত জেগে পড়েছি। আজ মনে হচ্ছে সেই পরিশ্রম বৃথা যায়নি। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগছে মা-বাবার মুখের হাসি দেখে।’
বন্ধুদের সঙ্গে ফল উদযাপন করতে আসা শিক্ষার্থী ফারদিন আহমেদ, সামিন জাওয়াদ ও সামিজৎ মাশরুর বলেন, আমরা সবাই একসঙ্গে অনেক দিন পড়াশোনা করেছি। আজ কে কত পেয়েছে, সেটার পাশাপাশি সবাই একসঙ্গে ভালো করেছি এটাই সবচেয়ে আনন্দের। বন্ধুদের সঙ্গে এই দিনটি মনে থাকবে অনেক দিন। তারপর মাঠজুড়ে শুরু হয় নাচ-গান আর মিষ্টিমুখের উৎসব।
মতিঝিল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ লাল মোহাম্মদ বলেন, এবার এসএসসি পরীক্ষার জন্য দুই হাজার ৭৮২ শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেছিল। তাদের মধ্যে চারজন পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া দুই হাজার ৭৭৮ জনের মধ্যে ৫৫ জন অকৃতকার্য হয়েছে। এ বছর পাস করেছে দুই হাজার ৭২৩ জন। এবার বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেয় দুই হাজার ৫৪১ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে ২৪১ জন। পাসের হার ৯৮ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় পাসের হার বেড়েছে শূন্য দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি থেকে দুই হাজার ৬৪০ শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৯৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ পাস করেছিল। ওই বছর জিপিএ-৫ পায় এক হাজার ৫৪৯ জন। এবার পাসের হার কিছুটা বাড়লেও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫৯ জন কমেছে।
জাতীয় ফলের তুলনায় আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতিঝিল বাংলা ও ইংলিশ মাধ্যম, বনশ্রী বাংলা ও ইংলিশ মাধ্যম এবং মুগদা শাখা ফল এবারও উল্লেখযোগ্য। সারা দেশে এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। সেখানে প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার ৯৮ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ।
একদিকে সন্তানের হাতে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে নতুন শিক্ষাজীবনের প্রস্তুতি সব মিলিয়ে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে এসএসসি ফল প্রকাশের দিনটি পরিণত হয় এক আনন্দঘন মিলনমেলায়। বাবা-মায়ের চোখের আনন্দের পানি আর শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাসে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই ফল শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়, এটি দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, পরিশ্রম ও স্বপ্নপূরণের একটি মুহূর্ত।
