সকাল-সকালই স্কুলে এসে জড়ো হতে থাকে শিক্ষার্থীরা। সবার চোখেমুখে উৎকণ্ঠা। মোবাইল ফোন হাতে সবাই চেষ্টা করছে ওয়েবসাইটে ঢোকার। কিন্তু ফল যেন ধরা দিচ্ছিল না। এসএমএসও আসছিল না। ৮২ দিন অপেক্ষা করলেও এ কয়েকটি মুহূর্ত যেন কিছুতেই কাটছিল না। অবশেষে হঠাৎ মোবাইল ফোনের স্কিনে ভেসে ওঠে কাক্সিক্ষত বার্তা। এসএমএস দেখেই আনন্দে চিৎকার, উচ্ছ্বাস। মুহূর্তেই বদলে যায় অপেক্ষার চিত্র।
এভাবেই এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পাসে বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীদের ভিড়। ফল জানার পর একজন ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরছেন আরেকজনকে, চলে আনন্দ ভাগাভাগি। কাক্সিক্ষত ফল হাতে পেয়ে ড্রামের তালে নেচে-গেয়ে উল্লাসে মেতে ওঠেন শিক্ষার্থীরা। তাদের আনন্দে যোগ দেন অভিভাবকরাও। প্রিয়জনদের মিষ্টি খাওয়ানো, হাসি-আড্ডা আর উচ্ছ্বাসে মুহূর্তেই পুরো ক্যাম্পাস পরিণত হয় আনন্দের উৎসবে। গতকাল সোমবার সকাল থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত এমন চিত্র দেখা যায়।
শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে ছিল আনন্দ আর ছিল দীর্ঘদিনের সহপাঠীদের দেখার আকুলতা। তেমনই একজন কৃতী শিক্ষার্থী রুমাইশা আলী মাশিহা। এসএমএসে জিপিএ-৫ পাওয়ার খবর নিশ্চিত হয়েই বাবার হাত ধরে ছুটে আসে স্কুলে।
অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে মাশিহা বলে, প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল হয়েছে। তবে আতঙ্কে ছিলাম। কাক্সিক্ষত ফল পাব, নাকি পাব না। ভালো ফলের পেছনে বাবা-মা ও শিক্ষকদের সবচেয়ে বেশি অবদান উল্লেখ করে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মাশিহা। পাশে থাকা সহপাঠীদের অনেকে ফলের এসএমএস দেখে আনন্দে মেতে উঠলেও বেলা প্রায় ১১টা পর্যন্ত ফল জানতে পারেনি শিক্ষার্থী মাইশা মোস্তফা। ফোন হাতে বারবার চেষ্টা করেই যাচ্ছিলেন। আর ক্যাম্পাসের গাছের নিচে বসে তার মা আছমা মোস্তফাও উৎকণ্ঠায় সময় পার করছিলেন। এরই মধ্যে মাইশার ফোনে এসএমএস আসে। আর তা দেখেই আনন্দে চিৎকার করে ওঠে মা জিপিএ-৫ পেয়েছি। দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে মাইশা উচ্ছ্বাস করতে থাকে। এ সময় মাইশার মা আছমা মোস্তফা চোখ মুছতে মুছতে বলেন, অনেক কষ্ট করেছি মেয়েটাকে নিয়ে। মেয়েটা ফলের টেনশনে সারারাত ঘুমায়নি, ঠিকমতো খাবার খায়নি।
বাবার হাত ধরে স্কুল গেট পর্যন্ত এসে ক্যাম্পাসের ভেতরে ভোঁ দৌড় দেয় শিক্ষার্থী রাইমা রহমান চৌধুরী। সহপাঠীদের সঙ্গে একে একে আলিঙ্গন করে, হাত ধরে আনন্দে মেতে ওঠে এবং কার কি রেজাল্ট এসেছে তা জানে। তার বাবা ক্যাম্পাসের ভেতরে এসে মেয়ের সহপাঠীদের ফল জানেন। অন্য শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে তিনিও কোলাকুলি করে আনন্দ ভাগাভাগি করেন।
রাইমার বাবা বলেন, রেজাল্ট আমরা বাসা থেকেই এসএমএসের মাধ্যমে দেখেছি। মেয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে, তাই খুব খুশি। মূলত বন্ধুদের সঙ্গে সেলিব্রেশন করতেই ওকে নিয়ে স্কুলে এসেছি। তিনি বলেন, অন্যান্য বছর ৬০ দিনে ফল প্রকাশ করলেও এবারই ৮২ দিনের মাথায় রেজাল্ট দিয়েছে। এ নিয়ে চিন্তিত ছিলাম, কেন এত দেরি হচ্ছে। না জানি মেয়ের রেজাল্ট আবার কাটছাঁট হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, সকাল থেকেই স্কুলে আসতে শুরু করে ফলপ্রত্যাশী ছাত্রীরা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের উপস্থিতি বাড়ে। সঙ্গে অভিভাবকরাও ছুটে আসেন। শিক্ষার্থীদের আনন্দ-চিৎকার আর উচ্ছ্বাসে মুখরিত হয়ে উঠে পুরো ক্যাম্পাস। হলরুমে ড্রাম বাজাতে থাকে জুনিয়র শিক্ষার্থীরা। ড্রামের তালে তালে নেচে-গেয়ে উল্লাসে মেতে উঠে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া শিক্ষার্থীরা। তারা ভিএনএস, ভিএনএস (ভিকারুননিসা নূন স্কুল) স্লোগান তোলে। ভি-চিহ্ন দেখিয়ে গ্রুপ ফটোসেশন করতে থাকে। এরই মধ্যে কোনো সহপাঠীকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেখলেই দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে উল্লাস করতে থাকে। কলেজ পর্যায়ে পড়ুয়াদের সঙ্গে এবং স্কুলের ম্যাডামদের জড়িয়ে ধরে বাঁধভাঙা আনন্দে মেতে উঠে শিক্ষার্থীরা। অভিভাবকরা দূর-দূরান্তে থাকা আত্মীয়স্বজনদের মোবাইলে কল করে মেয়ের অর্জিত ফলের সুখবর জানান। অন্য অভিভাবকদের সঙ্গে খোশগল্পে মেতে উঠেন, সেলফি তোলেন।
ফল ঘোষণার দিনে বাড়তি চাপ পড়ে বেইলি রোডের সড়কে। রিকশা, ব্যক্তিগত গাড়িতে ঠাসা সড়কে যানজট নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে দেখা যায় দায়িত্বরত ট্রাফিক পুুলিশ সদস্যদের। দুপুরের দিকে স্কুলের নোটিস বোর্ডে ফলের তালিকা টাঙানো হলে দেখা যায়, এবার স্কুলের ৪৩ ছাত্রী ফেল করেছে। তবে ফেল করা ছাত্রীদের স্কুলে দেখা যায়নি।
এ বছর প্রতিষ্ঠানটি থেকে পরীক্ষায় অংশ নেয় দুই হাজার ১১৬ জন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে পাস করেছে দুই হাজার ৭৩ জন। ফেল করেছে ৪৩ জন। গড় পাসের হার ৯৮.৩৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার ৫৯.৫৮ শতাংশ (১ হাজার ১১৫ জন)। তবে গত বছরে এই প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল দুই হাজার ১১৬ শিক্ষার্থী। এতে পাস করেছে দুই হাজার ৬১ জন। অকৃতকার্য হয়েছিল ৫৫ শিক্ষার্থী। পাসের হার ছিল ৯৭.৪০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পাওয়ার হার ছিল ৬৪.৩৪ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন এক হাজার ৩২৬ শিক্ষার্থী।
ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় এ বছর পাসের হার ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও জিপিএ-৫ এর হার কমেছে ৫ শতাংশ। এবার প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞান শাখার শিক্ষার্থীরা বেশি ভালো ফল করেছে। যদিও এ বিভাগ থেকেই বেশি ফেল করেছে।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম বলেন, এবার সারা দেশে গড় ফল খারাপ। সেটার প্রভাব আমাদের এখানেও কিছুটা আছে। তবে বিগত কয়েক বছরের যে ধারাবাহিকতা, তাতে খুব বেশি ছেদ ঘটেনি।