দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উত্তর পাশে বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে সারি সারি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, এটি রাজধানীর গুলশান, বারিধারা কিংবা বনানীর কোনো আবাসিক এলাকা। তবে কাছে গেলে ভিন্ন চিত্র। এসব ভবনের অধিকাংশই জনশূন্য। বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, নেই পাকা রাস্তা কিংবা নাগরিক সুবিধা। অনেক ভবনের প্রধান ফটকে ঝুলছে তালা। স্থানীয়দের ভাষায়, এগুলো যেন ‘ভুতুড়ে বাড়ি’।
পার্বতীপুর উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়নের বাঁশপুকুর, কাজীপাড়া ও চৌহাটি মৌজায় ফসলি জমি ভরাট করে দুই শতাধিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। তিনতলা থেকে চারতলা পর্যন্ত এসব ভবনের বেশির ভাগই বিল্ডিং কোড, নকশা অনুমোদন ও নিরাপত্তা বিধি না মেনে নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন নতুন ভবন নির্মাণের কাজও চলছিল।
সরেজমিনে দেখা যায়, ফসলি জমির মাঝখানে অপরিকল্পিতভাবে ভবনগুলো দাঁড়িয়ে আছে। এসব স্থাপনায় যেতে জমির আইল ধরে হাঁটতে হয়। ভবনের আশপাশে নেই ড্রেনেজ ব্যবস্থা বা পাকা সড়ক। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সংবাদকর্মী কিংবা অপরিচিত কেউ ছবি বা ভিডিও ধারণ করতে গেলেও বাধার মুখে পড়তে হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, নির্মিত তিন ও চারতলা ভবনের অধিকাংশেই কেউ বসবাস করেন না। শুধু ভবন নির্মাণ করে রাখা হয়েছে। তাঁদের দাবি, সরকার যেন বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করে এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করে।
বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিএমসিএল) পরিচালনা পর্ষদ খনি সম্প্রসারণের জন্য প্রথমে ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। খনির উত্তর পাশে ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে ২০২৬ সালের ২০ মে খনির পূর্ব-দক্ষিণ পাশে আরও ১ দশমিক ৩৬ একর জমি অধিগ্রহণের অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর চিহ্নিত এলাকায় নিয়মবহির্ভূতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণের প্রবণতা বেড়ে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভবিষ্যতে অধিগ্রহণের সময় বেশি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় অনুমোদন ছাড়াই এসব স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাঁশপুকুর ও কাজীপাড়া গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, খনির কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী বেনামে কিংবা দালালদের মাধ্যমে এসব নির্মাণকাজে অর্থ বিনিয়োগ করছেন।
চলমান একটি নির্মাণকাজে থাকা এক রাজমিস্ত্রি জানান, প্রায় ৩০ শতক জমির ওপর একটি দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, ভবনটির মালিক কয়লা খনির একজন কর্মকর্তা।
পার্বতীপুর উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সার্ভে করার সময় খনির ২২ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় খনি কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় দালালচক্রের যোগসাজশে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে।
হামিদপুর-কাজীপাড়া এলাকায় বিল্ডিং ও গুদাম নির্মাণের বিষয়ে জানতে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির মহাব্যবস্থাপক (সারফেস অপারেশন) আবুল কালাম মুহাম্মদ বদরুল আলমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তিনি কোনো বিল্ডিং বা গুদাম করেননি। সম্প্রসারণ এলাকায় তাঁর স্ত্রীর নামে জায়গা ছিল এবং সেখানে তাঁর স্ত্রীর নামে একটি গুদাম রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কাজীপাড়া গ্রামে ওই কর্মকর্তার দুই থেকে তিনটি ভবন ও কয়েকটি গুদাম রয়েছে।
খনির ব্যবস্থাপক (সাবসিডেন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট) মুহাম্মদ আক্কাছ আলীর বিরুদ্ধে চৌহাটি গ্রামে সম্প্রসারণ এলাকায় একটি দ্বিতল বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। জেলা প্রশাসক পরিদর্শনের সময় বাড়িটির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার কথাও বলা হয়েছে। তবে আক্কাছ আলী বলেন, সম্প্রসারণ এলাকায় তিনি কোনো বাড়ি করেননি এবং সেখানে তাঁর কোনো জায়গাও নেই।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বাড়ির মালিকদের মধ্যে খনির কর্মকর্তা-কর্মচারী, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার আন্দোলনের নেতা ইব্রাহিম খলিল, বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান এবং স্থানীয় প্রভাবশালীরাও রয়েছেন।
হামিদপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব সাজেদুর রহমান বলেন, বাঁশপুকুর, কাজীপাড়া ও চৌহাটি মৌজায় নিয়ম না মেনে নির্মিত ভবনগুলোর কোনো হোল্ডিং ট্যাক্স বা নিবন্ধন করা হয়নি। নতুন সরকারি জরিপের সময় এসব ভবনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ইউপি চেয়ারম্যান রেজওয়ানুল হক বলেন, ভবন নির্মাণে অনুমতি প্রয়োজন হলেও গ্রামের লোকজন তা মানেন না। দুইতলা ভবন নির্মাণের অনুমতি ইউনিয়ন পরিষদ দিতে পারে। ২০২৪ সালে চারতলা ভবন নির্মাণের অনুমতি ছিল, এখন আর তা নেই। তিন থেকে চারতলা ভবনের অনুমোদন উপজেলা কমিটির মাধ্যমে দেওয়া হয়।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাঁশপুকুর ও কাজীপাড়া গ্রামে প্রায় ১৫০ এবং চৌহাটি মৌজায় প্রায় ৫০টি, অর্থাৎ মোট ২০০টি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ থেকে ৫০টির মতো হোল্ডিং রয়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে এ ধরনের বহুতল ভবন নির্মাণ চলছে। সম্প্রসারণ এলাকায় তাঁর নিজের তিন-চারটি ভবন থাকার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি সাক্ষাৎ করে কথা বলবেন বলে জানান।
তবে পার্বতীপুর উপজেলা ইমারত ভবন নকশা কমিটির সদস্য ও উপজেলা প্রকৌশলী মো. মানিক মিঞা বলেন, বাঁশপুকুর, কাজীপাড়া ও চৌহাটি এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমতির জন্য এখন পর্যন্ত কেউ আবেদন করেননি। তাঁর দাবি, বর্তমানে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। তবে কতগুলো ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান তাঁর কাছে নেই।
পার্বতীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মাহমুদ হুসাইন রাজু বলেন, এসব বিষয়ে এলাকাবাসীর কাছ থেকে অনেক অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিল্ডিং কোড না মেনেই ভবনগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে ওইসব এলাকার খাজনা গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ১০ বছর আগে খনি এলাকার ১৩টি গ্রামে কৃষিজমি, বসতবাড়ি, মসজিদ, কবরস্থান, স্কুল, কলেজ, ব্যাংক-বিমা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ ৬৬৭ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। এসব জমির মূল্য পরিশোধ করে খনি কর্তৃপক্ষ। পরে জমি ও বাড়ির মালিকেরা অন্যত্র চলে যান।
বাঁশপুকুর গ্রামের বাসিন্দা বেলাল হোসেন বলেন, এর আগেও তাঁদের অনেক জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। যে ক্ষতিপূরণ তাঁরা পেয়েছেন, তা দিয়ে অন্য জায়গায় একই পরিমাণ জমি কেনা সম্ভব হয়নি।
হামিদপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জাহেদুজ্জামান বলেন, ইউনিয়নের ২৮টি মৌজায় ৯ হাজার ৫০২ একর কৃষিজমি রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৩ একর অকৃষি জমি। এসব জমির মধ্যে প্রায় অধিকাংশ কৃষিজমিতে বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। ফলে এলাকায় ধীরে ধীরে কৃষিজমির পরিমাণ কমছে।
বসতবাড়ি রক্ষা কমিটির সভাপতি নুর মোহাম্মাদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, খনির কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী মহলের প্ররোচনায় মানুষ এ ধরনের নির্মাণে উৎসাহিত হয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। তাঁর দাবি, পাতরাপাড়া বা আশপাশের অন্য গ্রামগুলোতে এভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ হয়নি। পাতরাপাড়া-মৌপুকুর এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ সরাসরি প্রকৃত ভূমির মালিককে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
পার্বতীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাজিব হুসাইন বলেন, অধিগ্রহণ এলাকার কৃষিজমিতে অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণের কারণে উর্বর কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কর্তৃপক্ষের সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৫ সালে পার্বতীপুরে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি আবিষ্কৃত হয়। শুরুতে খনিটির আয়তন ছিল ৬ দশমিক ৬৮ বর্গকিলোমিটার। খনির প্রয়োজনে ১৯৯৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কয়েক দফায় ৭৯২ দশমিক ৭৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়।
এখন সরকার খনির আয়তন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য আরও ৩০১ দশমিক ৩৬ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। প্রয়োজনীয় জরিপ ও সার্ভের কাজ চলছে। ড্রিলিংয়ের মাধ্যমে ছয়টি বোরহোল করে ভূ-তাত্ত্বিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। পরবর্তী ফেইস ডেভেলপমেন্টের জন্য প্রয়োজনীয় নকশা তৈরি করে গত বছর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
২০২৪ সালে অধিগ্রহণের আগে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির জন্য ৫০ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়। এর আগেই খনির উত্তর দিকে দুটি গ্রামের কৃষিজমিতে তিন থেকে চারতলা ভবন নির্মাণ করা হয়।
২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু তালেব ফারাজী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. জানে আলম, জেলা প্রশাসন ও খনি কর্তৃপক্ষের কয়েকজন কর্মকর্তা বাঁশপুকুর ও কাজীপাড়া গ্রাম পরিদর্শন করেন। তখন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ড্রোন দিয়ে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে চাইলে ভবন মালিকদের বাধার কারণে তা করা সম্ভব হয়নি।
দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখা সূত্র জানায়, ১৯৯৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কয়েক দফায় ৭৯২ দশমিক ৭৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন-২০১৭ অনুযায়ী, জেলা রেজিস্ট্রি অফিসে গত তিন বছরে হামিদপুর ইউনিয়নের মৌজাগুলোর জমি যে দামে বিক্রি হয়েছে, তার গড় হিসাব করে অধিগ্রহণ করা জমি ও স্থাপনার মূল্য নির্ধারণ করা হবে।
বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহ আলম বলেন, সরকার খনি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। অধিগ্রহণের আগেই খনির উত্তর পাশের বাঁশপুকুর, কাজীপাড়া ও চৌহাটিতে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। সম্প্রসারণ এলাকায় খনির কোনো কর্মকর্তা ভবন নির্মাণ করেছেন- এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর মতে, সম্প্রসারণ এলাকায় যারা এসব নির্মাণ করেছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য ভালো নয়।
স্থানীয়দের দাবি, জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ কোনো দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে নয়, সরাসরি প্রকৃত ভূমির মালিকের হাতে দিতে হবে। একই সঙ্গে যারা জমি হারিয়ে ভূমিহীন হয়ে পড়বেন, তাঁদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।