কতদিন চলবে রশি টেনে পারাপার?

দুই পাড়ের মাঝে দূরত্ব সামান্য, অথচ এই অল্প পথই হাজারো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বড় ভোগান্তির নাম। নদীর ওপর কোনো সেতু না থাকায় ভরসা কেবল রশি টেনে চালানো একটি খেয়ানৌকা। বর্ষা মৌসুমে সেই ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার রূপ নেয় মারাত্মক আতঙ্কে। শিশু, বৃদ্ধ কিংবা শিক্ষার্থী-জীবনের তাগিদে সবাইকে প্রতিদিন মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে পাড়ি দিতে হচ্ছে নাটোরের গুরুদাসপুরের গুমানী নদী।

নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার মশিন্দা ইউনিয়নের আলিয়া মাদ্রাসা ঘাটে বছরের পর বছর ধরে এমন চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন তিনটি ইউনিয়নের অন্তত ৪০ হাজার মানুষ। ঘাটে একটি সেতু নির্মাণের দাবি অনেক পুরোনো। জানা যায়, বিগত সরকারের আমলে এই সেতু নির্মাণের প্রস্তাব অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় যায়। পরবর্তীকালে নির্ধারিত স্থানে প্রাথমিক মাপজোক এবং মাটি পরীক্ষার (সয়েল টেস্ট) কাজও সম্পন্ন করা হয়। তবে রহস্যজনকভাবে সেতুর নকশা আটকে থাকায় থেমে গেছে পুরো নির্মাণপ্রক্রিয়া।

গুরুদাসপুর উপজেলা প্রকৌশলী মিলন মিয়া জানান, ওই স্থানে প্রায় ৯৫ ফুট দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। নকশা অনুমোদিত হলে অর্থ বরাদ্দ সাপেক্ষে দরপত্র আহ্বান করে দ্রুত কাজ শুরু করা সম্ভব। তবে নকশাটি ঠিক কী কারণে আটকে আছে, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।

গুমানী নদীর দুই পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে উত্তর বাহাদুরপাড়া, সাহাপুর, চরসাহাপুর, চরপিপলা, শ্রীপুর এবং পার্শ্ববর্তী সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার কাটাবাড়ি, হেমনগরসহ অন্তত ১৭টি গ্রাম। এসব গ্রামের দৈনন্দিন জীবন খেয়াঘাটকেন্দ্রিক। শুকনো মৌসুমে বাঁশের সাঁকো বা চারাট দিয়ে চললেও বর্ষায় খেয়ানৌকাই একমাত্র উপায়। বর্তমানে নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় নৌকায় ওঠার জন্য প্রায় ১০ ফুট দীর্ঘ নড়বড়ে বাঁশের চারাট ব্যবহার করতে হচ্ছে। সেই সরু পথ পেরিয়ে নৌকায় উঠে যাত্রীরা নিজেরাই রশি টেনে এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যাতায়াত করছেন।

নদীর উত্তর পাড়ে পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা। শিক্ষা, চিকিৎসা, হাটবাজার ও উপজেলা সদরের সব সুবিধাই দক্ষিণ পাড়কেন্দ্রিক হওয়ায় বাধ্য হয়ে তাদের নদী পার হতে হয়। সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় কৃষিপণ্য ও মালামাল পরিবহনে দ্বিগুণ পর্যন্ত খরচ গুনতে হচ্ছে স্থানীয়দের। নদীতে পানি ও স্রোত বাড়লে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন তারা।

এদিকে গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজ জানান, নদীর উত্তর পাড়ের কাঁচা সড়ক পাকাকরণের কাজ চলছে এবং রশি টেনে খেয়া পারাপারের বিষয়টি সত্য। তবে প্রস্তাবিত সেতুর বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তাঁর জানা নেই।

একটি সেতু নির্মিত হলে কমবে যাতায়াতের ঝুঁকি, সহজ হবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন এবং দ্রুত বাজারে পৌঁছাবে কৃষকের ফসল। কিন্তু মাপজোক ও মাটি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরও সেতুটি কাগজের নকশায় আটকে থাকায় গুমানী নদীর দুই পাড়ের মানুষের প্রতীক্ষার প্রহর যেন আর শেষ হচ্ছে না।