বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ‘আক্ষেপ’ এর নাম আশরাফুল

খেলার দুনিয়া সবসময়ই কিছু ‘কী হতো যদি’ বা অপূর্ণতার গল্পে ভরপুর থাকে। এমন অনেক খেলোয়াড় থাকেন, যাদের ঘিরে জন্ম নেয় সর্বকালের সেরা হয়ে ওঠার স্বপ্ন। কিন্তু পরিস্থিতি, চোট কিংবা ভুল সিদ্ধান্ত তাদের ক্যারিয়ারের মোড় চিরতরে বদলে দেয়। বাংলাদেশের ক্রিকেটেও এই ট্র্যাজিক রূপকথার মতো চরিত্রটি আছে, তিনি মোহাম্মদ আশরাফুল। 

ফক্স স্পোর্টসের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে তাকে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ‘কী হতো যদি’ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তিনি এমন এক প্রতিভাবান তারকা ছিলেন যিনি ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখতেন। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান কিংবা রেকর্ডের পাতা ওল্টানো তামিম ইকবালের যুগ আসার অনেক আগে, বাংলাদেশ দলের কাঁধে ভরসা হয়ে এসেছিলেন এই ব্যাটার।

শুধু একজন প্রতিভাবান তরুণ হিসেবেই তাকে দেখা হতো না; বরং টেস্ট খেলুড়ে দেশের প্রথম প্রজন্মকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তাকে ভাবা হয়েছিল এক প্রতীকী পুরুষ হিসেবে। অথচ তার ক্যারিয়ার এমন কিছু অবিস্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছিল যা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে চিরতরে বদলে দিলেও, শেষ পর্যন্ত তা ক্রিকেটের অন্যতম মর্মান্তিক এক সতর্কবার্তা বা শিক্ষণীয় ট্র্যাজেডি হয়েই রয়ে গেছে।

আশরাফুলের শুরুটা হয়েছিল উপন্যাসের সবচেয়ে সুন্দর অনুচ্ছেদের মতো। ২০০০ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর থেকেই শুরুর বছরগুলোতে বড় ব্যবধানে হার ছিল বাংলাদেশের নিত্যদিনের সঙ্গী। সমর্থকরা কেবল এমন এক অধ্যায়ের অপেক্ষায় ছিলেন যা তাদের মনে আশার আলো জ্বালাতে পারে। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকেই সেই আস্থার প্রতীক হয়ে আবির্ভূত হন ১৭ বছরের এক নির্ভীক কিশোর।
আশরাফুলের ১৭ বছর বয়সে ১১৪ রানের সেই ইনিংস টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ানের বিশ্বরেকর্ড, ছবি: সংগৃহীত

মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১১৪ রানের সেই ইনিংস খেলে সে সময় টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ানের বিশ্বরেকর্ড গড়েন আশরাফুল। সেই সেঞ্চুরি কেবল আরেকটি সেঞ্চুরি ছিল না; এটি ছিল সেই মুহূর্ত যা বাংলাদেশকে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিল যে তাদের দলে এমন একজন খেলোয়াড় আছেন যিনি বিশ্বের সেরা বোলারদের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে বুক চিতিয়ে লড়তে পারেন। রাতারাতি তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের মুখপত্র।

আশরাফুলের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার খেলার সহজাত স্বাধীনতা। ধৈর্য বা রক্ষণাত্মক কৌশলে রান তোলার চেয়ে তিনি বিশ্বাস করতেন সাবলীল স্ট্রোক প্লে এবং নির্ভীক মানসিকতায়। তার অসাধারণ শট খেলার ক্ষমতা এবং বিশ্বের সেরা বোলিং লাইনআপের মুখোমুখি হওয়ার সাহস তাকে তার প্রজন্মের অন্যতম প্রতিভাবান খেলোয়াড় করে তুলেছিল, যদিও এই স্টাইলটি মাঝে মধ্যেই তাকে চরম অসামঞ্জস্যতার মুখে ঠেলে দিত। 

তার এই প্রতিভাকে সামনে এনে ফক্স স্পোর্টস তাদের বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, তার অপ্রতিরোধ্য স্ট্রোক প্লে পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। বিশেষ করে ২০০৫ সালের ন্যাটওয়েস্ট সিরিজে কার্ডিফে তার সেই অমর ইনিংসটি ক্রিকেট ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। রিকি পন্টিং, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, ম্যাথু হেইডেন ও গ্লেন ম্যাকগ্রার মতো তারকাখচিত অস্ট্রেলিয়া দল তখন বিশ্ব ক্রিকেটের অপ্রতিরোধ্য রাজা। আর বাংলাদেশ তখনো ওয়ানডে ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পারেনি এবং তাদের জয়ের কোনো সম্ভাবনাই কেউ দেখেনি।
২০০৫ সালে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পর বাংলাদেশ দলের উল্লাসের মুহূর্ত, ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু আশরাফুলের মনে ছিল অন্য কিছু। তার দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরিতে ভর করে ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটনের জন্ম দেয় বাংলাদেশ, যা প্রমাণ করে তারা বিশ্বসেরাদের হারাতে সক্ষম। সেই ঐতিহাসিক জয়ের পর তৎকালীন বাংলাদেশ কোচ ডেভ হোয়াটমোর ‘ক্রিকইনফো’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া অতটা খারাপ খেলেনি। বিষয়টি কেবল এমন ছিল যে বাংলাদেশ দলওই বিশেষ দিনেঅনেক ভালো ক্রিকেট খেলেছে।’ বিশ্বসেরা দলকে হারানোর এই সাফল্য সম্পর্কে হোয়াটমোর আরও যোগ করে বলেছিলেন, ‘আমরা বিশ্বের ১ নম্বর দলকে হারিয়েছি, এবং এটি অনেক মানুষকে দুবার ভাবতে বাধ্য করবে।’ 

কার্ডিফ ছাড়াও ট্রেন্টব্রিজে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র ৫২ বলে শ্বাসরুদ্ধকর ৯৪ রানের ইনিংস কিংবা ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৩৯ রানের দলীয় সংগ্রহে একাই ৫৮ রান করার মতো ইনিংসগুলো দিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন ২০ বছর বয়সী সেই তরুণ। তার এমন ব্যাটিং দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন খোদ অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক রিকি পন্টিংও। তবে পন্টিং তার প্রশংসার পাশাপাশি একটি সতর্কবার্তাও দিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এমন সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ অ্যাপ্রোচ বেশি দিন টেকসই হতে পারে কি না, সে বিষয়ে পন্টিং বলেছিলেন, ‘সত্যি বলতে, এই মুহূর্তে সে তার ভাগ্যের ওপর অনেক বেশি ভরসা করে খেলছে। আপনি যত বেশি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টিকে থাকবেন, ততই বুঝতে পারবেন যে এভাবে সবসময় কাজ হয় না, আপনাকে আরও একটু নির্বাচকমূলক হতে হবে।’

এমনকি দলের ভেতরেও এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ছিল। সে সময়ের অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমনের মতে, তরুণ তারকার আক্রমণাত্মক সহজাত প্রবৃত্তি থামানোর চেষ্টা করা বেশ কঠিন ছিল। হাবিবুল বাশার মন্তব্য করে বলেছিলেন, ‘সে সব ধরনের শট খেলতে সক্ষম। আমি তাকে থামানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু সে ভালো খেলছে, তাই যতক্ষণ সে সফল হচ্ছে তাকে সেই শটগুলো না খেলার পরামর্শ দেওয়ার কোনো মানে হয় না।’

কিন্তু ক্যারিয়ারের পরের দিকে এই ধারাবাহিকতার অভাবই তার বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। টিনএজ বয়সেই অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পেলেও নিজের পরিসংখ্যানকে কখনো প্রতিভার সঙ্গে মেলাতে পারেননি তিনি। টেস্টে ২৪ এবং ওয়ানডেতে ২২-এর কোঠায় গড়া তার ব্যাটিং গড় সেই প্রতিভার প্রকৃত বিচার করতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালে ‘দ্য ক্রিকেট মান্থলি’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের ক্যারিয়ারের টানাপোড়েন নিয়ে আশরাফুল নিজেই ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন যে তাকে কোচিং করানোর সময় শট সিলেকশন বা রান করার স্থায়ী কৌশলের চেয়ে কেবল টেকনিকের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি সব পর্যায়ে খেলেছি, এ দল, অনূর্ধ্ব-১৯, জাতীয় দল। কিন্তু আমার ভুলগুলো কোথায় ছিল, তা বসে বোঝার সুযোগ আমি খুব কমই পেয়েছি। তারা ভেবেছিল হয়তো আমি বেশি বেশি খেলে শিখব, কিন্তু এখন আমার মনে হয় উল্টোটা করলে হয়তো সাহায্য হতে পারত।’ সাকিব বা নাসিরের মতো ম্যাচ রিডিংয়ের ক্ষমতা ও গ্যাপ বের করে রান তোলার ট্রেনিং তার কোচিংয়ের সময় ছিল না আক্ষেপ করে আশরাফুল সে সময় বলেছিলেন।

মোহাম্মদ আশরাফুল, ছবি: সংগৃহীত

তবে ক্যারিয়ারের এই উত্থান-পতনের চেয়েও বড় ট্র্যাজেডি অপেক্ষা করছিল ২০১৩ সালে। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) স্পট-ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে নাম জড়ানোর পর বিশ্ব ক্রিকেট স্তব্ধ হয়ে যায়। অন্যান্যদের মতো তিনি বিষয়টি অস্বীকার না করে গণমাধ্যমের সামনে নিজের অপরাধ স্বীকার করেন এবং দেশবাসীর কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। তদন্তে সহযোগিতা করায় শাস্তি কিছুটা কমানো হলেও তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি সেখানেই ঘটে যায়।

পরবর্তী সময়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিরে আসলেও জাতীয় দলে কামব্যাক করা আর তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। ততদিনে বাংলাদেশ ক্রিকেটে তামিম, সাকিব, মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহদের হাত ধরে এক স্বর্ণালী যুগের সূচনা হয়েছে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বমঞ্চে সত্যিকার অর্থেই নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে, কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, যে খেলোয়াড়টিকে এই পথচলার সবচেয়ে বড় দিশারী ভাবা হয়েছিল, তাকে ছাড়াই এই সাফল্য অর্জন করতে হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং কোচ আশরাফুল, ছবি: সংগৃহীত

তবে আশরাফুলের বর্ণিল এই গল্পের সবচেয়ে প্রতীকী অধ্যায় যেন ফিরে এসেছে ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়া সফরে। ২০০৩ সালের পর দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় পর আবারও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ খেলতে গেছে বাংলাদেশ দল। ২৩ বছর আগে যে ঐতিহাসিক সফরে আশরাফুল দলের একজন তরুণ ক্রিকেটার হিসেবে মাঠে লড়াই করেছিলেন, ঠিক দীর্ঘ সময় পর সেই অস্ট্রেলিয়া সফরেই তিনি ডাগআউটে ফিরেছেন একদম ভিন্ন এক ভূমিকায়, দলের ব্যাটিং কোচ হিসেবে! বর্তমান বাংলাদেশ টেস্ট স্কোয়াডের কোনো ক্রিকেটারেরই এর আগে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা না থাকলেও, তার কাছে অজিদের কন্ডিশন ও মাঠের পরিবেশ এক চেনা অধ্যায়। খেলোয়াড় হিসেবে অতীতের সেই সোনালী ও বিতর্কিত দিনগুলো পেছনে ফেলে কোচিং প্যানেলে তার এই ফেরা তার ক্রিকেট জীবনের এক অনন্য বৃত্তপূরণ।

আশরাফুল সবসময়ই বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতিভা এবং একই সঙ্গে ফক্স স্পোর্টসের প্রতিবেদনে উঠে আসা এই সবচেয়ে বড় আক্ষেপের নাম হিসেবে বেঁচে থাকবেন। তার অভিষিক্ত শতক বাংলাদেশকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, আর কার্ডিফের সেঞ্চুরি বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ কারো চেয়ে পিছিয়ে নেই। পরিসংখ্যান হয়তো তার প্রতিভার পুরো বিচার করতে পারেনি, কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রথম সত্যিকারের সুপারস্টার হওয়ার সেই স্বপ্নভঙ্গ এবং উত্থান-পতনের গল্প ফক্স স্পোর্টসের বর্ণনা অনুযায়ী তাকে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ‘কী হতো যদি’-এর জীবন্ত উপাখ্যান বানিয়ে রেখেছে।