শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত করে তোলার অভিযোগে বড় ধরনের আইনি লড়াইয়ের মুখে পড়েছে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মালিকানা প্রতিষ্ঠান মেটা। যুক্তরাষ্ট্রের চার অঙ্গরাজ্য প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে করা মামলায় সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। খবর ফ্রান্স২৪।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য এই মামলা ১৯৯০-এর দশকে তামাক কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলোর মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্য মেটার বিরুদ্ধে মামলা করে। তাদের অভিযোগ, শিশু-কিশোরদের দীর্ঘ সময় ধরে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে আটকে রাখতে প্রতিষ্ঠানটি ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কিছু ফিচার তৈরি করেছে, যা ব্যবহারকারীদের মধ্যে আসক্তি তৈরি করে।
মামলার প্রতিনিধিত্ব করছে ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, কেনটাকি ও নিউ জার্সি। বুধবার অকল্যান্ডে মামলার জন্য জুরি বাছাই শুরু হয়েছে। আগামী ১৮ আগস্ট থেকে উভয় পক্ষের প্রাথমিক বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
মেটা অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র বলেছেন, তরুণদের অনলাইনে নিরাপদ রাখতে মেটা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। এ বিষয়ে অভিভাবক, বিশেষজ্ঞ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গেও কাজ করেছে তারা।
ক্ষতিপূরণ ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার
মামলায় মেটার বিরুদ্ধে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণই নয়, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে বেশ কিছু পরিবর্তন আনার দাবিও জানানো হয়েছে। ক্ষতিপূরণের পরিমাণ সর্বোচ্চ ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার হতে পারে।
এই অঙ্কটি মেটার বর্তমান বাজারমূল্য, প্রায় ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।
তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় অঙ্কের অর্থের চেয়েও মেটার জন্য বড় সমস্যা হতে পারে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। আদালতের নির্দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নকশা ও ব্যবসায়িক পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হলেও সেটি মেটার জন্য বড় চাপ তৈরি করবে।
মেটার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গও মামলায় গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে আদালতে হাজির হতে পারেন।
তামাক কোম্পানির সঙ্গে তুলনা
বার্কলের লাইফ সায়েন্সেস ল অ্যান্ড পলিসি সেন্টারের পরিচালক ভিনসেন্ট জোরালেমন মামলাটিকে ১৯৯০-এর দশকে তামাক কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে হওয়া আইনি লড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
তামাকের ক্ষতিকর দিক নিয়ে বহু বছর গবেষণার পর যুক্তরাষ্ট্রে কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে মামলা শুরু হয়েছিল। পরে তদন্তে অভিযোগ ওঠে, তামাক কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের ক্ষতি সম্পর্কে তথ্য গোপন করেছিল এবং শিশুদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষেত্রেও এখন একই ধরনের প্রশ্ন উঠছে—প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পণ্যের সম্ভাব্য ক্ষতি সম্পর্কে কতটা জানত এবং ব্যবহারকারীদের কতটা তথ্য জানিয়েছিল।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক নোরা ফ্রিম্যান এংস্ট্রমের মতে, মেটা ভেতরে কী জানত এবং বাইরে কী বলেছিল—এই পার্থক্য মামলায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মেটার বিরুদ্ধে বাড়ছে মামলা
মেটার বিরুদ্ধে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আদালতে একাধিক মামলা হয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেস ও নিউ মেক্সিকোতে পৃথক দুটি মামলায় একই ধরনের অভিযোগে মেটার বিরুদ্ধে রায়ও হয়েছে। দুই মামলায় মিলিয়ে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি ডলার।
গত মে মাসে কেনটাকির একটি স্কুল ডিস্ট্রিক্টের করা মামলায় মেটা, স্ন্যাপ, টিকটক ও ইউটিউব ২ কোটি ৭০ লাখ ডলারে সমঝোতা করে। ওই মামলা প্রায় ১ হাজার ২০০টি একই ধরনের মামলার ওপর প্রভাব ফেলতে পারত।
এরপর সোমবার একটি ফেডারেল আপিল আদালত মেটা, গুগল, স্ন্যাপ ও টিকটকের বিরুদ্ধে দায়ের করা আরও ৩ হাজারের বেশি মামলা এগিয়ে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, মানসিক স্বাস্থ্য এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দায়বদ্ধতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই আইনি লড়াই সহজে শেষ হচ্ছে না। বরং আগামী কয়েক বছর ধরে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে।