দেশের স্থলভাগে সিলেটের পর অন্যতম প্রধান গ্যাস সম্ভাবনাময় অঞ্চল ভোলা ও আশপাশে নতুন গ্যাসের সম্ভাবনা মিললেও যথাসময়ে অনুসন্ধান ও উত্তোলন না হওয়ায় তার খেসারত দিচ্ছে দেশ। ভোলার বোরহানউদ্দিনে ১৯৯৫ সালে গ্যাস পাওয়ার পর ৩১ বছর কেটে গেলেও ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়নি। এমনকি ভোলার আশপাশের এলাকাগুলোতে গ্যাস পাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকলেও অনুসন্ধান ও উত্তোলনে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোলার গ্যাসকে কাজে লাগাতে হলে সম্ভাবনাময় উপকূলীয় গ্যাস জোন মুলাদী-মেহেন্দীগঞ্জ, চরফ্যাশন, হাতিয়া ও মনপুরা এলাকায় দ্রুত অনুসন্ধানের পাশাপাশি উৎপাদনও বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) সূত্র জানিয়েছে, দ্বিমাত্রিক ভূতাত্ত্বিক জরিপে ভোলা নর্থ গ্যাসক্ষেত্রের উত্তর পাশে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ ও মুলাদীতে গ্যাস পাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। একই ভূগঠনের চরফ্যাশনে ত্রিমাত্রিক ভূতাত্ত্বিক জরিপের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
দেশে এখন মোট গ্যাসের চাহিদা ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে অন্তত ৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট আমদানি করা এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয়। দেশীয় খনি থেকে গত ১০ আগস্ট পর্যন্ত ১ হাজার ৫২৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস তোলা হয়েছে। ভোলায় এখন যে কূপ রয়েছে, সেখানে অন্তত দৈনিক ১০০ থেকে ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস অব্যহৃত রয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে আরও ২০টি কূপ খনন করলে প্রতি কূপে ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত। সব মিলিয়ে ভোলা থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলে সংকট থাকত না।
জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘ভোলার গ্যাস নিয়ে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে সরকার আশাবাদী। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ করেছেন। এরপর আমরা অনলাইনে পেট্রোনাসের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের চেয়ারম্যানের সঙ্গেও কথা হয়েছে। আমাদের একটি টিম সেখানে গিয়েছিল এবং ফিরেও এসেছে। আমরা খুবই আশাবাদী, পেট্রোনাসের সঙ্গে কোলাবোরেশন করে ভোলার গ্যাসে ভালো কিছু করতে পারব।’
মেহেন্দীগঞ্জ ও মুলাদীতে নতুন সম্ভাবনা : ভোলার নর্থ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয় ২০১৮ সালে। এরপর অতি সম্প্রতি পাশের এলাকাগুলোর মধ্যে মেহেন্দীগঞ্জ ও মুলাদীতে দ্বিমাত্রিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ চালিয়েছে বাপেক্স। সব মিলিয়ে ৩ হাজার ২২০ লাইন কিলোমিটার জরিপের ফল গত মাসে বাপেক্সের হাতে এসেছে। জরিপের ফলে দেখা গেছে, ভোলা নর্থের সঙ্গে এই এলাকার ভূগঠনের মিল রয়েছে, যা গ্যাস পাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
বাপেক্সের ভূপদার্থিক বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক (দ্বিমাত্রিক জরিপ) আব্দুল হালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, মুলাদী ও মেহেন্দীগঞ্জে আমরা যে জরিপ করেছিলাম, তার ফল বেশ ভালো। স্যাটেলাইট ইমেজে একটি কূপের ড্রিলিং পয়েন্ট দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি হয়নি। তিনি বলেন, ভোলা নর্থের ভূগঠনের সঙ্গে মুলাদী-মেহেন্দীগঞ্জের ভূগঠনের মিল পাওয়া গেছে।
প্রসঙ্গত পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে মুলাদীতে পেট্রোবাংলা ৪ হাজার ৭৩২ থেকে ৪ হাজার ৫৬৯ মিটার গভীরতায় দুটি কূপ খনন করে। তখন এখানে গ্যাস পাওয়া যায়নি। তবে ’৮১ সালের সর্বশেষ কূপ খননের প্রায় ৪৫ বছর পর সেখানে বাপেক্স নতুন করে সম্ভাবনা দেখছে।
নজর চরফ্যাশন এলাকার দিকে : ভোলার উপকূলীয় অঞ্চলের মধ্যে চরফ্যাশন, মনপুরা ও হাতিয়ায় গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হলেও এ এলাকায় থ্রিডি জরিপ করা হয়নি। ভোলা সদর থেকে চরফ্যাশনের সরলরেখায় দূরত্ব ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার। একইভাবে হাতিয়া ৪০ থেকে ৫০ এবং মনপুরা ৩৫ থেকে ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে। তবে সম্প্রতি এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বাপেক্স সূত্রে জানা গেছে, ‘থ্রিডি সিসমিক সার্ভে ওভার চরফ্যাশান’ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এ প্রকল্পে অর্থায়ন করার জন্য গত ১৮ মে অর্থ বিভাগ অনুমতি দিয়েছে। গত ২৪ মে পুনরায় ডিপিপি পেট্রোবাংলায় পাঠানো হয়েছে।
জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, একমাত্র ভোলা ছাড়া দেশের অন্য স্থলভাগে গ্যাস পাওয়ার খুব একটা সম্ভাবনা নেই। ভোলাতে আমরা ৯ টি কূপ করেছি, প্রত্যেকটিতেই গ্যাস পাওয়া গেছে। ভোলা এবং আশপাশের উপকূলীয় অঞ্চলে আরও গ্যাসের মজুদ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এজন্য চরফ্যাশানে থ্রিডি জরিপ করা হচ্ছে। আমরা মনে করছি, সেখানেও গ্যাস পাওয়া যেতে পারে।
ভোলায় খনন করা হবে আরও ১০ কূপ : ভোলায় প্রাথমিকভাবে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস মজুদ রয়েছে বলে প্রমাণিত। তবে বাপেক্স ধারণা করছে, নতুন কূপ খনন করলে এই মজুদের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। ভোলায় নতুন করে ১০টি কূপ খনন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ভোলা নর্থ-৫ মূল্যায়ন কূপ, ভোলা নর্থ-৬ অনুসন্ধান কূপ, ভোলা নর্থ-৭ অনুসন্ধান কূপ, শাহবাজপুর-৯ মূল্যায়ন কূপ ও শাহবাজপুর-১০ অনুসন্ধান কূপের এলাকা এবং সংযোগ সড়কের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি হুকুমদখলের প্রস্তাব জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠিয়েছে বাপেক্স। এর সঙ্গে আরও ৫টি কূপ খনন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি কূপ থেকে ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলে ভোলার এই ১০ কূপ থেকে দৈনিক ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে। আর ভোলায় এখনই অব্যবহৃত আরও ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে। ১০টি কূপ খনন শেষ করলে ভোলা থেকে দৈনিক ২৭০-২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে।
বাপেক্স সূত্র বলছে, গত ৫ মে পেট্রোবাংলার পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে বাপেক্সের নিজস্ব রিগ ও জনবল ব্যবহার করে কূপ খননের প্রস্তাবসংবলিত পুনর্গঠিত ডিপিপি প্রেরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাপেক্স যদি এ কাজে তাদের দুটি রিগও ব্যবহার করে, তাহলে বছরে ৪টির বেশি কূপ খনন করা সম্ভব হবে না। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেহেতু সংকট রয়েছে, তাই এখানে বাপেক্সের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিকে কাজ দেওয়া উচিত। প্রসঙ্গত, ভোলায় রাশিয়ান কোম্পানি গ্যাজপ্রম অধিকাংশ কূপ খনন করেছে।
ভোলায় নজর দেওয়া হয়নি : ১৯৯৫ সালে ভোলা শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে বাপেক্স। গ্যাসক্ষেত্রটি থেকে ১৪ বছর পর ২০০৯ সালে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। এরপর আবার ৯ বছর পর ২০১৮ সালে বাপেক্স ভোলা নর্থ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে। যদিও চাহিদা না থাকার কারণে প্রসেস প্ল্যান্ট প্রস্তুত করেনি বাপেক্স। তবে প্রসেস প্ল্যান্টের কাজ চলমান রয়েছে।
শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পরপরই বোঝা যায়, ভোলা অঞ্চলে গ্যাসের মজুদ রয়েছে। প্রথম আবিষ্কার ১৯৯৫ থেকে ২০২৬-এর মধ্যে ব্যবধান ৩১ বছর। এই সময়ে পূর্বাঞ্চল ও সিলেট ছাড়া দেশে অন্য এলাকায় ভূতাত্ত্বিক জরিপের ফল খুব একটা আশাব্যঞ্জক ছিল না। পেট্রোবাংলা নিশ্চিত ছিল, দেশে ভবিষ্যতে স্থলভাগে বড় কোনো গ্যাসের মজুদ পাওয়া যাবে না। এ জন্য ২০১২ সালের দিকে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এলএনজি আমদানি শুরু হয় ২০১৮ সাল থেকে। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন আশঙ্ক াজনকভাবে কমতে থাকে।
পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, ২০১৫ সালের দিকে দেশীয় উৎস থেকে অন্তত দৈনিক ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হতো। এখন সেই উৎপাদন ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে।
ভোলায় গ্যাস রয়েছে, বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরও জোরেশোরে কাজ শুরু করা হয়নি। বাপেক্সের কর্মকর্তারা বলছেন, এখন সংকটের সময় ভোলার নাম যেভাবে উচ্চারণ করা হচ্ছে, সেই উদ্যোগ পাঁচ বছর আগে থেকে নেওয়া হলে ভোলা থেকে অন্তত ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত। এই গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনা সম্ভব হলেই সংকট থাকত না।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া বলেন, শাহবাজপুরে মাটির নিচে একটি ভাঁজ পর্বত রয়েছে। এখান থেকে পূর্ব দিক পর্যন্ত মাটির ভূগঠন একই। শুধু ভোলা নয়, ভোলা থেকে নোয়াখালী হয়ে মহেশখালী পর্যন্ত এলাকায় একই ধরনের ভূগঠন রয়েছে। এই এলাকাকে গ্যাসের দ্বিতীয় হাব হিসেবে বিবেচনা করা যায়। যেখানে সরকারের আরও বেশি নজর দেওয়া উচিত।
সিএনজি-এলএনজি না পাইপলাইন : ভোলার গ্যাস দিয়ে বর্তমানে তেমন কিছু চলে না। এ গ্যাসের বড় গ্রাহকের মধ্যে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, তিনটি ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সাতটি শিল্পকারখানা রয়েছে। পাশাপাশি আছে আবাসিক গ্রাহক। এখন ভোলা-বরিশাল-খুলনা পাইপলাইন নির্মাণের পাশাপাশি ভোলার গ্যাস এলএনজি বা সিএনজি করে আনার চিন্তা করা হচ্ছে। কিন্তু এখনো এর কোনোটিরই পূর্ণা ঙ্গ সমীক্ষা হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোলার সঙ্গে পাইপলাইন নির্মাণ করলে ভোলা থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে হবে। আর সরবরাহ বাড়াতে হলে ভোলা গ্যাসক্ষেত্রের সঙ্গে মুলাদী-মেহেন্দীগঞ্জ ও চরফ্যাশনকে যুক্ত করতে হবে। না হলে ভোলা-বরিশাল গ্যাস পাইপলাইন অলস পড়ে থাকবে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দেশের একটি বেসরকারি কোম্পানিকে ভোলার গ্যাস সিএনজি করে আনার কাজ দিয়েছিল। তারা দৈনিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট সিএনজি করে এনে সরবরাহ করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট করেও গ্যাস আনতে পারেনি।
এলএনজি করে আনতে হলে একটি খনিতে যে পরিমাণ মজুদ থাকতে হয়, ভোলায় তা নেই। এরপরও এলএনজি করে আনতে হলে ভোলাতে এলএনজি করার অবকাঠামো বসাতে হবে। এ ছাড়া স্থলভাগের কাছে রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বসাতে হবে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
একমাত্র ভোলা থেকে পাইপলাইন নির্মাণ করে গ্যাস আনাকে উপযুক্ত মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পাইপলাইন নির্মাণ করতে হলেও ভোলার গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। জানতে চাইলে বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতিকুজ্জামান বলেন, ভোলার গ্যাস গ্রিডে আনতে হলে একটি পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা প্রয়োজন। এর আগে সিএনজি করে আনার সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। এখন পাইপলাইন ও এলএনজি করার কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায় আনা সম্ভব এবং এর জন্য কেবল পাইপলাইন নির্মাণ নয়, ভোলা গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কী পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে, তাও নিশ্চিত হতে হবে।