খাতা কড়াকড়ি নাকি খটকা অন্যখানে

সব মিলিয়ে এবারের এসএসসি ও সমমানের ফল গত উনিশ বছরে সর্বনিম্ন। শুধু খারাপ নয়, একদম ‘প্লট টুইস্ট’। এত দিন যে গল্পে পাসের হার আর জিপিএ-৫ ছিল সাফল্যের ব্যাজ, এবার সে গল্পে হঠাৎ ব্রেক। ‘ফেলুদা’ হয়তো বলতেন‘ব্যাপারটা মোটেও ভালো লাগছে না, তোপসে। কোথায় যেন একটা খটকা আছে’। ফল প্রকাশের পর বেশি শোনা গেল খাতা কড়াকড়ি করে দেখা হয়েছে। উদার নম্বর কমেছে, অভিন্ন প্রশ্নপত্র ও নজরদারি বেড়েছে। এসব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রহস্য শুধু পরীক্ষকের লাল কলমে বন্দি? কারণ খাতা দেখা হয় পরীক্ষা শেষে। কিন্তু ফল তৈরি শুরু অনেক আগে  শেখার অভ্যাস, মনোযোগ, পরিবার, শ্রেণিকক্ষ, সমাজ এবং যে যোগাযোগ-পরিবেশে প্রজন্ম বড় হয়, সেখানে। এবার খাতা থেকে চোখ তুলে অন্যদিকে দেখা দরকার। ফল বোঝার জন্য দেখতে হবে, পরীক্ষার্থীর চারপাশের যোগাযোগ-পরিবেশ। যোগাযোগবিদ্যার ভাষায় যাকে বলা হয় ‘মিডিয়া ইকোলজি’। মানুষ শুধু একটি মাধ্যম ব্যবহার করে না; বরং বিভিন্ন মাধ্যম মিলে যে পরিবেশ তৈরি করে, এর মধ্যে তার চিন্তা, অভ্যাস, মনোযোগ ও আচরণ গড়ে ওঠে। আজকের শিক্ষার্থীর পরিবেশ বই, খাতা, ব্ল্যাকবোর্ড ও শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়। সেখানে আছে ফেসবুক, ইউটিউব, রিল, শর্টস, মেসেঞ্জার, গেম, নোটিফিকেশন, অনলাইন ভিডিও এবং অনন্ত স্ক্রল। ফলে প্রশ্নটি শুধু ‘ওরা কত ঘণ্টা পড়েছে?’ এটুকু নয়। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ওরা কী ধরনের যোগাযোগ-সংস্কৃতির মধ্যে পড়াশোনা করতে শিখেছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ‘করোনা মহামারী’র সময় এড়ানো যাবে না।

এবার যারা এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে, করোনার শুরুতে এর বড় অংশ ছিল প্রাথমিকের শেষ বা মাধ্যমিকের শুরুতে। যে বয়সে শিক্ষক বলবেন, ‘খাতা বের করো’, সেই বয়সে বলা হয়েছে, ‘লিংকে ঢুকো’। যে বয়সে ক্লাসে মোবাইল আনা নিষেধ, সেই বয়সে মোবাইল হয়ে গেল শ্রেণিকক্ষ। স্কুল ও মাঠ বন্ধ, বন্ধু দূরে, শিক্ষক কম্পিউটারের পর্দায়। শিক্ষার্থীর সামনে পাঠ, গেম, শিক্ষক, ইউটিউব, হোমওয়ার্ক এবং নোটিফিকেশন। ফলে প্রথমবারের মতো প্রজন্মের বড় অংশের কাছে শিক্ষা আর বিনোদনের দরজা হয়ে গেল একই স্ক্রিন। সমস্যা হলো  স্কুল খুলেছে, কিন্তু স্ক্রিন বন্ধ হয়নি। বরং স্ক্রিন দ্রুত হয়েছে। কয়েক মিনিটের ভিডিও নেমে এসেছে কয়েক সেকেন্ডে। পোস্ট হয়েছে স্টোরি, স্টোরি হয়েছে রিল। যোগাযোগের গতি বেড়েছে, বার্তার দৈর্ঘ্য কমেছে, প্রতিক্রিয়া হয়েছে তাৎক্ষণিক। আর এখানেই সামনে আসে মনোযোগের অর্থনীতি। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দামি পণ্য ‘মনোযোগ’। কে কতক্ষণ স্ক্রিনে

থাকল, কোন ভিডিওতে থামল, কোনটি আঙুল চালিয়ে চলে গেল সব অ্যালগরিদম শিখে। তারপর সে এমন কনটেন্ট সামনে আনে, যা ব্যবহারকারীকে বেশি সময় আটকে রাখবে। ফলে গভীর মনোযোগ নয়, বরং নতুন উত্তেজনা অনেক ক্ষেত্রে ডিজিটাল অভিজ্ঞতার চালিকাশক্তি হয়। এই অভ্যাসের সঙ্গে পরীক্ষার হলের সংঘাত স্পষ্ট। ডিজিটাল জীবন শেখায় ভালো না লাগলে, সোয়াইপ বা সার্চ করো। প্রশ্নপত্র বলে ভালো না লাগলেও, উত্তর দাও। পরীক্ষার হল বলে ইন্টারনেট নেই, স্মৃতি খোঁজ। অনলাইন যোগাযোগ বলে, সংক্ষেপে বলো। মানবিক প্রশ্নপত্র বলে ব্যাখ্যা করো, যুক্তি সাজাও, কারণ বলো এবং উদাহরণ দাও। এই দুই জগতের দূরত্বই হয়তো অদৃশ্য শিক্ষাসংকট।  ‘মানবিক’ শুধু তথ্য মুখস্থের বিষয় নয়। ভাষা, সমাজ, ইতিহাস, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ও মানুষের আচরণ বুঝতে হলে পড়তে হয়, সম্পর্ক ধরতে হয়, কারণ ও ফল মেলাতে হয়। শেষে নিজের ভাষায় লিখে প্রকাশ করতে হয়। অর্থাৎ মানবিকের পরীক্ষা এক অর্থে, যোগাযোগ ক্ষমতার পরীক্ষা। যদি দীর্ঘ পাঠের অভ্যাস দুর্বল, বিশ্লেষণী লেখা কমে, যদি ধারাবাহিকভাবে তিন-চার পৃষ্ঠা যুক্তি গঠন করে লেখার অভ্যাস না থাকে, তবে মানবিকে তার অভিঘাত বেশি পড়বে কি না সে প্রশ্ন অমূলক নয়। বিজ্ঞানে ৮০ শতাংশের বেশি পাস আর মানবিকে ৫০ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ার ব্যবধান অন্তত প্রশ্নটি তোলার সুযোগ করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সীমিত কর্মস্মৃতির প্রশ্ন। মনোবিজ্ঞানের ‘মানসিক তথ্য-চাপ তত্ত্ব’ বলে, কর্মস্মৃতি একসঙ্গে সীমিত পরিমাণ তথ্য ধারণ করতে পারে। ক্রমাগত নোটিফিকেশন, অ্যাপ বদল, ভিডিও বদল ও একই সঙ্গে একাধিক কাজ করার অভ্যাস দীর্ঘ মনোযোগ ধরে রাখাকে কঠিন করতে পারে।

মোবাইল ব্যবহার করলে কেউ ফেল করবে এমন সরল সমীকরণ নেই। কিন্তু যে শিক্ষার্থী সারা দিন দ্রুত বদলে যাওয়া সংকেতের মধ্যে থাকে, তাকে যদি তিন ঘণ্টা প্রশ্নপত্রের সঙ্গে স্থির থাকার নিয়মিত অনুশীলন না করানো হলে অসুবিধা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এরপর আসে হাতে লেখা। এখন শিক্ষার্থীর আঙুল পর্দায় দ্রুত চলে। তারা টাইপ, ট্যাপ ও স্ক্রল করে। কিন্তু কলমে দীর্ঘ উত্তর লেখার অভ্যাস কি সমান গতিতে টিকে আছে? হাতে লেখা এবং টাইপ করা, মস্তিষ্কের এক ধরনের কাজ নয়। হাতে লিখতে হলে ‘শব্দ’ মনে করতে, ‘বাক্য’ গঠন করতে, ‘চোখ-হাত’র সমন্বয় রাখতে এবং একই সঙ্গে চিন্তার ধারাবাহিকতা থাকতে হয়। এই অনুশীলন কমে গেলে, তার প্রভাব দীর্ঘ লিখিত পরীক্ষায় পড়ছে কি না তা নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। এই প্রজন্মের কৈশোর কেটেছে অস্বাভাবিক সামাজিক ও রাজনৈতিক সময়ের মধ্যে। করোনা শেষ হওয়ার পর তারা যে দীর্ঘ স্থিতিশীল শিক্ষাজীবনে ফিরেছে এমন নয়। ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন, সংঘর্ষ, ইন্টারনেট বন্ধ, শিক্ষা কার্যক্রম বিঘ্ন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন সব মিলিয়ে সমাজে তৈরি হয়েছিল অস্থিরতা। একজন কিশোরের কাছে রাজনীতি তখন শুধু ‘টেলিভিশন সংবাদ’ ছিল না। সেটি ছিল ফেসবুক ফিড, বন্ধুর পোস্ট, এলাকার মিছিল, পরিবারের আলোচনা ও ভাইরাল ভিডিওতে। ফলে বইয়ের পাতার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছিল পুরো সমাজ। বই খুলেছে, বাইরে মিছিল। পরীক্ষা সামনে, ফিডে উত্তেজনা। ক্লাস হবে কি না, অনিশ্চয়তা। কখনো আন্দোলন, কখনো দাবি, কখনো শিক্ষা নীতির পরিবর্তন। প্রশ্ন উঠতে পারে এই শিক্ষার্থীরা কি সত্যিই নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগের পরিবেশ পেয়েছে? শুধু ইচ্ছাশক্তি নয় শান্ত পরিবার, নিয়মিত ক্লাস, স্থিতিশীল শিক্ষা ক্যালেন্ডার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ন্যূনতম নিশ্চয়তাই মনোযোগ তৈরির অবকাঠামো। ২০২৬ সালের ফলকে শুধু ‘খাতা কড়াকড়ির ফল’ বলে ব্যাখ্যা করা অসম্পূর্ণ মনে হয়। বিশেষ করে, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ফল বড় প্রশ্ন তুলেছে। ১৫ বছর ধরে যে বোর্ডের পাসের হার কখনো ৮০ শতাংশের নিচে নামেনি, এবার সেখানে পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ২২৬টি প্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি। আগের বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৮৬টি। অর্থাৎ এক বছরে শূন্য পাসের মাদ্রাসা বেড়েছে ১৪০টি। মাদ্রাসা বোর্ড কর্র্তৃপক্ষ, পরীক্ষাকেন্দ্র পরিবর্তনসহ বেশ কিছু প্রশাসনিক কারণের কথা বলেছে। সেগুলো বিশ্লেষণের দাবি রাখে। কিন্তু সেখানেও একই প্রশ্ন ফিরে আসে শিক্ষার্থীর দীর্ঘমেয়াদি শেখার পরিবেশ, ভাষাগত দক্ষতা, গণিতের ভিত্তি, লিখিত প্রকাশ ও নিয়মিত একাডেমিক অনুশীলন কতটা শক্ত ছিল? পাসের হার কমা মানে, শিক্ষার মান একদিনে ধসে পড়েছে এ কথা বলা যেমন তাড়াহুড়া, তেমনি ‘খাতা কড়াকড়ি করে দেখা হয়েছে’ বলে স্বস্তি পাওয়া বিপজ্জনক। যদি কড়াকড়ি মূল্যায়নই বাস্তব দক্ষতার দুর্বলতা প্রকাশ করে, তবে তা বড় সতর্কবার্তা। যদিও এই পতন ২০২৬ সালে শুরু হয়নি; ২০২৫ সালেও পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুটোই উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল। তখন ‘বিবিসি বাংলা’, ফল খারাপের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে শেখার ঘাটতি, মাঝপথে কারিকুলাম পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রশ্ন তুলেছিল। অর্থাৎ এবারের ফলকে শুধু ‘কড়াকড়ি করে খাতা দেখা’র ফল বললে আগের বছরের ধারাবাহিক অবনতি, অস্থির শিক্ষা-পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি শেখার সংকট এই ছবিটা আড়ালে থাকবে।  এবারের ফল আমাদের হয়তো সহজ কিন্তু অস্বস্তিকর সত্য মনে করিয়েছে। শিক্ষাসংকট সবসময় পরীক্ষার খাতায় শুরু হয় না। যথাসময়ে সেটি দৃশ্যমান হয়। এ প্রজন্ম অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে দ্রুত, দৃশ্যনির্ভর, অ্যালগরিদমিক ডিজিটাল সমাজ। অন্যদিকে ধীর, স্মৃতিনির্ভর, লিখিত অ্যানালগ পরীক্ষাব্যবস্থা। মাঝখানে একজন শিক্ষার্থী যার জীবনে স্কুল বন্ধ, স্ক্রিন বন্ধ হয়নি।  রাজনীতি ও যোগাযোগ বদলেছে । কিন্তু পরীক্ষার হলে থাকে কলম, প্রশ্নপত্র এবং সাদা খাতা। সেখানে সার্চবার, নোটিফিকেশন নেই। সবচেয়ে বড় কথা কোনো ‘স্কিপ’ অপশনও নেই।

লেখক : শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ডক্টোরাল স্কলার, স্কুল অব জার্নালিজম অ্যান্ড ম্যাস কমিউনিকেশন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

rajibnandy@cu.ac.bd