সংকটের ছায়া, বিভাজনের দৃশ্যমান রেখা

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৪ এএম

নেতাকর্মীর গায়ে হাত উঠলে লাশের বদলে লাশ, থানার ইট খুলে নেওয়ার হুমকি নারায়ণগঞ্জের একটি দলের নেতার এই হুমকি অশুভ বার্তা দেয় (প্রথম আলো অনলাইন, ২৯ সেপ্টেম্বর)। এর আগে আরেক নেতার হুমকি, তাদের দাবি মানলে আর ককটেল ফুটবে না বলে জানান। এর মধ্যে মিরপুরে রাড্ডা ক্লিনিকে ভাঙচুর করে কোটি টাকার অধিক ক্ষতিসাধন এবং এর পেছনে সরকারি দলের দায়িত্বশীল একজনের সম্পৃক্ততার কথা প্রচার হলেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে প্রত্যাহার করা হয়েছে শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে। একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের স্টুডিও রাতে হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পেছনেও সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের সম্পৃক্ততার কথা জানানো হলেও পুলিশ এটা নিয়ে কোনো কিনারা করতে পারছে না। রাতের আঁধার, কিংবা দিনের ফুটফুটে আলো এই সবকিছুকে ভেদ করে দিব্যি চলছে রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই। এসব কিছুর মধ্যে থেমে নেই সরকার ঘোষিত নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৎপরতাও। মাঝেমধ্যেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঝটিকা মিছিল এবং সেøাগানের মাধ্যমে তারাও তাদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে।

বর্তমান সরকারের কার্যকাল ৭ মাস অতিক্রান্ত হয়ে ৮ম মাসে পদার্পণ করেছে। দেশের সামগ্রিক ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অস্থির সময়। রাশিয়া-ইউক্রেন, হামাস-ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের জেরে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা হুমকির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন অর্থনৈতিক সংকট, যার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া। এই সময়ের মধ্যে দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে তার পেছনে সরকারের ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সংগত কারণেই যে বিষয়টি অধিক প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে তা হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকার কতটা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে পেরেছে এবং সক্রিয় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো কতটা সহযোগিতা করছে। একটা বিষয়ের অবতারণা জরুরি মনে করছি, আর তা হলো জনমুখী রাজনীতির বাইরে গিয়ে কেবল বিরোধিতার রাজনীতি প্রকারান্তরে সরকারকে যেমন উৎপীড়কে পরিণত করে, সরকারবিরোধীদেরও জনবিমুখ করে তুলে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতিত আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। অনেকে অবশ্য এর বিরোধিতা করে বলতে পারেন দিনশেষে বিরোধিতাই বিজয়ী হয়েছিল। হ্যাঁ, তবে এর জন্য অনেক সময় এবং মূল্য দিতে হয়েছে, এখনো হচ্ছে। একটি নির্বাচিত সরকার যখন ভোটের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করে, আইনগত, নীতিগত, পদ্ধতিগত এবং আদর্শগত দিক দিয়ে তার প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে আইনের শাসনকে সমুন্নত রেখে জনগণের আস্থার প্রতিদান দেওয়া। এক্ষেত্রে একটি রাজনৈতিক দল যখন সরকারে আসে তখন সরকার এবং সরকারি দলের মধ্যে সুস্পষ্ট দূরত্বই রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটাবে। দল যখন সরকারের ভেতর মিশে যাবে, তখন অভ্যন্তরীণ কোন্দল ভেদ করে আন্তঃদলীয় কোন্দল প্রকাশ্যে এসে একপর্যায়ে প্রকট আকার ধারণ করবে। সরকার যখন নিজের দলের লোকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হবে, নীতিগতভাবে ভিন্নমত পোষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে তখন সরকারের স্বেচ্ছাচারিতারই প্রকাশ ঘটবে। সরকারের ভেতর তার দলীয় আদর্শের বিলোপ ঘটতে থাকবে এবং পদ্ধতিগত জটিলতায় দিগ্ভ্রান্ত হতে থাকবে সরকার। এই সীমিত পরিসরের সময়কাল সরকারের মূল্যায়ন করার জন্য যথেষ্ট না হলেও সরকার সঠিক পথে রয়েছে কি না সেটা বুঝা খুব একটা কঠিন কাজ নয়।

বর্তমান সময়ের রাজনীতির চালচিত্র বিশ্লেষণ করলে আমরা যদি কেবল সরকারের বিরোধী কিছু রাজনৈতিক দলের নেতিবাচক দিকগুলোকেই বিবেচনা করতে যাই, তাহলে এর মধ্য দিয়ে সরকারদলীয় পরিচয়ে নানা ধরনের অব্যবস্থাপনার দিকগুলোকে আড়াল করা হবে। কার্যত নিজ দলীয় লোকদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে না পারার অসামর্থ্য বিরোধী দলগুলোকে তাদের নির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নে আরও প্রণোদনা জোগাচ্ছে। এই সুযোগে মূলধারার বিরোধী দলের বাইরে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এবং উগ্রবাদীদের তৎপরতাও বাড়ছে। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে পুঁজি করে মাজার, ভাস্কর্য এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোতে হামলা করা, ইতিহাসের নিষ্পত্তিকৃত বিষয়গুলোকে বারবার সামনে নিয়ে এসে নতুন বিতর্কের জন্ম দেওয়া, নারী ফুটবলের বিরোধিতা করা, বাংলার চিরায়ত সাংস্কৃতিক কর্মকা- কিংবা সাংস্কৃতিক শিক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া– এসব কিছু দেশের, সমাজের এবং মানুষের মৌলিক মূল্যবোধে আঘাত করছে প্রতিনিয়ত। এর থেকে উত্তরণ ঘটাতে দৃশ্যমাণ প্রচেষ্টা লক্ষণীয় হচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত অনেকগুলো কমিশনের মধ্যে বহুল আলোচিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রতিবেদনে অনেক বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত না হলেও যে বিষয়গুলো নিয়ে ঐকমত্য হয়েছিল, সে সবের বেশ কিছু জায়গায় সরকার এবং বিরোধীদের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে সংসদ কর্র্তৃক গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিটিতে জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি তাদের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি বর্জন করেছে। এ অবস্থায় কার্যত সরকার ও দলীয় এমপিদের নিয়েই এ লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে কমিটি। সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে এ নিয়ে প্রতিবেদন এবং সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি যদি কার্যকর করা হয়, বর্তমান বিদ্যমান বাস্তবতায় স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে বিষয়টি সর্বসম্মত হবে না এবং সংসদ থেকে শুরু করে রাজপথ আবার নতুন এই ইস্যু নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠবে।

একটি নির্বাচিত সরকার গঠনের মাত্র ৮ মাসের মাথায় যদি আওয়ামী লীগ ব্যতীত অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোর (যারা আওয়ামী লীগের পতনে মূল ভূমিকা রেখেছিল) মধ্যে বিবাদ আরও ব্যাপকতা লাভ করে, সংগত কারণেই মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেবে, একটি স্বেচ্ছাচারী সরকারের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশে বাস্তবে কী ধরনের গুণগত পরিবর্তন ঘটেছে। মানুষ আসলে কোন বিষয়গুলো নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিল, তা যদি অল্প কথায় মূল্যায়ন করতে যাই, তাহলে দেখব এর মূলে ছিল সর্বগ্রাসী দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, সর্বস্তরে দলীয়করণ, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, এবং নির্বাচনীব্যবস্থাকে ধ্বংস করা ইত্যাদি। বিগত জাতীয় নির্বাচনের পর বর্তমান সরকারের সময়ে এখন পর্যন্ত কোনো নির্বাচন না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে মূল্যায়ন করা না গেলেও অপরাপর কোন জায়গাগুলোতে বিগত সময়ের তুলনায় গণগত পরিবর্তন ঘটেছে, বিষয়টি প্রশ্নের জন্ম দেয়। এ কথা যেমন ঠিক যে পরিবর্তন একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং এর কাক্সিক্ষত ফল রাতারাতি পাওয়া সম্ভব নয়, একইভাবে এটাও ঠিক যে আমরা আসলে পরিবর্তনের পথে অগ্রসর হচ্ছি কি না– এটাও উপলব্ধি করা জরুরি। মনে রাখতে হবে, যে জনগণের কাক্সিক্ষত পরিবর্তন সাধিত না হলে রাজনৈতিক ভুলের খেসারত দিতে হয় রাজনৈতিক দলগুলোকেই, যার নজির আমাদের দেশে তো বটেই, আন্তর্জাতিক পরিম-লেও নেহাত কম নয়।

সম্প্রতি সংগঠিত নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকা-ের জন্য সরকারি দলকে যেমন সমালোচিত হতে হচ্ছে, সমভাবে সমালোচিত হচ্ছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও। একটি সাধারণ নির্বাচনোত্তর সময়ে সবার এটাই প্রত্যাশা ছিল যে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যারা মব সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে এবং এগুলো বন্ধ হবে। আমরা বাস্তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে এবং এর সঙ্গে জড়িত, যারা আইনের আওতায় রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে যে মাত্রায় আইনকে সক্রিয় হতে দেখছি, সর্বক্ষেত্রে এর প্রয়োগ দেখলে আইনের শাসনের প্রতি সরকারের প্রতিশ্রুতির বিষয়ে জনগণ আশ্বস্ত হতে পারত। আইনের শাসন সরকারের কোনো ইচ্ছার বিষয় নয়, এটা দায়বদ্ধতা। অপরাধের বিচার না করলে তা কীভাবে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে উঠতে পারে এর উদাহরণ আমরা দেখেছি। পুরনো অবস্থায় ফিরে যাওয়ার জন্য দেশের মানুষ রাজপথে নামেনি। আমাদের মনে রাখতে হবে যে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের সর্বব্যাপী অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের জনতার সর্বাত্মক প্রতিরোধ। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল এই জুলাই চেতনাকে নিয়ে তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে চরিতার্থ করার চেষ্টা করলে সুফল বয়ে আনবে না।

দেশ ভালোভাবে চলছে না। অর্থনৈতিকভাবে মানুষ যেমন দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সময় পার করছেন, এর পেছনে বহুলাংশে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা রয়েছে তা জানা সত্ত্বেও যখন এটা স্পষ্ট হতে থাকবে যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জনস্বার্থ এবং জননিরাপত্তা নিয়ে মতভিন্নতা কেবল আদর্শগত কারণে নয়, ক্ষমতা ধরে রাখা কিংবা ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ, তাহলে এর ফলাফল কারও জন্যই শুভ হবে না। দেশে উগ্রবাদের উত্থানের বহু বেদনাদায়ক নজির আমাদের সামনে আছে, এর যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে। সময় থাকতে তাই সময়ের সদ্ব্যবহার করাই শ্রেয়।

লেখক : রাজনীতি ও কূটনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত