প্রতিবন্ধীর প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

শারীরিকভাবে অক্ষম মানুষদের প্রতি অবহেলা ইসলামের শিক্ষা নয়। আমাদের চারপাশে নানা ধরনের অক্ষম রয়েছেন। কারও চোখে আলো নেই। কারও চলার শক্তি নেই। কেউ কথা বলতে পারেন না। আবার কেউ জন্মগত কিংবা দুর্ঘটনাজনিত সীমাবদ্ধতা নিয়ে জীবন কাটান। কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতা মানুষের মর্যাদা কমায় না। ইসলাম মানুষকে তার শারীরিক সক্ষমতা দিয়ে বিচার করে না। বরং ইমান, তাকওয়া ও আমলের ভিত্তিতে তার মর্যাদা নির্ধারণ করে। অক্ষম মানুষের প্রতি দয়া দেখানো, সম্মান করা, অধিকার নিশ্চিত করা এবং সমাজের সক্রিয় অংশ হিসেবে গ্রহণ করাও ইসলামের শিক্ষা। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-এর ঘটনা এই মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

তিনি ছিলেন দৃষ্টিহীন। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে ইসলাম সম্পর্কে জানতে চাইতেন এবং কোরআনের শিক্ষা গ্রহণ করতে চাইতেন। একদিন তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, আল্লাহ আপনাকে যে জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন, তা আমাকে শেখান।

তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কার কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলছিলেন। তাদের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। তাই আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-এর প্রশ্নে তখন তার মনোযোগ কিছুটা অন্যদিকে চলে যায়। তিনি একটু বিরক্তি বোধ করেন।

এরপর কোরআনের আয়াত নাজিল হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সে ভ্রু কুঁচকাল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল। কারণ তার কাছে অন্ধ ব্যক্তি এসেছিল।’ (সুরা আবাসা ১-২)

এরপর বলেন, ‘আপনি কী জানেন, হয়তো সে পরিশুদ্ধ হবে। অথবা সে উপদেশ গ্রহণ করবে, ফলে উপদেশ তার উপকারে আসবে।’ (সুরা আবাসা ৩-৪)

আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.) ছিলেন জ্ঞানপিপাসু মানুষ। দৃষ্টিশক্তি না থাকার বিষয়টি তাকে কোরআন শেখা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তিনি নিজের সীমাবদ্ধতাকে অজুহাত বানাননি। বরং জ্ঞান অর্জনের জন্য নিজেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে ছুটে গেছেন। এ ঘটনা মুসলিমদের জন্য বড় শিক্ষা। জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে শারীরিক, সামাজিক কিংবা আর্থিক সীমাবদ্ধতা মানুষকে থামিয়ে দিতে পারে না।

ইসলাম মানুষের মর্যাদা নির্ধারণে সম্পদ, বংশ কিংবা সামাজিক অবস্থানকে মূল মাপকাঠি বানায়নি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সে, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।’ (সুরা হুজুরাত ১৩)

শারীরিক সীমাবদ্ধতা মানুষের সম্মান কমায় না। একজন দৃষ্টিহীন মানুষও জ্ঞানী হতে পারেন। একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষও সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-এর জীবন তার উজ্জ্বল উদাহরণ। তার মর্যাদা শুধু জ্ঞান অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও দিয়েছেন। তিনি বিলাল (রা.)-এর সঙ্গে মদিনায় আজান দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন কোনো অভিযানে মদিনার বাইরে যেতেন, তখন তিনি মদিনায় তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং মসজিদে নববীতে ইমামতি করেছেন।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামি গবেষক