হঠাৎ কেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল নন্দকুঁজা নদী?

বর্ষার পানিতে নন্দকুঁজা নদী এখন ভরা। তবে নদীর বুকজুড়ে পানির চেয়ে বেশি চোখে পড়ছে কচুরিপানার বিস্তৃত সবুজ স্তর। বিভিন্ন স্থানে এত ঘনভাবে কচুরিপানা জমেছে যে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে নৌ চলাচল, কমেছে মাছ ধরার সুযোগ। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নদীর জলজ পরিবেশ। দীর্ঘদিন ধরে কার্যকরভাবে কচুরিপানা অপসারণ না হওয়ায় নদীপারের মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে।

নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর থেকে বড়াইগ্রাম উপজেলার আহম্মেদপুর সেতু পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় নন্দকুঁজা নদীর বড় একটি অংশ কচুরিপানায় ঢেকে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, কয়েক মাস ধরে পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। নদীর বিভিন্ন জায়গায় কচুরিপানা জমে পুরু স্তর তৈরি হওয়ায় নৌকা চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।

একসময় নন্দকুঁজা ছিল স্থানীয় মানুষের জীবন ও জীবিকার অন্যতম ভরসা। নদীপথে পণ্য পরিবহন, মাছ ধরা এবং কৃষিকাজে নদীর পানি ব্যবহারের প্রচলন ছিল। এখন অনেক এলাকায় নৌযান চলাচল প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। কচুরিপানার স্তর পেরিয়ে ছোট নৌকাও সহজে চলতে পারছে না।

নদীপারের মানুষের অভিযোগ, নিয়মিত পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই পরিস্থিতি এতটা গুরুতর হয়েছে। উজান থেকে ভেসে আসা কচুরিপানা বিভিন্ন স্থানে আটকে গিয়ে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে কয়েকটি এলাকায় হাটবাজারের বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ আরও নষ্ট হচ্ছে।

স্থানীয় জেলেরা জানান, কচুরিপানা ছড়িয়ে পড়ায় মাছ ধরার জায়গা কমে গেছে। জাল ফেলতে গেলেই কচুরিপানায় তা আটকে যাচ্ছে। ফলে আগের তুলনায় সময় ও শ্রম বেশি লাগলেও মাছ মিলছে কম।

গুরুদাসপুর পরিবেশ আন্দোলন কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, নদী কেবল পানির প্রবাহ নয়, এটি একটি জীবন্ত পরিবেশব্যবস্থা। কচুরিপানার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার নৌ চলাচলের পাশাপাশি জলজ প্রাণী ও নদীর সামগ্রিক পরিবেশেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে নদী পুনরুদ্ধারের কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রতন কুমার সাহা বলেন, দীর্ঘদিন কচুরিপানা জমে পচে গেলে পানির গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে দেশীয় মাছের প্রজনন ও স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হতে পারে। পরিস্থিতি বিবেচনায় কচুরিপানা অপসারণে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

স্থানীয়দের দাবি, একবার কচুরিপানা পরিষ্কার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় স্থানে খনন করতে হবে। একই সঙ্গে নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধে কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে।

নন্দকুঁজা এখনও প্রবাহমান, কিন্তু তার স্বাভাবিক ছন্দ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। যে নদীতে একসময় নৌকার বৈঠার শব্দ আর জেলেদের কর্মচাঞ্চল্য ছিল, সেখানে এখন বড় অংশজুড়ে কচুরিপানার স্তব্ধতা। সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এই নীরবতাই একসময় নদীটির অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।