তৃণমূল থেকে শিখরে উঠে এসেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছাত্র জীবনে ছিলেন ছাত্র নেতা, কর্মজীবনে ছিলেন শিক্ষক এবং রাজনৈতিক জীবনে হয়েছেন রাজনীতিবিদ।
তার রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা একটু ব্যতিক্রম। শিক্ষকতার পেশায় কম সময় কাটিয়ে রাজনীতির জীবনে পর্দাপন, কর্মী থেকে নেতা, নেতা থেকে পৌর সভার চেয়ারম্যান, সেখান থেকে সংসদ সদস্য-মন্ত্রী এবং অতপর আজকে দেশের রাষ্ট্রপতি আসনে বসতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোয়নপত্র জমা দেয়া হয়েছে বিএনপির নেতারা।
একজন ‘সজ্জন রাজনীতিবিদ’ হিসেবে সর্বমহলে গ্রহনযোগ্যতার পাওয়া ব্যক্তিত্ব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বিএনপির এই মনোনয়ন উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে।
২৩তম রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বর্ণাঢ্য তার জীবন ইতিহাস। শিক্ষাগতার পেশা থেকে কর্ম জীবনের একটি পর্যায় সরকারি চাকুরি ছেড়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমদগীর বেছে নেন সাধারণ মানুষের সাথে বসবাসের এক সাধারণ জীবন।
প্রাইমারি থেকে কৃতি ছাত্র ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঠাকুরগাঁও প্রাইমারী ও মাধ্যমিক শিক্ষা এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন মির্জা ফখরুল। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন।
ছাত্র জীবনে পড়ালেখার পাশপাশি রাজনীতির পাঠশালায় ভর্তির মির্জা ফখরুল। মেধাবী ছাত্র হয়ে ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেনও তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জীবনে পড়ালেখার পাশাপাশি বাম রাজনীতির সাখে যুক্ত হন মির্জা ফখরুল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন শাখার সভাপতি ছিলেন তিনি। ছিলেন এসএম হল শাখার নির্বিাচিত সাধারণ সম্পাদকও। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।
ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন মির্জা ফখরুল। সেখান থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
শিক্ষাজীবন শেষ করে শিক্ষাকতায় যোগ দিয়েছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কর্মজীবন ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন তিনি। এরপর ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকুরি ছেড়ে পুরোদমে রাজনীতিতে নামেন তিনি। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে জিতে হন চেয়ারম্যান।
মির্জা ফখরুলের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায়। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন এবং মাতা মির্জা ফাতেমা আমিন। বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন আইনজীবী। তিনি দুইবার পাকিস্তান প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে সদস্য ছিলেন এবং এরশাদ সরকারের মন্ত্রী সভার সদস্য ছিলেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছাত্র জীবন থেকেই। ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন, ছাত্র নেতৃত্ব দিয়েছেন সেই পথ ধরে তার জাতীয় রাজনীতিতে হাতেখড়ি আবদুল হামিদ খান ভাসানীর দল ন্যাপে। সেখান থেকে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি এবং পরে তাঁর বিএনপিতে যোগদান।
১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব ছিলেন মির্জা ফখরুল। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি, পরে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব পদে উঠে আসেন তিনি।
২০১১ সাল থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল। এরপর ২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে দলটির মহাসচিব নির্বাচিত হন তিনি। সেই থেকে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি।
বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে আসার আগে মির্জা ফখরুল দলটির কৃষক সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি এবং পরে সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন দীর্ঘদিন।
রাজনীতির মাঠের মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ যাত্রা পথ ছিলো কন্টকাকীর্ণ। বিশেষ করে এক-এগারোর পট পরিবর্তন থেকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের সময়টাতে দমন-পীড়ন, নির্যাতনে বার বার বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল বিএনপি।
স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের শাসনের সময় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ২০১৮ সাল থেকে প্রায় দুই বছর কারাগারে ছিলেন। এরপর অসুস্থতার কারণে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালে লন্ডন যান, সেখান থেকেই দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে দেশে থেকে বিএনপির চেয়ারপারসন এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তাকে তিন দফা কারাগারেও যেতে হয়েছে।
দলের শীর্ষ দুই নেতার অনুপস্থিতিতে লম্বা সময় ধরে বিএনপির সংকটে এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে দেশের ভেতরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছিলেন দৃশ্যমান মূল নেতৃত্বে।
২০০১ সালে খালেদা জিয়া সরকারে কৃষি এবং বেসরকারি বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তারেক রহমানের সরকারের তিনি স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন।
এয়োদশ জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাশের আসনটিতে মির্জা ফখরুলের আসন।
বিএনপি প্রবীন নেতারা মনে করেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির দুর্দিনে যেভাবে দলকে আগলিয়ে রেখেছেন, দলের পতাকাকে উড্ডীন রেখেছেন তাদের সন্মান দেয়া উচিত। এই আসনে ভিন্ন কোনো চিন্তার অবকাশ নেই বলে আমি মনে করেন।
২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁও-১ আসনে থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ এবং বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হলেও বগুড়া-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে সারা দেশে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে বিএনপি মহাসচিব সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেননি। যা সংসদীয় ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
ব্যক্তিজীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার সহধর্মিনী রাহাত আরা বেগম ও দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ মির্জা ও মির্জা সাফারুহ নিয়ে সংসার।
বড়মেয়ে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সিডনিতে পোস্ট ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত আছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকার একটি ইংরেজী স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।