মানবিকে সমস্যা শুধু শিক্ষার্থীর নয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ভর্তিতে কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটে পাস করেছেন ৭ দশমিক ২৯ শতাংশ পরীক্ষার্থী। অর্থাৎ মানবিক বিভাগ থেকে পাস করা ১০০ পরীক্ষার্থী দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাবির ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে সাতজনের একটু বেশি। এই ফল চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার চিত্র। কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, সবশেষ প্রকাশিত এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলেও মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের বেহাল স্পষ্ট।

ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবার ৯টি সাধারণ বোর্ডের অধীনে মানবিক বিভাগ থেকে ৬ লাখ ১৭ হাজার ৮৮৫ পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছে তিন লাখ এক হাজার ১৭৪ জন, গড় পাসের হার ৪৮.৭৪। একই সময়ে বিজ্ঞানে ৮০.৬৪, ব্যবসায় ৬৪.২৯ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। মানবিকের ফল বিপর্যয় সামগ্রিক পাসের হার কমিয়ে দিয়েছে। এবার মানবিক থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৩৬০ জন, শতাংশের হিসাবে ০.৫৪ জন। অর্থাৎ মানবিক থেকে প্রতি ১০০ জনে ১ জনেরও কম পরীক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। মানবিক থেকে জিপিএ-৪ পেয়েছে ৬.৪৬, জিপিএ ৩.৫০ বা তার কম পেয়েছে ৩০.৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। এই পরিসংখ্যানেও বোঝা যাচ্ছে কেবল পাসের হারই নয়, মানবিক থেকে যেসব শিক্ষার্থী পাস করেছে, তাদের জিপিএর অবস্থানও শোচনীয় ছিল।

জানা যায়, মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা হলো ইংরেজি ও গণিত। এ দুই আবশ্যিক বিষয়ে তুলনামূলক বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ায় সামগ্রিক ফলেও তার বড় প্রভাব পড়েছে। ফলে মানবিকে ৯টি বোর্ডের মধ্যে দিনাজপুর ছাড়া সব বোর্ডে ইংরেজিতে সর্বনিম্ন শিক্ষার্থী পাস করেছে, এর মধ্যে দিনাজপুরে আবার গণিতে সর্বনিম্ন শিক্ষার্থী পাস করেছে। ইংরেজির পর সব বোর্ড মিলিয়ে ২য় সর্বনিম্ন পাস করেছে গণিতে। কেবল ইংরেজি ও গণিতে পাসের হার বাড়লে সামগ্রিক পাসের হারও অনেক বেড়ে যেত। ২০২৫ সালেও মানবিকে দুর্বল ফলের সঙ্গে ইংরেজি-গণিতে খারাপ ফলের বিষয়টি উঠে এসেছিল।

দীর্ঘ ৩০ বছর শিক্ষকতা শেষে সম্প্রতি অবসরে গেছেন শিক্ষক মশহুদ আহমেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে এবারের ফল বিপর্যয় নিয়ে বলেন, এর পেছনে অনেক কারণ আছে। এই পরীক্ষার্থীরা ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েই কোভিডের কবলে পড়েছিল। অটোপাসে তারা সপ্তম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়, এরপর ৭ম ও ৮ম শ্রেণিতে অনলাইনে ক্লাস করে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে উত্তীর্ণ হয়। এমনকি ৮ম শ্রেণির জেএসসি পরীক্ষাও বাতিল হয়। ফলে তারা এবারই প্রথম পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিল। আবার এ শিক্ষার্থীরা ৯ম শ্রেণিতে উঠে পেল নতুন কারিকুলাম। এরপর জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলো। সবচেয়ে বিপদের কথা এরা দশম শ্রেণিতে ওঠার পর জানতে পারল পরিমার্জিত পূর্বের কারিকুলামে তাদের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। সার্বিকভাবে খাতা মূল্যায়নে কড়াকড়ি তো ছিলই।

শিক্ষাবিদদের মতে, মানবিক বিভাগকে অনেক শিক্ষার্থী এখনো তুলনামূলক কম মেধাবীদের বিভাগ হিসেবে দেখে। ফলে গণিত বা বিজ্ঞানে দুর্বলতা আছে তাদেরই একটি অংশ মানবিক বিভাগ বেছে নেয়। কিন্তু মানবিকে ভালো করতে হলে ভাষাগত দক্ষতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, তথ্য মনে রাখা এবং দীর্ঘ উত্তর লেখার সক্ষমতা প্রয়োজন। এগুলোতে ঘাটতি থাকলে বিভাগ পরিবর্তন করলেও ফল ভালো হওয়ার নিশ্চয়তা থাকে না। পরীক্ষার কাঠামোও মানবিকের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। একই সময়ে বিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে যেখানে তুলনামূলক কমসংখ্যক প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়, সেখানে মানবিকের শিক্ষার্থীদের বেশি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। আবার মানবিকের ইতিহাস, ভূগোল, পৌরনীতি বা অর্থনীতির মতো বিষয়ে উত্তর দিতে গিয়ে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করতে হয় এবং লিখতে হয় বেশি। ফলে নির্ধারিত সময়ে সব প্রশ্নের উত্তর শেষ করা অনেক শিক্ষার্থীর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মানবিকের অনেক শিক্ষার্থী উত্তর জানলেও সময়ের অভাবে পুরোটা লিখতে পারে না। এতে জানা বিষয়েও পূর্ণ নম্বর পাওয়ার সুযোগ কমে যায়। এ ছাড়া মানবিকের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে ইংরেজি ও গণিত আতঙ্কে ভুগছে। তারা মনে করে নিয়মিত ক্লাস না করলেও পাস করা যায়। নবম শ্রেণিতে বিভাগ পরিবর্তনের পর অনেক শিক্ষার্থী গণিত ও ইংরেজির বাড়তি অনুশীলন করে না। সার্বিক দিক থেকে মানবিকে ফল খারাপ হচ্ছে।

এই শিক্ষকরা মনে করেন, মানবিকের ফল বিপর্যয়ের আরেকটি বড় কারণ গ্রাম ও শহরের শিক্ষার বৈষম্য। মানবিকে গ্রামের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক বেশি। কিন্তু অনেক গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক, নিয়মিত পাঠদান, অতিরিক্ত ক্লাস, শিক্ষাসামগ্রী ও ইংরেজি-গণিতের বিশেষ সহায়তার ঘাটতি রয়েছে। ফলে একই পাঠ্যক্রম ও একই পরীক্ষায় অংশ নিলেও গ্রামের শিক্ষার্থীরা শহরের শিক্ষার্থীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবিকের ফল বিপর্যয়কে শুধু শিক্ষার্থীদের মেধার সঙ্গে যুক্ত করে দেখলে প্রকৃত সমস্যা আড়ালে থেকে যাবে। বিভাগ নির্বাচন, শিক্ষকের মান, ইংরেজি ও গণিতের ভিত্তি, প্রশ্নের কাঠামো, উত্তর লেখার দক্ষতা এবং শহর-গ্রামের শিক্ষার বৈষম্যও বিবেচনায় নিতে হবে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের সমাজে দীর্ঘদিনের প্রথা পরিবারের সবচেয়ে মেধাবী সন্তান বিজ্ঞানে পড়বে, কম মেধাবী ব্যবসায় শিক্ষা এবং একদম দুর্বল সন্তানটি মানবিকে পড়বে। আবার সচ্ছল অভিভাবকরা সন্তানকে বিজ্ঞানে পড়ান ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী বানানোর জন্য। ফলে সন্তানের পড়াশোনার পেছনে তারা বেশি খরচ করেন, আর মানবিকে তুলনামূলক অসচ্ছল ও গ্রামের ছেলেমেয়েরা বেশি পড়ে। গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভালো শিক্ষার্থীদের আবার শিক্ষকরা বিজ্ঞানে নিয়ে যান।

শিক্ষক সংকটও বড় কারণ : মাধ্যমিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকটের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি, গণিতসহ বিভিন্ন বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। কোথাও একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণি সামলাতে হচ্ছে, কোথাও আবার শূন্যপদ পূরণ না হওয়ায় নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। চট্টগ্রাম আঞ্চলিক শিক্ষা অধিদপ্তর জানিয়েছে, এই বোর্ডের অধীনে ৮৮টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের পদ রয়েছে দুই হাজার ১৬৫টি। এর মধ্যে ৬৮১টিই শূন্য। আবার ৪৪টি বিদ্যালয় চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই। দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ না হওয়ায় এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা, যা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যেও হতাশা বিরাজ করছে।

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, দেশের এমপিওভুক্ত স্কুল ও কলেজে শিক্ষকের শূন্যপদ ৬০ হাজার ২৯৫টি। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধানের ১১ হাজার ১৫১টি শূন্যপদ পূরণে আবেদন নেওয়া হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর তথ্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে, দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ কতটা জরুরি। এদিকে মাধ্যমিকে ইংরেজি ও গণিতে খারাপ ফলের অন্যতম প্রধান কারণ বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকসংকট। বাংলাদেশ শিক্ষা-তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যানুযায়ী, দেশে মাধ্যমিক স্কুলগুলোয় মোট গণিত শিক্ষকের সংখ্যা ৬৪ হাজার ১৪৭। আবার স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী আছেন মাত্র ১৩ দশমিক ২২ শতাংশ। অর্থাৎ গণিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ছাড়াই শিক্ষার্থীদের বিষয়টি শেখাচ্ছেন ৮৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ শিক্ষক।

শহর-গ্রামের ব্যবধান : ফলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষার সুযোগের বৈষম্য। শহরের শিক্ষার্থীরা যেখানে কোচিং, প্রাইভেট টিউশন, ইন্টারনেট ও বিভিন্ন শিক্ষাসামগ্রীর সুবিধা পাচ্ছে, প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের বড় অংশ সেখানে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের ওপরই নির্ভরশীল। বিশেষ করে চর, হাওর, উপকূল ও দুর্গম এলাকার প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট থাকলে শিক্ষার্থীদের বিকল্প সহায়তার সুযোগও কম। আবার এসব এলাকার বেশিরভাগ শিক্ষার্থী মানবিকে পড়াশোনা করেন। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অঞ্চলভেদে ফলের বড় পার্থক্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের সামগ্রিক বিশ্লেষণ আটকে আছে পাস-ফেলের হিসাব-নিকাশে। ফল বের হওয়ার কিছু দিন আমরা এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকি, তারপর ভুলে যাই। অথচ শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষার জন্য মানসম্মত শিক্ষক ও শিক্ষা উপকরণ দিতে হবে। কেবল শহর নয়, দেশের সব  অঞ্চলকে বিবেচনায় নিয়ে রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে।