সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রপতি পদে দলের প্রার্থী হিসেবে দুর্দিনের কাণ্ডারি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বেছে নিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কক্ষে গতকাল দুপুরে জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের শুরুতে তারেক রহমান তার সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন। এরপর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে শুভেচ্ছা জানান।
রাতে মির্জা ফখরুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের চেয়ারম্যান আমাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দিয়েছেন। এ কারণে আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। অতীতে যেভাবে দায়িত্ব পালন করেছি, রাষ্ট্রপতি হিসেবেও সেভাবে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করব।’
বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির এক যুগ্ম মহাসচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থায়ী কমিটির সদস্য, যুগ্ম মহাসচিব, চিফ হুইপ, হুইপসহ নেতাদের উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আগের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের দায়িত্ব আমার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমি দলের নেতাদের পাশাপাশি শুভাকাক্সক্ষীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে দলের মহাসচিবকে এই পদে মনোনয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে ঘোষণা আসার পর উপস্থিত সবাই করতালি দিয়ে মির্জা ফখরুলকে অভিনন্দন জানান।’
বৈঠক চলার মধ্যে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিএনপির পক্ষ থেকে আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, রাষ্ট্রপতি পদে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।’
মির্জা ফখরুলকে প্রার্থী ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিএনপির মহাসচিব পদ এবং জাতীয় স্থায়ী কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন বলেও জানান রুহুল কবির রিজভী। মহাসচিবের শূন্য পদে কে আসছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমাদের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীকে দায়িত্ব দেওয়া আছে। তিনি তার মতামত জানাবেন। সেটি আপনারা পরে জানতে পারবেন। এখন শুধু রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী করার কথা আমরা জানালাম।’ স্থায়ী কমিটির এই বৈঠকে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিব, চিফ হুইপ ও হুইপরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানান, দুপুর সাড়ে ১২টায় সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের শুরুতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ঘোষণা করেন চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তখনই বিএনপি মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির পদ থেকে সরে দাঁড়ান মির্জা ফখরুল।
এর পরপরই নির্বাচন কমিশনে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রার্থিতার মনোনয়নপত্র জমা দেয় বিএনপি। দুুপুর ২টা ২৩ মিনিটে মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনী কর্মকর্তা সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিন। ফলে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিনিধিত্বকারী ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন। এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতার অপেক্ষা।
এর আগে মনোনয়নপত্র নিয়ে নির্বাচন ভবনে আসে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা আবদুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল, মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, আখতারুজ্জামান মিয়া ও এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান, দলের যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী ও হাবিব উন নবী খান সোহেলসহ প্রতিনিধি দল। মনোনয়নপত্র গ্রহণের সময় সিইসির সঙ্গে ইসি সচিব আখতার আহমেদও উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপির পক্ষ থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছিল, তবে জমা দেওয়া হয়েছে একটি। মির্জা ফখরুলের মনোনয়পত্রের প্রস্তাবক ও সমর্থক হলেন আবদুল মঈন খান ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর সংসদের সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘দলীয় জোট থেকে মনোনীত হয়েছেন আমাদের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমরা ২০ আগস্ট নির্বাচিত করতে চাই।’
সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে জানিয়ে চিফ হুইপ বলেন, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদ সদস্যরা ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করবেন।’ তিনি বলেন, ‘১১ দলীয় জোট থেকে কর্নেল অলি আহমদও রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়ন পেয়েছেন। তার পক্ষ থেকে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। ফলে ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রতিদ্বন্ধিতাপূর্ণ হবে।’
দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গুরুতর অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গেল গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এ সময় স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনে ভোট করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিন গত ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। গতকাল সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা মনোনয়নপত্র জমা নেওয়া হয়। রবিবার হবে যাচাই-বাছাই, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের তারিখ ১৮ অগাস্ট। এরপর ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সংসদে ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে। আর প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাতে ‘নির্বাচনি কর্তা’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্যকে প্রস্তাবক এবং আরেকজনকে সমর্থক হতে হয়। মনোনয়নপত্রে প্রার্থীর নিজেরও সম্মতিসূচক স্বাক্ষর থাকতে হয়। বাছাইয়ে বৈধ প্রার্থী একজন হলে নির্বাচন কমিশন তাকেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করবে। তবে একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে তাদের মধ্যে ভোটের বিধান রয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী থাকায় ভোট হয়েছিল। এরপর প্রতিবারই ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন।
এবার বিএনপি প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এলডিপি প্রেসিডেন্ট অলি আহমদের মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে বিরোধী জামায়াত জোট। সংসদে এবার ভোটার ৩৪৯ জন। এর মধ্যে সংরক্ষিত আসন মিলিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য ২৪৭ জন, জামায়াতের ৭৭ জন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র আটজন, এনসিপির আট জন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের তিনজন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন, বিজেপির একজন, গণসংহতি আন্দোলনের একজন, গণপরিষদের এক জন, খেলাফত মজলিসের এক জন এবং জাগপার একজন সদস্য রয়েছেন।
সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানান, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। ফলে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে এমপিরা আলাদা অবস্থান নিতে পারবেন না। কেউ দলের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে।