হাসানের হাত ধরে উড়ছে বাংলাদেশ

ড্রেসিংরুমের পথে তানজিদ হাসান তামিম ও মুমিনুল হকের মুখে চওড়া হাসি। শরীরী ভাষাতেও আত্মবিশ্বাসের ছাপ। যেন দারুণ কিছু করে ফিরছেন বাংলাদেশের এ দুই ব্যাটসম্যান। ডারউইন টেস্টের প্রথম দিন শেষে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে ১ উইকেটে ৯৬ রান। অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে অলআউট করে ব্যাটিংয়ে নেমে ১০২ রানে পিছিয়ে আছেন অতিথিরা। তবে হাতে এখনো ৯ উইকেট। সেটাই লাল-সবুজের স্বপ্নকে আরও বড় করে তুলছে। কিন্তু প্রথম দিনের আসল নায়ক হাসান মাহমুদ। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমে স্বাগতিকদের ২০০ রানের নিচে আটকে দিতে বোলিং বিভাগের নেতৃত্ব দেন এ ডানহাতি পেসার। ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে ৫৫ রানে ৬ উইকেট নেন। তার হাত ধরেই প্রথম দিনের খেলা শেষে উড়ছে বাংলাদেশ।

যদিও চালকের আসনে আছে দল, তবু এখনই স্বস্তির ঢেঁকুর তুলতে চান না বাংলাদেশ দলের প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার। প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া বলেই এমন সতর্কতা সাবেক এ অধিনায়কের, ‘টেস্টের প্রথম দিনেই বলা যাবে না যে, আমরা জিতে যাব। এখনো অনেক লম্বা সময় পড়ে আছে। জিততে হলে আরও অনেক কষ্ট করতে হবে, আরও অনেক ভালো খেলতে হবে। অস্ট্রেলিয়া শক্তিশালী দল। তারা প্রত্যাবর্তন করার জন্য লড়াই করবে। তবে প্রথম কাজটা আমরা করতে পেরেছি। এখনো অনেক কাজ বাকি আছে আমাদের।’

তবে বাংলাদেশ যেভাবে প্রথম দিনটা নিজেদের দখলে রেখেছে, তাতে স্বস্তিপ্রকাশ করেন হাসান। দিনের খেলা শেষে সফরকারী দলের প্রতিনিধি হয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসে এ পেসার বলেন, ‘ব্যাটসম্যানদের যদি বলি আমরা খুব ভালো শুরু করেছি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাদমান (ইসলাম) ভাই শেষ করতে পারেনি। তবে এখন যে জুটি হচ্ছে, এটা যদি ধরে রাখতে পারি, তাহলে আরও এগিয়ে যেতে পারব।’

ডারউইনের সকালের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। মারারা স্টেডিয়ামের সবুজ উইকেট দেখে মনে হচ্ছিল, মঞ্চটা বুঝি অস্ট্রেলিয়ার পেসারদের জন্যই সাজানো। ২৩ বছর পর তাদের মাটিতে টেস্ট খেলতে আসা বাংলাদেশ সেখানে অতিথি। কাগজ-কলমে গল্পের শুরুটা তাই অস্ট্রেলিয়ার আধিপত্য দিয়েই হওয়ার কথা। কিন্তু ক্রিকেটের হিসাব সময় সময় কাগজ-কলমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। গতকাল সে হিসাব মেলাতে দেননি হাসান। সবুজ ঘাসের উইকেটটাকে নিজের ক্যানভাস বানিয়ে নেন ডানহাতি এ পেসার। নিখুঁত লাইন-লেংথ, দুই দিকে সুইং, সঙ্গে প্রয়োজনমতো বাউন্স-অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের জন্য প্রতিটি বলই হয়ে ওঠে কঠিন পরীক্ষা।

প্রথম স্পেলেই ৭ ওভারে ২৫ রান দিয়ে নেন ২ উইকেট। ফিরিয়ে দেন দুই ওপেনার জ্যাক ওয়েদারল্ড (২৩) ও ট্রাভিস হেডকে (২২) । সেই ধাক্কা আর কাটিয়ে উঠতে পারেনি প্যাট কামিন্সের দল। পরে আরও চার শিকার ধরেন হাসান। তার ৬টি শিকার তালিকায় সবচেয়ে বড় নাম স্টিভ স্মিথ। ব্যক্তিগত ২ রানে সিøপে জীবন পাওয়ার পর আরেকবার প্রযুক্তির সহায়তায় বেঁচে যান তিনি ইনিংসের ২১তম ওভারের। ইবাদত হোসেনের করা একটি বল স্মিথের ব্যাটের পাশ ঘেঁষে যায় উইকেটরক্ষক লিটন দাসের হাতে। সঙ্গে সঙ্গেই আবেদন করেন বাংলাদেশের ফিল্ডাররা। কিন্তু আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনা তাতে সাড়া দেননি। আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ রিভিউয়ের সিদ্ধান্ত নেয়, ড্রেসিংরুমের পথে হাঁটা ধরেন স্মিথও। কিন্তু রিপ্লেতে দেখা যায়, আলট্রাএজে কোনো ‘স্পাইক’ বা শব্দতরঙ্গ ধরা পড়েনি। বেঁচে যান স্মিথ। দিনের খেলা শেষে ব্যাটে বল লাগার স্বীকারোক্তি দিয়ে স্মিথ বলেন, ‘আমার মনে হয় হ্যাঁ লেগেছিল। আমি ভাগ্যবান ছিলাম (হাসি)। মাঝে মধ্যে এসব নিতে চাইবেন আপনি (হাসি)। হয়তোবা আমার ব্যাটে বল লাগেনি, আসলে আমি নিশ্চিত নই। যদি আউট দিয়ে দিত, আমি চলে যেতাম। তবে টেকনোলজি আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।’

দ্রুতই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসটা বলতে গেলে একাই টেনে নিচ্ছিলেন স্মিথ। কিন্তু হাসানকে ডাউন দ্য উইকেটে এসে আক্রমণ করতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন। ১০৯ বলে ৭১ রানের লড়াই থামে সেখানেই।

হাসানের আগুনে বোলিংয়ের সঙ্গে তাল মেলান তাসকিন আহমেদ ও ইবাদত হোসেন। বাকি ৪ উইকেট ভাগ করে নেন তারা। টেস্ট ক্রিকেটে এ নিয়ে দ্বিতীয়বার বাংলাদেশের পেসাররা এক ইনিংসে প্রতিপক্ষের ১০ উইকেটই নিলেন। প্রথম ও দ্বিতীয় সেশনে ৪টি করে উইকেট হারানোর পর তৃতীয় সেশনের শুরুতেই বাকি ২ উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া। ২০০ রানের আগেই শেষ স্বাগতিকদের ইনিংস।

এরপর ব্যাট করতে নেমেও দারুণ শুরু পায় বাংলাদেশ। সাদমান ইসলাম ২০ রান করে ফেরেন মিচেল স্টার্কের ১৪৩.৪ কিলোমিটার গতির বলে। পয়েন্টে নাথান লায়নের হাতে ক্যাচ দিয়ে থামেন তিনি। এর আগে ফিরতে পারতেন তানজিদ হাসান তামিমও। কিন্তু তার সহজ ক্যাচ ফেলে দেন লায়ন। জীবন পেয়ে মুমিনুলকে সঙ্গে নিয়ে দলকে লিডের দিকে টেনে নিচ্ছেন তামিম। দুজনের অবিচ্ছিন্ন ৬০ রানের জুটিতে তামিম ৩২, মুমিনুল ৩৫ রান নিয়ে আজ দ্বিতীয় দিন ব্যাটিংয়ে নামবেন।