‘মাক্খন টোস্ট’ ও শ্রদ্ধেয় জহির রায়হান

আপনে মিয়া পারেনও, শ্রদ্ধেয় জহির রায়হান স্যার আমাদের বাংলাদেশের একজন বীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এদের অবদানের কথা আপনে জানেন? উনার ‘স্টপ জেনোসাইড’ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রে তখনকার পাকিস্তানি সরকারের বর্বরতার চিত্র তুলে ধরেন, ফলে বাংলাদেশের পক্ষে সারা বিশ্ব বিবেক জেগে ওঠে। আর আপনে মিয়া কথা নাই বার্তা নাই, উনাদের মতো উৎসর্গিত প্রাণের নামের আগে ‘মাক্খন টোস্ট’, এসব মাক্খন টোস্ট বিস্কুট এসব নাম লাগাইতেছেন, লজ্জা শরম নাই!

কোনো কিছু না শুনেই তুই আমাকে একগাদা বাণী চিরন্তনী শুনিয়ে দিলি। শ্রদ্ধেয় জহির রায়হান স্যারের পরিচালিত ‘স্টপ জেনোসাইড’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আন্তজার্তিকমানের কাজ এটা সবাই জানে। তা ছাড়া তখন বিশ্ব জনমত সৃষ্টিতে ‘স্টপ জেনোসাইডের’ অবদানের কথা কেউ ভুলতে পারবে না।

তায়লে মিয়া যেই বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়াতে আজ আপনেরা প্রাইভেট প্লেনের, ব্যাংকের, ইউনিভার্সিটির মালিক- সেই বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়া এসব ‘মাক্খন টোস্ট’ টিটকারি মারা কতা কোইতে লজ্জা করেনা, যত্তোসব অকৃতজ্ঞ বাঙ্গাল জানি কোনখানকার!

ভাইরে- তখন থেকে তুই আমাকে না বুঝে সমানে ঝাড়ি মারছিস, আগে বিষয়টার শানে নজুল শোন তারপর বকাবাজি কর!

আরে কোয়েন ভাই, জিদ্দে আমার গা-জ্বলে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, বাঙালি জাতি স্বাধীনতার সব সুফল ভোগ করবেন, ওয়ার্ল্ডকাপ ক্রিকেট খেলবেন, সাফ গেমসে মেয়েদের ফুটবলে চ্যাম্পিয়ান হোইবেন, আবার মুক্তিযোদ্ধাদের হেয় করবেন। লজ্জা করে না! শ্রদ্ধেয় জহির রায়হান স্যারের নামের সামনে এইটা কী লিখছেন, ‘মাক্খন টোস্ট’ । উনি কি রুটি বিস্কুটের ব্যবসায়ী? 

‘মুখ ও মুখোশ’ চলচ্চিত্র নির্মাণে তখনকার  নায়ক, পরিচালক, প্রযোজকের প্রচুর বাধার সম্মুখীন হতে হয়। জানিস তখন পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র নির্মাণের কোনো সুযোগ ছিল না, ফলে ‘মুখ ও মুখোশ’ চলচ্চিত্রের প্রসেসিং, প্রিন্টিং, এডিটিং, রিরেকর্ডিং সব পশ্চিম

পাকিস্তানে গিয়ে কমপ্লিট করতে হয়। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের বিখ্যাত গায়িক নূরজাহান ‘মুখ ও মুখোশ’-এর পরিচালককে টিটকারী মেরে বলেছিলেন, ‘ক্যেয়া বাঙালি ডিরেক্টর সাব! আপকা পিকচার ‘মাক্খন টোস্ট’! ‘মুখ ও মুখোশ’কে বিকৃত করে বলেছিলেন, ‘মাক্খন টোস্ট’ আপকো লিয়ে বহুত লজ্জাৎদার হোগা!’  এসব কথার কোনো ভিত্তি আছে,  নাকি আপনে অযথা পাকিস্তানিগোরে ছুট করার লাগি, চাপা মারতাছেন?

আরে অশিক্ষিত, আমার কথা বিশ্বাস না হলে তুই বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের প্রকাশনার অনুপম হায়াৎ-এর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের ৪৮ পৃষ্ঠাটা পড়ে দেখিস তারপর আমার কথা ঠিক না চাপা, বিচার করিস!

ঠিক আছে মাইন্না নিলাম, আপনে ইতিহাস ঘাইট্টা সত্য কথাই বলছেন।  কিন্তু আমার প্রশ্ন হোইলো, হঠাৎ আপনে ‘মুখ ও মুখোশ’ নিয়া পড়লেন  ক্যেন?

ওম্মা, তুমি জানো না ১৯৫৩ সালে পূর্ববঙ্গ সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিচালক ডক্টর আবদুস সাদেক পূর্ব পাকিস্তানের সংস্কৃতিসেবী, চলচ্চিত্র পরিবেশক ও প্রদর্শকদের এক সভার আয়োজন করেন। তখন ওই সভায় অবাঙালি চিত্রব্যবসায়ী ফজলে দোসানী বলেন, ‘এখানকার বাতাসে আর্দ্রতা বেশি, তাই পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব না।’

তখন সভায় উপস্থিত বাঙালি সন্তান আবদুল জব্বার খান বলেন, ‘ক্যেনো, কলকাতায় ছবি হোচ্ছে, ঢাকায় এসে প্রমথেশ বড়–য়ারা শুটিং করেছেন। তাহলে পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র হবে না ক্যেনো! ফজলে দোসানীর কথার পিঠে শ্রদ্ধেয় আবদুল জব্বার খান চ্যালেঞ্জ করলেন যে, তিনি পূর্ব পাকিস্তানেই পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন।

তারপর তো শুনছি, অনেক কষ্টে উনি ‘মুখ ও মুখোশ’ সিনেমা শেষ করেন এবং ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট ‘রূপমহল’ সিনেমা হলে তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তানের গর্ভনর শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক স্যার, চলচ্চিত্রটির উদ্বোধন করেন। ‘মুখ ও মুখোশ’ রিলিজের পর ওই রূপমহলেই এক মাসব্যাপী হাউসফুল ছিল।

গত ০৩.০৮.২০২৬ তারিখে ‘মুখ ও মুখোশ’ চলচ্চিত্রের ৭০ বছর পূর্তিতে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে ১৯টি সংগঠনের আয়োজনে ‘মুখ ও মুখোশ’ চলচ্চিত্রের মুক্তি দিবস উদযাপন উপলক্ষে এক আলোচনা সভার অয়োজন করে। এটা তো আমাদের গর্বের ইতিহাস।

বুঝলাম, ওরা পাকিস্তানি।  ওরা বাঙালিদের হেয় করার জন্য ‘মুখ ও মুখোশ’কে বিকৃত করে ‘মাক্খন টোস্ট’ বলতে পারে।  কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রায় চুয়ান্ন বছর পার হওয়ার পরও যদি চলচ্চিত্রের অঙ্গনের চলচ্চিত্র নির্মাতারা ‘মুখ ও মুখোশ’-এর পরিচালকের নাম ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জহির রায়হান’ লেখেন, সেটা কি পরিতাপের বিষয় নয়!

কী বললেন, ‘মুখ ও মুখোশ’-এর পরিচালক আবদুল জব্বার খানের পরিবর্তে ওই ‘ঊনিশ সংগঠন’ পরিচালকের নাম লিখেছেন- বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রদ্ধেয় জহির রায়হান!

না আমার বলার কিছুই নেই, শুধু দুঃখ ভরা চিত্তে কবি শামসুর রাহমানের ভাষায় বলব ‘অদ্ভুত উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ...’।

লেখক : রম্য লেখক ও চিত্র নির্মাতা 

osmanzanesar@gmail.com