তারুণ্যের জয়, তারুণ্যের ক্ষয়

যদি প্রশ্ন করা হয় এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ কী? কোন সম্পদ ব্যবহার করে দেশ উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে যেতে পারে? কোন সম্পদ দিয়ে দেশের আপামর জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করে একটি সুখি-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে জায়গা করে নেবে? এর উত্তর একদিকে জটিল; অন্যদিকে সরল। জটিল এই অর্থে যে, একটি দেশের উন্নয়ন একক কোনো উপাদানের ওপর নির্ভর করে না। ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ, শিল্পায়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, পরিবেশ ও প্রতিবেশগত ভারসাম্যসহ নানা উপাদান অর্থনৈতিক উন্নয়নের নির্ণায়ক। এসব উপাদানের কোনোটিতেই বাংলাদেশের পুরোপুরি সক্ষমতা নেই। তাহলে বাংলাদেশ কীভাবে কেবল এশিয়া নয়; বিশ্বের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে? হ্যাঁ, এ স্বপ্ন অলীক নয়; বাস্তব ও অর্জনযোগ্য। আর তা সম্ভব দেশের মানবসম্পদকে কাজে লাগানোর ওপর। তারুণ্যই  বাংলাদেশের বড় সম্পদ। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, তরুণদের ভালোভাবে কাজে না লাগালে তারা সম্পদের বিপরীতে দেশের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

অর্থনীতিতে সম্পদ বলতে সেটাকেই বোঝায়, যার উপযোগ রয়েছে, যা দিয়ে চাহিদা পূরণ করা যায়; মূল্য সৃষ্টি হয়, যা উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি আনে। সম্পদের বিপরীত হলো বোঝা, যা থেকে কোনো উপযোগ আসে না; বরং ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র তথা বিশ্বব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে, যা উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে বাধা। শিক্ষিত, কর্মঠ ও দক্ষ জনগোষ্ঠী যারা কর্মসংস্থানে যুক্ত এবং যাদের মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র তথা বিশ্বব্যবস্থার কল্যাণ নিশ্চিত হয় তারা সম্পদ। আর যাদের কোনো দক্ষতা ও যোগ্যতা নেই, যারা শিক্ষা ও জ্ঞানার্জন করেননি এবং যারা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র তথা বিশ্বব্যবস্থার জন্য অকল্যাণকর তারা হলেন বোঝা। উন্নয়ন অর্থনীতিতে একটি বহুল আলোচ্য প্রপঞ্চ হলো জনমিতিক সুবিধা বা ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্ট। একটি রাষ্ট্রে যখন কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা নির্ভরশীল মানুষের তুলনায় বেশি থাকে সে অবস্থা হলো ও রাষ্ট্রের জন্য জনমিতিক সুবিধা। কর্মক্ষম মানুষ বলতে সাধারণত ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে বোঝায়। এ জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত ও দক্ষ করে কর্মসংস্থানে যুক্ত করে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো যায়। অপরদিকে ১৫-এর নিচের বয়সীরা শিশু এবং ৬৪-এর বেশি বয়সীরা প্রবীণ। সাধারণত এ বয়সের জনগোষ্ঠী থেকে উপযোগ আসে না। বাংলাদেশের জনসংখ্যার মধ্যে শূন্য থেকে ১৪ বছর বয়সী হলো ২৫ দশমিক ১ শতাংশ। প্রবীণ বা ৬৫ বছরের বেশি বয়স্ক হলেন ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। আর ৫৬ দশমিক ৪২ শতাংশ বা অর্ধেকের বেশি বয়সীর বয়স ৩০-এর নিচে। ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী হলেন ৬৭ দশমিক ১ শতাংশ। এদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো যায়। এদের কাছ থেকে উপযোগ আসে। এরা সম্পদ। এটিই হলো বাংলাদেশের জন্য জনমিতিক সুযোগ ও সম্ভাবনা; পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও। বর্তমানে বাংলাদেশসহ এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশে জনমিতিক সুবিধা বিদ্যমান। কিন্তু জনমিতিক সুবিধা কখনোই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনে না।  প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের জন্য তরুণ জনগোষ্ঠী জনমিতিক সুযোগ; নাকি জনমিতিক বোঝা?

বাংলাদেশ জনমিতিক সুযোগের সদ্ব্যবহারে কাগজে কলমে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তরুণদের যোগ্য ও দক্ষ করতে বক্তৃতা-বিবৃতিতেও পিছিয়ে নেই। এ ব্যাপারে উদ্যোগও লক্ষণীয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বেশি। অর্থাৎ ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। এটি ইতিবাচক। এ ছাড়া জেলা থেকে উপজেলা পর্যন্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দেশে সরকারি মেডিকেল কলেজ ৩৮টি, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ৬৮টি, সেনাবাহিনী পরিচালিত মেডিকেল কলেজ ৭টি, সরকারি ডেন্টাল কলেজ ৯টি, বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ ২৪টি, সরকারি নার্সিং ইনস্টিটিউট ৩৮টি, সরকারি নার্সিং কলেজ ৭টি, পোস্ট-বেসিক সরকারি নার্সিং কলেজ ৪টি। জেলা থেকে শুরু করে উপজেলা; এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত ২ হাজার ২৮৩টি কলেজে প্রায় ৩২ লাখ শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স, মাস্টার্স, ডিগ্রি পাস কোর্সে লেখাপড়া করেন। তাদের সক্ষমতা ৪০ লাখ। আবার লেখাপড়া শেষ করে সবচেয়ে বেকারও থাকছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর এএসএম আমানুল্লাহ এ ধারা থেকে বের হতে অনেকগুলো পদক্ষেপ নিচ্ছেন। ৫৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন জেলায় আরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা আছে। অনুমোদন দেওয়া হবে আরও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এসব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইনপুট হলেন উচ্চমাধ্যমিক পাস করা শিক্ষার্থীরা। কিন্তু এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের চিত্র নেতিবাচক। ২০২৬ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের লক্ষ্যে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন করেছিলের প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। কিন্তু এদের মধ্যে সাড়ে ৫ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষার ফরমই পূরণ করেননি। আবার যারা ফরম পূরণ করেছেন তাদের মধ্যে লাখের ওপর পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এরপর আসে পাস-ফেল। এ ছাড়া এসএসসি পর্যায়ের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশগ্রহণেচ্ছুক প্রায় ১৯ লাখ শিক্ষার্থী নবম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন করলেও পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছেন সাড়ে ১৪ লাখ। আর এসএসসির ফল বিপর্যয়ের বিষয়টি অনেক প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে, তাগিদ দিয়েছে ব্যর্থতার দায় চিহ্নিত করে শিক্ষাক্ষেত্রে ক্ষত উপশমের।   

যাদের ওপর ভিত্তি করে তথা যাদের জনমিতিক সুযোগের মূল উপাদান ধরে আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসার কথা সেই লাখ লাখ তরুণ শিক্ষাজীবনের মাঝপথেই ঝরে যাচ্ছে! তারা কী করছেন, কোথায় আছেন সে তথ্য রাষ্ট্রের কাছে নেই। এ ছাড়া প্রাথমিক পর্যায়েও শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। হাওর, চা বাগান, সীমান্তবর্তী ও পাহাড়ি এলাকায় ঝরে পড়ার হার উদ্বেগজনক। মেয়ে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বাল্য বা কম বয়সে বিয়ে করার জন্য লেখাপড়া আর তাদের পক্ষে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আবার একটা অংশ মনে করেন মাস্টার্স পাস করেও যেহেতু বেকার থাকতে হচ্ছে তাহলে আর কষ্ট করে লেখাপড়া করে লাভ কী? বিদেশমুখিতাও শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার কারণ। এনজিও মডেল অনুসরণ করে স্বনির্ভর হওয়ার আশায় অনেক তরুণ না করছে লেখাপড়া, না হতে পারছে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী। এভাবে লাখ লাখ তরুণ শিক্ষা ও দক্ষতার বাইরে থাকার অর্থ হলো দেশের জন্য তারা সম্পদ নন; বরং বোঝা। এই  তরুণদের হারিয়ে যাওয়ার পূর্বে তাদের ধরে রাখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট পরিবারের, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের, সর্বোপরি রাষ্ট্রের। নতুনা তারা সম্পদের পরিবর্তে বোঝা  হয়ে দাঁড়াবে।

আবার যেসব তরুণের উচ্চশিক্ষায় অভিগমন ঘটছে তাদের অনেকেই মানসম্পন্ন শিক্ষা পাচ্ছে না। এ ছাড়া দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলো যেসব বিষয়ে পড়ানো হয় বর্তমান সময়ে এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ জ্ঞান সৃষ্টি, মানবিক মূল্যবোধ বিকাশ, উদ্ভাবন, যুগোপযোগী গবেষণা, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং শিল্প-একাডেমিয়ার সহযোগিতার মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে নেতৃত্ব দান; উন্নয়ন প্রকল্প আনা ও বাস্তবায়ন না। এটা সরকারের গণপূর্ত বিভাগের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত। ক্রেডিট আওয়ার অনুযায়ী ক্লাস ও কোর্স সম্পন্ন হয় কিনা সেদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নজর দিতে হবে। গবেষণা বলতে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণাকর্ম নয়; শিক্ষার্থীদেরও  গবেষণামুখী করতে  হবে। একাডেমিক ক্যালেন্ডারের নামে সময়মতো পরীক্ষা নিতে পারলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সফলতা। ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ভালো করছে। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো। তবে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কম্পিউটার সায়েন্স ও ব্যবসায় প্রশাসন ডিসিপ্লিন নির্ভর। সনদসর্বস্ব গ্র্যাজুয়েট দিয়ে ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ দূরে থাক জাতীয় ও স্থানীয় উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব না। 

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলতেন, সারা বিশ্ব নাকি আমাদের তরুণদের নিতে দরখাস্ত করছেন, অনুরোধ করছেন। অথচ জনশক্তি রপ্তানিতে কী পরিমাণ বেগ পেতে হচ্ছে তা দৃশ্যমান। অনেক ঝড়ঝাপটার পর যারা বিদেশ যাচ্ছে তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও যোগ্যতা না থাকায় কম বেতনের কাজ করতে হচ্ছে। প্রতি মাসেই অসংখ্য তরুণ সাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে বিদেশ যাচ্ছে। কেউ কেউ সাগড়ে ডুবে প্রাণ হারাচ্ছে। মাদকাসক্ত, কিশোর অপরাধ, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে আমাদের তরুণদের সর্বনাশের পেছনে রয়েছে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র। আমাদের তারুণ্যের জয় যেমন আছে, তেমনি ক্ষয়ও কম নয়। তরুণদের যোগ্যতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে জনমিতিক সুযোগ আমাদের কোনো কাজে তো লাগবেই না; বরং তা হবে জনমিতিক বোঝা । এমনটি তো কাম্য হতে পারে না। 

লেখক : মানবসম্পদ, জলবায়ু, শিক্ষা ও

পরিবেশ গবেষক

উপাচার্য, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট

jahirul-psa@sust.edu