চট্টগ্রামের সীতাকু-ের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ জাহাজ থেকে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। অসুস্থ হয়েছেন ১১ জন। দুর্ঘটনার সময় ইয়ার্ডে প্রায় ২০ শ্রমিক কাজ করছিলেন। ঘটনাস্থলে সেফটি অফিসার ছিল না বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। মাত্র দেড় মাস আগে নিরাপত্তাজনিত ঘাটতি পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। ফলে এ দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডটির নিরাপত্তাব্যবস্থা ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে ভাটিয়ারী স্টেশন রোডসংলগ্ন সাগর উপকূলে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটির নাম এমভি রাসি। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি সর্বশেষ এলএনজি বহন করেছিল।
দুর্ঘটনার পর অসুস্থদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এখনো চিকিৎসাধীন।
নিহত ৯ জন হলেন দুই সহোদর মোহাম্মদ মনসুর আলী ও মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, পলাশ জলদাস, সানি জলদাস, খোকন মিয়া, আব্দুল আলিম সুজন, হাবিবুর রহমান, মতিউর রহমান। অপর একজনের পরিচয় জানা যায়নি। নিহতদের আটজনের মরদেহ চমেক হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। অপরজনের মরদেহ বেসরকারি একটি হাসপাতালে রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত শ্রমিক মোহাম্মদ সেলিম বলেন, আমি ১৮ বছর ধরে এ লাইনে কাজ করি। জাহাজটি দেড় বছর ধরে কাটা হচ্ছে। চারদিকে কাটা ছিল। জাহাজে এলএনজির কিছু প্রোডাক্ট ছিল। সেগুলো দীর্ঘদিন থাকায় বিষাক্ত গ্যাসে পরিণত হয়েছে। আজ যখন কাটা হয়েছে, তা পানির সঙ্গে ছড়িয়ে গেছে। এরপর শ্রমিকরা বেহুঁশ হতে থাকে। তাদের যারা উদ্ধার করতে গেছে, তারাও বেহুঁশ হয়েছে। আমিও উদ্ধার করতে গিয়ে বেহুঁশ হয়েছি। আর ৩০ সেকেন্ড সেখানে থাকলে আমি মারা যেতাম।
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা জানান, এলএনজি বহনকারী জাহাজ কাটার আগে সেটিকে যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত করা জরুরি। জাহাজের ট্যাংক ও পাইপলাইনে থাকা গ্যাস বা বিষাক্ত পদার্থ থেকেই দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা আল মামুনের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় ইয়ার্ডে প্রায় ২০ শ্রমিক কাজ করছিলেন। সেখানে সেফটি অফিসারও ছিলেন না।
তবে দুর্ঘটনার পর সামনে এসেছে আরও গুরুতর তথ্য। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান জানান, ‘বিগত দেড় মাস আগে ইয়ার্ডটি পরিদর্শনে কিছু নিরাপত্তাজনিত ঘাটতি পাওয়া যায়। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল।’
এ দুর্ঘটনা সীতাকু-ের জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্পে শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে আবারও বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিশেষ করে দেড় মাস আগে নিরাপত্তা ঘাটতির কারণে মামলা হওয়ার পরও কীভাবে এমন প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটল তদন্তে তার উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার সময় সেফটি অফিসার না থাকার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকার্স অ্যাসোসিয়েশন পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে কমিটিকে জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করে দুর্ঘটনার কারণ উল্লেখসহ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
তদন্তে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, এমভি রাসি কাটার আগে সেটি যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত করা হয়েছিল কি না, প্রয়োজনীয় ‘গ্যাস ফ্রি’ সনদ ছিল কি না, গ্যাস পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না এবং নির্ধারিত নিরাপত্তাব্যবস্থা মেনে জাহাজ কাটার কাজ শুরু করা হয়েছিল কি না?
এদিকে দুপুরে আহতদের দেখতে ও নিহতদের স্বজনদের সমবেদনা জানাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ সময় তিনি বলেন, এটি খুবই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আহত-নিহতদের ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
নিহত শ্রমিকদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাহাজ ভাঙা শিল্প মালিক সমিতি। সংগঠনের সদস্যসচিব নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘নিহত প্রত্যেক শ্রমিককে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আহতদের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’