প্রায় দুই দশক আগে মৌলভীবাজার জেলার সুজানগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে আক্ষরিক অর্থে আগরের ব্যবহারিক দিকগুলো দেখার সুযোগ হয়েছিল। তার আগে আগর সম্পর্কে জ্ঞান ছিল সীমিত। গাছটি যে এত মূল্যবান তাও জানা ছিল না। এই উপজেলার মানুষদের আর্থিক সচ্ছলতার প্রধান উৎস আগর। গাছটি সেখানে যতটা সহজলভ্য অন্য কোথাও ঠিক ততটা নয়। সুজানগরসহ বৃহত্তর সিলেটে বিচ্ছিন্নভাবে অনেকগুলো আগরবাগান গড়ে উঠেছে। বাগানগুলো প্রতিদিন সেখানকার অসংখ্য আগর-আতর কারখানার কাঁচামাল সরবরাহ করে আসছে। কয়েক দশক আগে থেকেই সুজানগরের এই আগর-আতর শিল্পের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। সেখানকার সৃজিত বাগানের এই গাছ থেকে নির্যাস সংগ্রহ করে বানানো হয় নানান সুগন্ধি।
দেশের বিভিন্ন পার্ক উদ্যান ও সংরক্ষিত স্থানেও বিক্ষিপ্তভাবে গাছটি চোখে পড়ে। ক্ষতির আশঙ্কায় অনেকেই এ গাছের পরিচয় গোপন রাখেন। আগর সমতল অঞ্চলে খুব একটা দেখা যায় না। তবে গাছের কান্ড, ডালপালা বা পাতা সরাসরি সুগন্ধি নয়। গাছের কা- ও বড় ডালপালার ভেতর থাকা উদ্বায়ী পদার্থগুলো বিশেষ পদ্ধতিতে সংগ্রহ করা হয়। মূলত তা থেকেই মহার্ঘ আতর তৈরি হয়। এই সুগন্ধির মধ্যে ধাপে ধাপে আতর, আগরবাতি ও ধূপকাঠি বানানো হয়। পরিণত গাছ থেকে সবচেয়ে বেশি কাঁচামাল পাওয়া যায়। এ কারণে পুরনো গাছগুলো বেশ চড়াদামে বিক্রি হয়।
একটি স্বল্পমেয়াদি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয় সুগন্ধির নির্যাস। প্রথমে গাছের ভেতরের প্রয়োজনীয় অংশটুকু টুকরা টুকরা করে কাটা হয়। তারপর সেগুলো পানি মিশিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সিদ্ধ করা হয়। সিদ্ধ করার জন্য ব্যবহার করা হয় একধরনের বিশেষ পাত্র ও চুল্লি। নির্যাসযুক্ত পানি নানান ধাপ অতিক্রম করে মূল উপাদান তৈরি করে। তা অবশ্য সরাসরি ব্যবহার করা হয় না। মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
আগর কোথাও কোথাও অগরু নামেও পরিচিত। ঢাকার রমনাপার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংরক্ষিত বাগানে কয়েকটি আগর গাছ দেখা যায়। আগরের জন্মস্থান ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাহাড়ি অঞ্চল। চিরসবুজ বড় গাছ, কা- সোজা, সাদাটে ও মসৃণ। এই গাছ বছরে একবারও পাতা ঝরায় না। পাতা ডিম্বাকৃতি। নতুন পাতার কুঁড়ি কিছুটা রোমশ ধরনের। উজ্জ্বল সবুজ রঙের পাতাগুলো খানিকটা পাতলাই বলা যায়। ফুল ছোট। ছড়ানো মঞ্জরিতে ছোট ছোট ও ঘনবদ্ধ ফুলগুলো ফোটে বসন্তের শেষভাগে। বাদামি বর্ণের বীজ ফলের বাইরে এসে এক-দুই দিন ঝুলে থাকে, তারপর মাটিতে ঝরে পড়ে। ডিম্বাকৃতির ফলগুলো তিন চার সেন্টিমিটার লম্বা হতে দেখা যায়। গড়নের দিক থেকে এরা লম্বাটে স্বভাবের। সাদা কাঠ থেকে আহরিত আঠাও সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আর কাঠের গুঁড়া ধূপ জ্বালানোর কাজে লাগে। আগরের সুগন্ধি প্রশান্তিদায়ক এবং শরীরের শক্তি বৃদ্ধিকারী বলে মনে করা হয়। মালয় ও চাইনিজদের আদি চিকিৎসা পদ্ধতিতে রোগ নিরাময়ের ওষুধ প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে আগর কাঠ ব্যবহার হয়ে আসছে। অ্যারোমাথেরাপিতেও এর ব্যবহার আছে। এ ছাড়া গাছটি মূত্রবর্ধক, কামোদ্দীপক ও কোষ্ঠ্য পরিষ্কারক হিসেবেও ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ, ব্রংকাইটিস, হাঁপানি ও বাত রোগে আগরের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। বংশবৃদ্ধি বীজ থেকে। বৈজ্ঞানিক নাম Aquilaria malaccensis। পরিবার Thymelaceae। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএনের তথ্যমতে গাছটি বর্তমানে বিপন্ন।
লেখক : প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক