১১৭ স্কুলে নেই মানবিক বিভাগ

কলেজিয়েট স্কুল। চট্টগ্রাম তথা দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ। এই স্কুলের ৩৬১ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩৫৬ জন পাস করেছে এবং তাদের মধ্য ২৯৩ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। এদের সবাই বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থঅ। শুধু কি কলেজিয়েট? নগরীর তথা চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন প্রায় সব সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মানবিক বিভাগের কোনো শিক্ষার্থী নেই। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সমাজব্যবস্থায়।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক পদে আছেন প্রফেসর আবুল কাশেম। মানবিক বিভাগ না থাকায় তিনি তার এক সন্তানকে চট্টগ্রামের সিটি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ছাড়পত্র নিয়ে চিটাগং আইডিয়াল স্কুলে ভর্তি করান। এখানে এনেও দেখেন মানবিক বিভাগ নেই। পরে বাধ্য হয়ে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি করাতে হয়েছে এবং এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার খুব ইচ্ছা ছিল মেয়েকে মানবিক বিভাগে পড়াব। মেয়েরও আগ্রহ ছিল। এখন আমি যেমন আমার সন্তানকে মানবিক বিভাগে পড়াতে পারিনি, ঠিক তেমনি অনেক অভিভাবক শুধু সেসব স্কুলে মানবিক বিভাগ না থাকার কারণে পড়াতে পারছেন না। এ ধারার পরিবর্তন ঘটাতে হবে।

 দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় স্কুলপর্যায়ে ৯ম শ্রেণিতে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা এই তিনটি বিভাগ চালু থাকলেও উপাত্ত সংগ্রহ করে দেখা যায়, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন ১১৭টি সেরা স্কুলে মানবিক বিভাগ নেই। একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, চট্টগ্রাম শহরের সেরা ২৫টি স্কুল থেকে এবার ৭ হাজার ২৩৯ জন পরীক্ষা দিয়ে ৬ হাজার ৮৩৯ জন পাস করেছে এবং এদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ২৮৪ জন। যদিও বোর্ডে এবার মোট জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৩৯৮ জন। গাণিতিক হিসেবে বোর্ডের মোট জিপিএ-৫ এর ৩৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ জিপিএ-৫ পেয়েছে এই ২৫টি স্কুলের শিক্ষার্থীরা। কিন্তু এসব স্কুলে যদি মানবিক বিভাগ চালু থাকত, তাহলে বোর্ডের মানবিক বিভাগের পাসের হার যেমন বাড়ত, তেমনিভাবে শিক্ষার্থীরাও মানবিকগুণসম্পন্ন মানুষ হিসেবে বড় হতে সহায়ক হতো বলে মন্তব্য করেন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক প্রফেসর আবুল কাশেম।

বিদ্যালয় পরিদর্শকের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা গবেষণা নিয়ে কাজ করা চট্টগ্রাম সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের ড. শামসুদ্দীন শিশির বলেন, ‘আজ সমাজের মধ্যে যে অস্থিরতা, এর পেছনের অন্যতম কারণ হলো আমাদের মধ্যে মানবিক গুণাবলি হারিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা সমাজ, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভূগোল ও বৈশি^ক অবস্থা নিয়ে জানতে পারে মানবিক বিষয়ের বিষয়গুলো থেকে। কিন্তু এখন আর এসব বিষয়ের প্রতি শিক্ষার্থী ও শিক্ষক কারও আগ্রহ নেই।

আগ্রহ নেই কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্কুলের সবচেয়ে দুর্বল শিক্ষার্থীরাই মানবিক বিভাগে ভর্তি হয়। শহরের মেধাবীরা মানবিকে যেমন পড়ে না, তেমনিভাবে গ্রামের গরিব ঘরের ছেলেমেয়েরা প্রাইভেট পড়তে পারবে না বলে মানবিকে ভর্তি হয়। আর এই দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি মনোযোগও তুলনামূলকভাবে কম থাকে এবং এর ফল আমরা পরীক্ষায় দেখতে পাচ্ছি।

এবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি পরীক্ষার ফলের উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, পরীক্ষায় অংশ  নেয় ১ লাখ ২৯ হাজার ৩৬৬ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ইংরেজিতে ফেল করেছে ৩৫ হাজার ৮৬৬ জন। ফেল করা ৩৫ হাজার ৮৬৬ জনের মধ্যে মানবিকের পরীক্ষার্থী রয়েছে ২০ হাজার ২৫১ জন, ব্যবসায় শিক্ষার ১৪ হাজার ও বিজ্ঞানের ১ হাজার ৬১৪ জন। গাণিতিক হিসাবে দেখা যায়, মানবিকের মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ ফেল করেছে ইংরেজিতে। শুধু কি ইংরেজি? গণিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৫ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ফেল করেছে ২৫ হাজার ৭৭৩ জন। ফেলকৃত এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিকের ১৪ হাজার ১৬০ জন, ব্যবসায় শিক্ষার ৯ হাজার ৭৪৪ জন এবং বিজ্ঞানের ১ হাজার ৮৬৯ জন। গাণিতিক হিসেবে মানবিকের মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩২ দশমিক ৪০ শতাংশ পরীক্ষার্থী ফেল করেছে গণিতে। অর্থাৎ ইংরেজি ও গণিতে সবচেয়ে বেশি ফেলের তালিকায় রয়েছে মানবিকের পরীক্ষার্থীরা।

সেরা স্কুলের শিক্ষার্থীরা মানবিকে পড়তে চায় না

কলেজিয়েট, খাস্তগীর, মুসলিম হাই, সেন্ট প্লাসিড, চট্টগ্রাম সরকারি বালক, চট্টগ্রাম সরকারি বালিকা, নাসিরাবাদ বালক, ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ক্যান্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল, অপর্নাচরণ বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বাকলিয়া সরকারি, সিটি গার্লস, মহসিন সরকারি স্কুল, বাওয়া স্কুল, সিএমপি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ,  রেলওয়ে পাবলিক স্কুল, স্কুল অব সায়েন্স বিজনেস অ্যান্ড হিউমেনিটিজসহ অনেক স্কুলে মানবিক বিভাগের পরীক্ষার্থী নেই। এর কারণ কি জানতে চাইলে খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহেদা আকতার বলেন, আমাদের এখানে সবাই ভালো শিক্ষার্থী। ভালো শিক্ষার্থীদের কেউ মানবিকে পড়তে চায় না। তবে কেউ পড়তে চাইলে আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।

অপরদিকে সরকারি কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ তজল্লি আজাদ বলেন, আমাদের স্কুলে সবাই বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে থাকে। তবে এবার ৯ম শ্রেণিতে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ চালু করলেও মানবিক বিভাগ চালু নেই।

শিক্ষক থাকলেও মানবিক গ্রুপ নেই  : শুধু চট্টগ্রাম মহানগরই নয়, জেলা ও উপজেলাপর্যায়ের সেরা বিদ্যাপীঠগুলোতেও মানবিক বিভাগ নেই। তাহলে কি এসব প্রতিষ্ঠানে মানবিকের শিক্ষক নেই? এই প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের ড. শামসুদ্দীন শিশির বলেন, প্রতিটি স্কুলেই মানবিক বিভাগের শিক্ষক রয়েছেন। তারা চাইলেই মানবিক গ্রুপ চালু করতে পারেন।

মানবিক বিভাগের শিক্ষক থাকার কথা স্বীকারও করেন খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা শাহেদা আকতার। তিনি বলেন, আমাদের সব গ্রুপের শিক্ষকই রয়েছেন।

শিক্ষক থাকার পরও মানবিক বিভাগ চালু না করাকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক প্রফেসর এসএম সহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘দেশের শিক্ষাব্যবস্থা অনুযায়ী সব স্কুলেই তিনটি গ্রুপ (বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা) চালু রাখা প্রয়োজন।’

উল্লেখ্য, এবারের প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলে মানবিকের শিক্ষার্থীরা বেশি ফেল করেছে। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে বিজ্ঞান বিভাগের পাসের হার ৮৪ দশমিক ৪১ শতাংশ, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের পাসেরহার ৬০ দশমিক ১২ শতাংশ হলেও মানবিক বিভাগের পাসেরহার ৩৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ। আর মানবিকে পাসেরহার কমে যাওয়ায় বোর্ডের সামগ্রিক গড় পাসেরহার ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমে এসেছে। আর নেমে যাওয়ার হার শহরের তুলনায় গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বেশি। চট্টগ্রাম শহরের ৫০ দশমিক ৩০ শতাংশ পরীক্ষার্থী মানবিকে পাস করলেও কক্সবাজারে পাস করেছে ৪১ দশমিক ৫৮ শতাংশ, খাগড়াছড়িতে ২৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ, রাঙ্গামাটিতে ২৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং বান্দরবানে ৩৬ দশমিক ৩০ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করেছে। আর তাদের পাসের হার কমে যাওয়ার কারণেই বিজ্ঞানে ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাসের হার বেশি হলেও বোর্ডের গড় পাসের হার কমে গেছে।