আয়ান আর টিকো

‘আয়ান, তোমার স্কুলব্যাগটা কে গুছিয়ে দিল?’ মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন। আয়ান হেসে বলল, ‘আমি না! টিকো গুছিয়েছে।’

ঠিক তখনই টেবিলের নিচ থেকে ছোট্ট গোলগাল একটি রোবট বেরিয়ে এলো। তার চোখ দুটো নীল আলোয় টিমটিম করছে। সে মিষ্টি গলায় বলল, ‘সুপ্রভাত! আজকের কাজের তালিকা শেষ করতে প্রস্তুত!’

আয়ানের জন্মদিনে মামা তাকে এই ছোট্ট রোবটটি উপহার দিয়েছিলেন। নাম টিকো। টিকো শুধু খেলনা নয়। সে অনেক কাজও করতে পারে। বই গুছিয়ে দেয়, ব্যাগ তৈরি করে, খেলনা তুলে রাখে, এমনকি গাছে পানি পর্যন্ত দেয়।

শুরুতে আয়ানের খুব ভালো লাগত।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে বলত, ‘টিকো, দাঁত মাজার ব্রাশ দাও।’

টিকো সঙ্গে সঙ্গে এনে দিত।

‘টিকো, স্কুলের ব্যাগ গুছিয়ে দাও।’

আয়ান ব্যাগ গোছানো অবস্থায় পেয়ে যেত।

‘টিকো, রঙ পেন্সিল খুঁজে দাও।’

এক মিনিটও লাগত না।

আয়ান ভাবতে লাগল, নিজের কিছুই করার দরকার নেই। সব কাজই তো টিকো করে দিতে পারে!

দিন যেতে লাগল।

এখন আয়ান খেলনা ছড়িয়ে রেখে চলে যায়। জামা খুলে বিছানায় ফেলে রাখে। স্কুল থেকে ফিরে জুতাও ঠিক জায়গায় রাখে না।

সে শুধু ডাকে, ‘টিকো!’

টিকো দৌড়ে আসে।

একদিন বাবা মুচকি হেসে বললেন, ‘আয়ান, আজ তোমার স্কুলের প্রজেক্টটা কে বানাবে?’

আয়ান নিশ্চিন্ত গলায় বলল, ‘টিকো বানিয়ে দেবে।’

বাবা কিছু বললেন না। শুধু হাসলেন।

পরদিন স্কুলে সবাই নিজেদের হাতে বানানো রঙিন প্রজেক্ট নিয়ে এসেছে। কেউ কাগজ কেটেছে, কেউ ছবি এঁকেছে, কেউ গাছের শুকনো পাতা দিয়ে সুন্দর নকশা বানিয়েছে।

আয়ান ব্যাগ থেকে বের করল টিকোর বানানো একদম নিখুঁত প্রজেক্ট।

শিক্ষিকা দেখে বললেন, ‘খুব সুন্দর হয়েছে। কিন্তু বলো তো, এটা তুমি কীভাবে বানিয়েছ?’ 

আয়ানের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

সে একটু থেমে বলল, ‘আমি... আমি...’

মনে হলো, যদি বলে সে বানিয়েছে, তাহলে সেটা ঠিক হবে না।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে মাথা নিচু করে বলল, ‘আসলে... এটা আমি বানাইনি। আমার রোবট বানিয়ে দিয়েছে।’

ক্লাসে কেউ হাসল না।

শিক্ষিকা মিষ্টি হেসে বললেন, ‘ধন্যবাদ, আয়ান। তুমি সত্য কথা বলেছ। রোবট সাহায্য করতে পারে। কিন্তু তোমার নিজের হাতের কাজের আনন্দটা সে দিতে পারবে না।’

আয়ান চুপচাপ নিজের বেঞ্চে বসে রইল।

সেদিন বাড়ি ফিরে সে একটু মন খারাপ করে টিকোর দিকে তাকাল। টিকো আগের মতোই বলল, ‘পরবর্তী কাজ বলো।’

আয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

‘আজ কিছু বলব না।’

টিকো অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি

কি অসুস্থ?’

আয়ান হেসে বলল, ‘না। আমি শুধু ভাবছি।’

পরদিন ছিল ছুটির দিন।

আয়ান ঠিক করল, আজ নিজের ঘর নিজেই গুছাবে। কিন্তু কাজটা মোটেও সহজ নয়!

বই একদিকে, খেলনা আরেক দিকে। মোজার জোড়া মিলছে না। বিছানার নিচে লুকিয়ে আছে একটি লাল গাড়ি। ঘামতে ঘামতে আয়ান সব গুছিয়ে ফেলল।

শেষে নিজের ঘরের দিকে তাকিয়ে তার মুখে বড় হাসি ফুটে উঠল। ‘আরে! আমি তো পেরেছি!’

টিকো হাততালির মতো শব্দ করে বলল, ‘অভিনন্দন! ঘর গুছানো শেষ হলো!’ আয়ান হেসে বলল, ‘এবার আমি করেছি।’

কয়েক দিন পর স্কুলে ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা হলো। টিকো বাড়িতে বলল, ‘আমি চাইলে তোমার জন্য দারুণ ছবি এঁকে দিতে পারি।’

আয়ান মাথা নাড়ল। ‘না। এবার আমি নিজেই আঁকব।’

সে অনেক চেষ্টা করল। সূর্যটা একটু বেঁকে গেল। গাছের ডালও সমান হলো না। নদীর রঙ একটু বেশি গাঢ় হয়ে গেল। তবু সে নিজের ছবিটা দেখে খুশি হলো। প্রতিযোগিতার শেষে সে প্রথম হলো না। কিন্তু শিক্ষিকা তার ছবির পাশে একটি ছোট্ট হাসিমুখের স্টিকার লাগিয়ে লিখলেন, ‘নিজে নিজে আঁকার সুন্দর চেষ্টা।’

স্টিকারটা দেখে আয়ানের চোখ চকচক করে উঠল।

বাড়ি ফিরে সে ছবিটা দেয়ালে ঝুলিয়ে দিল। সন্ধ্যায় মা বললেন, ‘আজকাল দেখছি, তুমি নিজের কাজ নিজেই করছ।’

আয়ান গর্ব করে বলল, ‘কারণ এখন কাজ করতে মজা লাগে।’

টিকো পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে হঠাৎ বলল, ‘নতুন নির্দেশনা চাই।’

আয়ান একটু ভেবে বলল, ‘আজ থেকে তুমি আমার সব কাজ করবে না।’

টিকোর চোখের নীল আলো একবার জ¦লে উঠল। ‘তাহলে আমি কী করব?’

আয়ান হেসে বলল, ‘যেখানে আমি আটকে যাব, শুধু সেখানে সাহায্য করবে।’

‘নির্দেশনা সংরক্ষণ করা হয়েছে’ টিকো বলল।

এরপর থেকে দুজনের কাজ ভাগ হয়ে গেল। আয়ান নিজের বিছানা গোছায়। স্কুলের যাওয়ার আগে নিজের স্কুলব্যাগ গোছায়। বিকেলে গাছে পানি দেয়। খেলার পরে খেলনা তুলে রাখে।

আর টিকো?

সে শুধু ভারী বই এনে দেয়, সময় মনে করিয়ে দেয়, আর কখনো কোনো জিনিস খুঁজে না পেলে সাহায্য করে।

একদিন সকালে মা দেখলেন, আয়ান নিজের হাতে জুতোর ফিতা বাঁধছে। মা মুচকি হেসে বললেন, ‘টিকো কোথায়?’

আয়ান বলল, ‘ও আছে। কিন্তু সব কাজ ও করলে আমি শিখব কীভাবে?’

পাশে দাঁড়িয়ে টিকো আনন্দের শব্দ করল। ‘আজকের সবচেয়ে বড় কাজটি আয়ান নিজেই সম্পন্ন করেছে।’

আয়ান হেসে টিকোর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল। ‘তুমি আমার কাজের লোক নও। তুমি আমার বন্ধু। বন্ধু সব সময় কাজ করে দেয় না। বন্ধু পাশে থাকে।’

টিকোর চোখের আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

সেদিন থেকে আয়ানের ঘরে আর শুধু একটি বুদ্ধিমান রোবট ছিল না, ছিল এমন এক বন্ধু, যে প্রয়োজনে সাহায্য করত আর প্রতিদিন আয়ানকে নিজের হাতেই নতুন কিছু শেখার আনন্দ খুঁজে নিতে উৎসাহ দিত।