নিঝুমদ্বীপে সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ, যা বলছেন প্রকৌশলী

নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার ১১ নম্বর নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের ডিসি রোডের নির্মাণকাজে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশ করা হয়েছে।

এতে ক্ষুব্ধ হয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) হাতিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইমদাদুল হক। নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়নে ভবিষ্যতে কোনো উন্নয়ন বরাদ্দ দেওয়া হবে না বলে হুমকি দিয়েছেন তিনি। 

সম্প্রতি নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের কয়েকজন বাসিন্দা নিঝুম দ্বীপে মড়ক নির্মাণকাজ অনিয়মের কারণে বন্ধ থাকায় উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইমদাদুল হকের সঙ্গে দেখা করেন। তারা তদন্তের মাধ্যমে রাস্তাটি নিম্নমানের নির্মাণ কাজ অপসারণ করে পুন:নির্মাণ এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

তাদের অভিযোগ, উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ে উপস্থিত লোকজনের সামনে উপজেলা প্রকৌশলী ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ‘আপনারা রাস্তাটির ছবি তুলে পোস্ট করতে থাকেন,নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়নে রাস্তা নির্মাণ কাজে আর কোনো বরাদ্দ দেওয়া হবে না।’

আম্পান প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নিঝুমদ্বীপের 'ডিসি রোড' এর সাড়ে তিন কিলোমিটারের উন্নয়নকাজ ২০২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৫ জুলাই শুরু হয়। কাজ পায় ‘এম আলী কর্পোরেশন’ নামক একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পরে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে কাজটির সাব-কন্ট্রাক্ট নেন আবদুল হাই আরাম নামক এক ব্যক্তি।  ২০২৬ সালের অক্টোবরে কাজটি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান ইতোমধ্যে রাস্তাটির নির্মাণ কাজ প্রায় ৭০ শতাংশ শেষ হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের ইট, বালু, রড ও খোয়া ব্যবহার করা হয়েছে।  সড়কের নির্ধারিত পুরুত্বও সর্বত্র ঠিক রাখা হচ্ছে না। নির্মাণ করা সড়কের অনেক জায়গায়  সামান্য বৃষ্টিতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ওপরের স্তর উঠে গেছে। নব নির্মিত  সড়কের বিভিন্ন স্থানে ধ্বস নেমেছে। রাস্তার নিম্নমানের কাজের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর ক্ষতিগ্রস্ত অংশে  সিমেন্টের ঘোলা ছিটিয়ে তা ঢাকার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সড়কটির নির্মাণকাজের মান নিয়ে শুরু থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে নানা অভিযোগ রয়েছে। রাস্তাটি নির্মাণকালীন  অনিয়মের বিষয়টি এলজিইডির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ও উপজেলা প্রকৌশলীকে জানানো হলেও কাজের মানে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের। পরে স্থানীয়রা বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনার চেষ্টা করেন। বর্তমানে সড়কটির নির্মাণকাজ সাময়িক বন্ধ রয়েছে।

নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের বাসিন্দা হাফেজ মাওলানা ইলিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘আমি ইমাম, মোয়াজ্জেম ও খাদেমদের কাগজ সত্যায়িত করার জন্য উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ে যাই। কথাবার্তার একপর্যায়ে নিঝুমদ্বীপের রাস্তার কাজের অনিয়মের বিষয়টি তুললে তিনি খুবই ক্ষিপ্ত হন। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, আপনারা ছবি তুলে ফেসবুকে দেন। ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে কী লাভ হবে? এখন তো কাজ বন্ধ রেখেছি। আর কাজ হবে না। নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নে আর কোনো নতুন বরাদ্দ যাবে না।’

হাফেজ মাওলানা ইলিয়াস উদ্দিন আরও বলেন, ‘এলজিইডি প্রকৌশলী  মো.ইমদাূুদুল হকের কথা শুনে আমি হতভম্ব হয়েছি। ফেসবুকে অনিয়মের বিষয়ে প্রতিবাদ করায় একটি ইউনিয়নের বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলা-এটা কেমন কথা?  তিনি এমন কথা বলার এখতিয়ার রাখেন কি না, তা নিয়ে আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’

নিঝুম দ্বীপের বাসিন্দা সুজন উদ্দিন বলেন, আমরা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে পোস্ট করিনি। আমরা রাস্তার কাজের অনিয়মের ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিয়েছি। সরকারি টাকায় কাজ হচ্ছে, কাজটি ভালো হওয়া দরকার। রাস্তা যেন টেকসই হয়, সেটিই আমরা চাই।

নিঝুম দ্বীপের অপর বাসিন্দা হাসানুল বান্না ফুয়াদ বলেন, যেকোনো নাগরিক সরকারি উন্নয়ন কাজের অনিয়মের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করতে পারেন। ছবি প্রকাশের কারণে একটি ইউনিয়নের উন্নয়ন বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি কেন দেওয়া হবে? নিঝুমদ্বীপের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা এমনিতেই খুবই খারাপ। দীর্ঘদিনের দাবির পর গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের নির্মাণকাজ শুরু হলেও নিম্নমানের মালামাল ব্যবহারের কারণে কাজ শেষ হওয়ার আগেই সড়কটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি আবারও দুর্ভোগে পড়বেন সাধারণ মানুষ।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি)  হাতিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইমদাদুল হক সাংবাদিকদেরকে  বলেন, ‘আম্পান প্রকল্পের আওতায় নিঝুমদ্বীপে ডিসি রোডের কাজ চলমান আছে। সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয়দের কাছ থেকে কিছু অভিযোগ ও ভিডিও এসেছে। এগুলো আমরা অবগত হয়েছি। ঠিকাদারকে আমরা নির্দেশনা দিয়েছি, সরকারের নীতিমালার বাইরে কাজ করলে কাজ বন্ধ থাকবে। সেই অনুযায়ী বর্তমানে কাজটি বন্ধ রয়েছে।

ডিসি রোড নির্মান কাজে বরাদ্দ না দেওয়ার হুমকির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি  বলেন, ‘আমি তাকে বলেছি, ফেসবুকে পোস্ট দিলে আমরা বিব্রত হই। আমি বরাদ্দ দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়ে কোনো  হুমকি  দিইনি। বরাদ্দ দেওয়ার এখতিয়ার  আমার নয়।’